kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

অনেক প্রতিশ্রুতি থেকে যায় বাজেট বইয়েই

আরিফুর রহমান   

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনেক প্রতিশ্রুতি থেকে যায় বাজেট বইয়েই

বাজেটে প্রতিবছর কর আদায়ের লক্ষ্য বাড়ছে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের আকার বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পের সংখ্যাও। কিন্তু যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দিয়ে কর বাড়ানোর কথা, বাজেটে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেখানে সংস্কার আনতে পারছে না সরকার। বাড়ছে না প্রশাসনিক দক্ষতা।

প্রতিবছরের বাজেটে করের আওতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় গত ১০ বছর তা করা হয়নি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও সক্ষমতা বাড়ছে না। ফলে প্রতিবছর বাজেটে আয়-ব্যয়ের লক্ষ্যও অর্জিত হচ্ছে না। এতে বছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে আবার বাজেট কাটছাঁট করতে হয় সরকারকে। প্রতিবছরই বাজেট বাস্তবায়ন ৯০ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এর বাইরে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পাটশিল্পকে বিকশিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলা হলেও তা অধরাই রয়ে গেছে। তৈরি পোশাকের বাইরে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে বিকল্প রপ্তানি হিসেবে নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কাগজেই রয়ে গেছে। বাণিজ্য বাড়াতে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিআই) করার কথা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে পরিধি, তার সঙ্গে তুলনা করলে বাজেটের আকার বড় কিংবা উচ্চাভিলাষী নয়, বরং তুলনামূলক ছোট। বাজেটের আকার আরো বড় হওয়া উচিত। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়ন যদি না হয়, তাহলে বড় আকারের বাজেট ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন আছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের বাজেটের আকার হওয়া উচিত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ২০ শতাংশের ওপরে। কিন্তু এখন বাজেটের আকার জিডিপির মাত্র ১৭ শতাংশ। এটি আরো বাড়ানো উচিত। তবে আকার বাড়ানো নয়, বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে বলেন তিনি।

পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রো রেলসহ মাঠপর্যায়ে দেড় হাজার প্রকল্প বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এডিপিতে দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার জন্য অর্থছাড়ে সংস্কার আনা হয়েছে। ১ জুলাই অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুর দিন থেকেই প্রকল্প পরিচালকরা (পিডি) বরাদ্দের অর্থ খরচ করতে পারেন। তবু কাঙ্ক্ষিত গতি আসে না। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা রাখা হলেও সংশোধন করে পরে তা এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। যদিও পরিকল্পনাসচিব নূরুল আমিন দাবি করেছেন, ‘আগের চেয়ে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বেড়েছে। প্রতিনিয়তই কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পিডি নিয়োগে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে সরকার। আগের মতো এক কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্পের পিডি হতে পারবেন না। প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা আনতে পরিকল্পনামন্ত্রী বিভাগীয় শহরে ছুটে যাচ্ছেন। অর্থবছরের শুরুতেই মন্ত্রণালয়গুলোকে টাকা দেওয়া হচ্ছে প্রকল্পের বিপরীতে খরচের জন্য। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে। এসব কারণে আমি মনে করি, আসছে অর্থবছরে এডিপির গুণগত মান নিশ্চিত হবে। এডিপি বাস্তবায়নেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা গ্রহণে ১৯৮৪ সালে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার নামে আলাদা একটি বিশেষায়িত ক্যাডার গঠন করা হয়েছিল। গত বছর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে ইকোনমিক ক্যাডারকে একীভূত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর পর থেকে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত। দেশব্যাপী সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে যেসব কর্মকর্তার ওপর গুরুদায়িত্ব, তাঁরা এখন উদ্বিগ্ন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এখন পর্যন্ত কার অবস্থান কী হবে, কাকে কোথায় বদলি করা হবে—এসব অস্থিরতা নিয়েই সময় পার করছেন বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের ৪৬৪ জন কর্মকর্তা। পরিকল্পনাসচিব অবশ্য বলেছেন, ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত হলেও শিগগিরই কর্মকর্তাদের বদলি হবে না।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত তলানিতে

বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। মোট জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায়ের হার ১০ শতাংশের মধ্যে। প্রতিবছরই বাজেটে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে তা আবার কাটছাঁট করা হয়। চলতি বছর রাজস্ব আদায়ের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। বছর শেষে এটিও অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন এনবিআরের কর্মকর্তারাও।

এমন বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে প্রশাসনিক দক্ষতা, এনবিআরের সংস্কারের কথা বাজেটে বলা হলেও তা বাস্তবায়িত হয় না। রাজস্ব আদায়ে পুরোপুরি অটোমেশন, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নতুন করের আওতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কার্যকর হয়নি। কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অবশ্য নতুন অর্থমন্ত্রী পুরনো কথা নতুন করে জানিয়েছেন, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো হবে আগামী বাজেটে।

নতুন ভ্যাট আইন পাস হওয়ার পর থেকে গত কয়েক বছর এটি বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় দেখানো হলেও প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি এনবিআর। এ বছর থেকে এই আইন কার্যকর করা হবে বলে আগেভাগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। বিদায়ি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলা রয়েছে, ভ্যাট ফাঁকি রোধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কিন্তু ইএফডি সরবরাহের কাজটি এনবিআর নিশ্চিত করতে পারেনি। অর্থমন্ত্রী যদিও কর না বাড়ার আশ্বাস দিয়েছেন, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের দ্বিধা কাটেনি। অজানা আশঙ্কা রয়েছে ভোক্তাদের মনেও। এর প্রয়োগ নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন বিশ্লেষকরাও।

মন্তব্য