kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

আক্ষেপেও অনুপ্রেরণা

সাইদুজ্জামান, নটিংহাম থেকে   

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আক্ষেপেও অনুপ্রেরণা

সপ্তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে ব্যাট উঠিয়েছেন ঠিকই, তবে মুখে হাসি নেই। মুশফিকের এই প্রতিক্রিয়াই বলে দিচ্ছে লড়াই করেও ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

আক্ষেপেও আনন্দের আবির ফুটে ওঠে। গতকাল ট্রেন্ট ব্রিজের মাঠ থেকে বেরোনো লাল-সবুজ জার্সি গায়ের প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখেও তাই। একজনকেও পাওয়া গেল না যিনি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

বরং বিষাদগ্রস্ত দেখিয়েছে বাংলাদেশ অধিনায়ককে। এ বিষাদ শুধুই অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪৮ রানে হারের নয়। মাশরাফি বিন মর্তুজা বিপন্ন বোধ করছেন তো সেই একাদশ গড়া নিয়েই। চোটের কারণে আগেই অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ও মোসাদ্দেক হোসেন। তাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের জন্য উপযুক্ত বোলিং আক্রমণ নিয়েই নামতে পারেনি বাংলাদেশ। সাড়ে তিন শ পর্যন্ত নটিংহামের উইকেটে তাড়া করা সম্ভব বলে বিশ্বাস ছিল দলে। কিন্তু ৩৮২ দূরের পথ। যদিও পছন্দের বোলিং আক্রমণ পেলে প্রতিপক্ষ ইনিংসকে গোটা চল্লিশেক রান আগেই থামিয়ে দিতে পারতেন বলেই ম্যাচ শেষে মনে হয়েছে অধিনায়কের। এই বোলিং নিয়েই সেটা হতে পারত যদি ডেভিড ওয়ার্নারের দেওয়া ক্যাচটা ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে নিতে পারতেন সাব্বির রহমান। অস্ট্রেলীয় ওপেনার তখন ১০ রানে। সেই তিনি আউট হয়েছেন ১৬৬ রান করে। ব্যবধান ওখানেই মূলত গড়ে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তার পরও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে যদি থামানো যেত, একটা মরিয়া ভাবনা ছিল মাশরাফির। কিন্তু তাঁর ১০ বলে ৩২ রানের তোড়ে শেষ প্রতিরক্ষাবাঁধও গুঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের। ‘৩৯ থেকে ৪৪—এই ছয় ওভারেই আমরা ম্যাচটা হেরে গেছি’, আক্ষেপ করেছেন মাশরাফি।

গতকালের ম্যাচে অনেকগুলো বিষয়ই বাংলাদেশের পক্ষে যায়নি। বৃষ্টির আশঙ্কা সরিয়ে গতকাল সকাল থেকেই রৌদ্রোজ্জ্বল নটিংহাম উপভোগ্য ক্রিকেটের জন্য সেজেগুজেই ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে প্রবাসীরা ট্রেন্ট ব্রিজে ভিড়ও করেছিলেন বড় আশা নিয়ে। গ্যালারিতে লাল-সবুজের সঙ্গে ঘোর অস্ট্রেলিয়াবিরোধী ইংরেজদেরও দেখা গেছে ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’ বলে চেঁচাতে। তাতে ট্রেন্ট ব্রিজে মিরপুরের আবহ। উইকেটও ব্যাটিংবান্ধব। সেটা দেখেই টস জিতলে ব্যাটিংয়ের পক্ষে মত ছিল দলের। কিন্তু টসে হেরে ফিল্ডিংয়েই নামতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

পরেরটুকু বাংলাদেশের আশঙ্কা মেনে এগিয়েছে ম্যাচ। ডেভিড ওয়ার্নার ও অ্যারন ফিঞ্চ বিধ্বংসী শুরু করেন। তবে খুব যে মারকুটে ব্যাটিং করেছেন তা নয়, তবে বাউন্ডারির ফাঁকে ফাঁকে সিঙ্গেল নিয়ে শুরু থেকে রান রেট ছয়ের ওপরেই রেখেছেন তাঁরা। অবশ্য মাশরাফির বলে ওয়ার্নারের দেওয়া ক্যাচটা সাব্বির রাখতে পারলে স্ক্রিপ্টটা বাংলাদেশের পছন্দমতোই হতে পারত।

ওয়ার্নার আউট হলে সাকিব আল হাসানের বোলিং নিয়ে দুর্ভাবনা করতে হতো না অধিনায়ককে। উল্টো বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনারই হয়তো কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাতেন অজি ব্যাটসম্যানদের ওপর। কিন্তু সে আর হয়নি। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শেষমেশ প্রতিপক্ষের উদ্বোধনী জুটি ভাঙতে সৌম্য সরকারের খণ্ডকালীন পেস বোলিংয়ের ওপর আস্থা রাখতে হয়েছে মাশরাফিকে। নিজের পঞ্চম বলেই ফিঞ্চকে ফিরিয়েছেনও সৌম্য। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়াও সাকিবকে মাথায় রেখে স্টিভেন স্মিথের পরিবর্তে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে আরেক বাঁহাতি উসমান খাজাকে। এবারের জুটিটি আরো বড়, ১৯২ রানের। নিজের ১৬তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে ওয়ার্নার আউট হওয়ার সময়ও ম্যাচের লাগাম যে আর ধরার সুযোগই পাবেন না, এতটা মাশরাফি তখন ভেবেছিলেন বলে মনে হয়নি। কিন্তু ওয়ার্নারের পর ম্যাক্সওয়েল এসেই এমন ঝড় তুললেন যে বাংলাদেশের সাড়ে তিন শর দেয়াল ভেঙে ৩৮১ করে ফেলে অস্ট্রেলিয়া।

পরেরটুকু প্রত্যাশিত কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছু। রানপাহাড়ে চড়তে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়াটাই বাংলাদেশের নিয়মিত ছবি। কিন্তু ২০১৯ বিশ্বকাপে সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছেন সাকিব-তামিমরা। তাই শুরুতে তামিম ইকবালের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝিতে সৌম্য আউট হওয়ার পরও মনে হয়নি ম্যাচ ওখানেই শেষ। যথারীতি তিন নম্বরে নেমে রানের গতি বাড়িয়েছেন সাকিব। সঙ্গে তামিমও পালন করে গেছেন তাঁর ভূমিকা—এক প্রান্ত আগলে রেখেছেন। কিন্তু মার্কাস স্টয়িনিসকে তুলে মারতে গিয়ে সাকিব ক্যাচ দিয়েছেন ওয়ার্নারের হাতে। এর অল্প পরে তামিমও আউট হওয়ায় অন্য সময় হলে ম্যাচের ‘সমাপ্তি’ ধরে নেওয়া যেত। কিন্তু মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদ উল্লাহর মধ্যকার ১২৭ রানের জুটিতে ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন উঁকি না দিলেও নিজেদের একটা পূর্বভাবনার যৌক্তিকতা অন্তত প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে সাড়ে তিন শর মধ্যে আটকে রাখতে পারলেও জেতা সম্ভব বলে ধরে নিয়েছিল দল। মুশফিকের সপ্তম সেঞ্চুরি এবং মাহমুদের ফিফটিতে ৩৩১ রান তুলে এ বিশ্বাসই ছড়িয়েছে বাংলাদেশ।

তিন শ আর অনতিক্রম্য নয় বাংলাদেশের জন্য। নটিংহাম থেকে আজ সাউদাম্পটনে এ বিশ্বাস নিয়েই যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাকি তিন ম্যাচ জিতলেও সেমিফাইনালে ওঠার নিশ্চয়তা নেই, তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য ম্যাচের দিকেও। তবে বাকি চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের কাজটি করে রাখতে চায় বাংলাদেশ।

মন্তব্য