kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

ধান কাটার লোক মেলে না কর্মসংস্থান আছে বলেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ধান কাটার লোক মেলে না কর্মসংস্থান আছে বলেই

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : বাসস

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় রেওয়াজের বাইরে প্রথমবারের মতো বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে পাশে বসিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জনকল্যাণমুখী’ অভিহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। জনগণ যাতে বাজেট থেকে সুফল পায়, উপকৃত হয়, সরকার সেটি নিশ্চিত করছে বলে জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলন শুরু করে প্রথম ঘণ্টায় বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পর আরেক ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে বলেই ধান কাটার লোক পাওয়া যায় না।

২০৩০ সালের মধ্যে সরকার তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে উল্লেখ আছে প্রস্তাবিত বাজেটে। প্রতিবছর সাত থেকে আট লাখ নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে, সে হিসাবে আগামী ১১ বছরে ৮৮ লাখ থেকে এক কোটি কর্মসংস্থান হওয়ার কথা—এমন তথ্য তুলে ধরে ১১ বছরে কিভাবে তিন কোটি কর্মসংস্থান করা হবে জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কর্মসংস্থানের কথা বলেছি, চাকরির কথা নয়। কর্মসংস্থান আর চাকরি এক নয়। ১৬ কোটি মানুষকে কি চাকরি দেওয়া যায়? বিশ্বের কোনো দেশ কি সেটা করতে পারে? মানুষ যাতে কাজ করে খেতে পারে আমরা সেই সুযোগ করে দিচ্ছি। আগামী বাজেটে আমরা ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিল করেছি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য। আমরা শুধু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। প্রশিক্ষণ নিয়ে মানুষ নিজের কাজ করবে। সারা জীবন সবাই তো একই কাজ করবে না। আমরা প্রযুক্তির শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার কথা বলেছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান মানে শুধু চাকরি নয়। যেকোনো একজন মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষিত করার মাধ্যমে ওই ব্যক্তি যদি কাজ করে খাওয়ার সুযোগ পায়, সেটি হলো কর্মসংস্থান। এর মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান হয়।

অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অবারিত করার বিষয়টিও উঠে আসে সংবাদ সম্মেলনে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান, বাজেটের সমালোচনাকারীদের কঠোর সমালোচনা এবং মিডিয়া মালিকদের ঋণ খেলাপের বিষয়েও কথা বলেন সরকারপ্রধান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শব্দবিভ্রাটে বিরক্ত হয়ে সরাসরি প্রশ্ন না নিয়ে একপর্যায়ে হাতে লেখা প্রশ্ন আহ্বান করেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয়কে সাদা করার সুযোগ বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে টাকা পাচার ও কর ফাঁকি বন্ধ করতে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে টাকা কেন অপ্রদর্শিত করা হয়েছে সে বিষয়ে যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে। কোথায় কী গুঁজে রেখেছে তার তো কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এমন জায়গায় টাকা রেখেছে, সেই টাকা কি ইঁদুরে খেয়ে ফেলছে? তাই এই সুযোগ।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেকোনো কারণে টাকা হাতে চলে আসে। অনেক সময় সেই টাকা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে না। তখন সেই টাকা পাচার করতে চায় অনেকে। এ জন্য টাকা পাচার রোধে সরকার এই সুযোগ দিয়েছে। অবশ্য এই সুযোগ এবারই প্রথম নয়, এর আগে সব সরকারই সুযোগ দিয়েছে। আমারও সুযোগ দিয়েছি, যাতে টাকাটা দেশের কাজে লাগে। দেশের মধ্যেই বিনিয়োগ হয়।’

সব কিছুতেই সমালোচনা করা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা : দেশে কেউ কেউ প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সব কিছুতেই সমালোচনা করা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা। এরা সব কিছুতেই ‘কিন্তু’ খোঁজে। কেউ কেউ সমালোচনা করেও আবার বলে, তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে না। এ  রোগটাও আছে। এটা অনেকটা অসুস্থতার মতো। যখন দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকে, পদ্ধতি থাকে, যখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়, সাধারণ মানুষের উন্নতি হয় তখন এক শ্রেণির লোকের কাছে এ সব কিছুই ভালো লাগে না। তারা ভালো দেখে না। যারা সমালোচনা করার তারা সমালোচনা করে যাক। যদি সেটা গঠনমূলক সমালোচনা হয়, আমরা তা গ্রহণ করব। আর যদি গঠনমূলক না হয়, আমরা তা ধর্তব্যে নেব না।”

কারো মুখাপেক্ষী হব না : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন আমরা নিজেরাই করব। কারো কাছে হাত পেতে নয়। কারো মুখাপেক্ষী হব না।’ তিনি বলেন, ‘আগে যারা মনে করত আমরা ভিক্ষুকের জাত হিসেবে যাচ্ছি, এখন আর কেউ তা মনে করে না। এটাই হচ্ছে আমাদের সব থেকে বড় অর্জন।’

সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে বর্তমান অর্থমন্ত্রীর কথাও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তাঁর (মুস্তফা কামাল) অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট ছিল। অনেক আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু সেটা পারেনি। তবে আমার পাশে আরেক শক্তি (এ এম এ মুহিত) আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন অর্থসচিব আবদুর রউফ।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : সব খাতে সফল হলেও খেলাপি ঋণ কমাতে না পারার কারণ জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিডিয়ার কোন মালিক কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা ঋণ নিয়ে সেই টাকা পরিশোধ করেননি, ঋণখেলাপি হয়েছেন, সেটি বের করলে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া লাগবে না।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আপনাদের মিডিয়ার মালিকদের বলেন ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছেন, তা শোধ দিতে। তাহলে আর খেলাপি ঋণ থাকবে না।’

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, যেসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন কিন্তু পরিশোধ করেননি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হয়েছেন, সেই ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকের ঋণ এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে কাজ চলছে। ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হার দুই অঙ্কের ওপর দেখতে চান না প্রধানমন্ত্রী।

কৃষকদের অল্প অর্থই ব্যয় হয় : কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নেবে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধানের গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। ধান ক্রয় করার লক্ষ্য আমরা নিয়েছি। প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত দিয়েছি। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হয়। কৃষকদের নিজেদের অল্প অর্থই ব্যয় হয়। বলতে গেলে সরকারই সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়ে থাকে। কৃষকের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা আমরা দিয়ে থাকি। আর করেছি বলেই এত ধান উৎপাদিত হয়েছে। না হলে এত ধান উৎপাদিত হতো না। অতীতেও উৎপাদিত হয়নি, এখনো হতো না। কৃষকদের যেটা ভালোমন্দ, সেটা দেখা আমাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।’

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) উত্তরাঞ্চলে কম টাকা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উত্তরাঞ্চলে এখন ‘মঙ্গা’ শব্দটি শোনা যায় না। উত্তরাঞ্চলে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল হয়েছে। বিমানবন্দর হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। ছিটমহল বিনিময়, বর্ডারহাট হয়েছে। এখন বহু উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। তাই বলা যাবে না, এডিপিতে উত্তরাঞ্চলকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।”

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে যারা সমালোচনা করে তারা সঠিক তথ্য বলছে না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২৮টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে খরচ হয়। তাই পুরো চিত্র উঠে আসে না। তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য ১০০ কোটি ও তরুণ বেকারদের জন্য ১০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামকে শহর করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তার রূপরেখাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা