kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জুলাইয়েই চীনে যাচ্ছি

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি   

১০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জুলাইয়েই চীনে যাচ্ছি

গণভবনে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী। ছবি : পিআইডি

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে আগামী জুলাই মাসে চীন সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানাবেন। গতকাল রবিবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ১ থেকে ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর হতে পারেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

কালের কণ্ঠ’র এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সবাই জানে, সম্মান করে। চীনের প্রেসিডেন্ট ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী গত ২৮ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত তাঁর জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবাই চায় যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত যাক। কিন্তু মিয়ানমার এদের নিতে চায় না। এখানেই সমস্যা। আপনারা দেখেছেন আমরা চুক্তি করেছি। সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগও আছে। কিন্তু ওইভাবে তাদের সাড়া পাই না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এদের (রোহিঙ্গা) সাহায্য করতে আসে বা ভলান্টিয়ার সার্ভিস দিতে আসে, তাদের সাংঘাতিক আপত্তি এদের ভাসানচরে নেওয়ার ব্যাপারে। কক্সবাজারে আরাম-আয়েশে থাকে, যা পায় কিছু খায় আর কিছু রাখে। খরচ হয় না। এ জন্য তারা কিছু করতে চায় না। সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে। এত সুন্দর ঘরবাড়ি আমরা করে দিয়েছি, তার পরও পছন্দ হয় না।’

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরই মধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি। ওখানে (কক্সবাজার) দায়িত্ব ভাগ করা আছে। আমাদের বর্ডার ফোর্স বিজিবি একটা অঞ্চল দেখে, আমাদের পুলিশ দেখে এবং আমাদের সেনাবাহিনী দেখে। আমরা বলেছি ওটাকে ক্লাস্টার করে চারদিকে একটা সিকিউরিটি ব্যারিকেড দিয়ে দিতে। সব সময় টহলে রাখতে।’

জাপান সফরে সফল হয়েছি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাপান সফরে যেমন সফল হয়েছি, চীনেও হব। আগেই আমার দাওয়াত ছিল। কিন্তু সেই সময় সম্ভবত আমাদের পার্লামেন্টের জরুরি কিছু বিষয় ছিল। তাই যেতে পারিনি।’

জাপান সফরকালে সে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলে আশ্বাস দেন। শেখ হাসিনা ‘ফিউচার ফর এশিয়া’ বিষয়ক নিক্কেই সম্মেলনে যোগ দিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করার কথা জানান।

সৌদি আরবে তিন দিনের সফরকালে শেখ হাসিনা মক্কায় অনুষ্ঠিত ১৪তম ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন। মুসলিম দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বাইরের হস্তক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও মানবিক বিপর্যয়সহ ধর্মের নামে হানাহানি বন্ধে উপায় বের করার আহ্বান জানান তিনি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সংস্থাটির সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মক্কায় পবিত্র ওমরাহ পালন এবং মদিনায় প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করেন।

ফিনল্যান্ড সফরকালে সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনায় উভয় দেশ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলাসহ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করে। প্রধানমন্ত্রী দেশটির ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট সাওলি নিসিস্তোকে ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় জাতীয় সংসদের উপদেষ্টা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন উপস্থিত ছিলেন। গণভবনের ব্যাংকুয়েট হলে নির্ধারিত সময় বিকেল ৫টার কিছু পরে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।

ঈদে জঙ্গি হুমকি ছিল : এবার ঈদুল ফিতরের জামাতের সময় জঙ্গি হামলার হুমকি ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক চেষ্টায় কোনো অঘটন ছাড়াই সব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ঠিক কী ধরনের হুমকি ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ২০১৬ সালের জঙ্গি হামলার পর থেকেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও পুলিশ কড়া নজরদারি শুরু করে। কোথাও কোনো ধরনের তথ্য পেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আপনারা জানেন যে নানা নামে নানাভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নানা ধরনের থ্রেট কিন্তু দিতেই থাকে। সারাক্ষণ কিন্তু এগুলো আসছে। সবটা বলে আমি মানুষকে ভীত করতে চাই না। কিন্তু যত দূর পারি, এগুলোর পেছনে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত করে থাকে এবং তাদের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার, তা আমরা নিয়ে থাকি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঈদের জামাতের সময় আমি সত্যি খুব চিন্তিত ছিলাম।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, আমাদের পুলিশ বাহিনী, আমাদের র‌্যাব থেকে শুরু করে সবাই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। সে জন্য খুব সুষ্ঠুভাবে ঈদের জামাতগুলো সম্পন্ন হয়েছে।’ গুলশান হামলার এক সপ্তাহের মাথায় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতে জঙ্গিদের হামলাচেষ্টার ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একবার শোলাকিয়াতে একটা ঘটনা ঘটেছে, চেষ্টা হয়েছে। এবার কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি।’ জঙ্গিবাদ দমনে জনগণের সচেতনতাকে বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে বড় শক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘জনগণ যথেষ্ট সচেতন। আমরা জনগণকে সম্পৃক্ত করেই এ ধরনের হুমকি মোকাবেলা করতে চাই। সে জন্য জনগণের কাছে সব সময় আমার আবেদন থাকবে, তারা যেন এ বাপারে সজাগ থাকে, সচেতন থাকে। কারণ এসব ঘটনা আমাদের উন্নয়নের গতিধারাটা ব্যাহত করবে।’ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘কোথাও কোনো তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

ঠাণ্ডা লেগেছে প্রধানমন্ত্রীর

শেখ হাসিনা জানান, ওমরাহ করার পর থেকে গলায় ঠাণ্ডা লেগেছে। এ জন্য চিকিৎসক কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘কম কথা বলাও আমার জন্য একটা বড় শাস্তি।’

 

মন্তব্য