kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

টুর্নামেন্টসেরা হওয়ার মিশনে সাকিব!

সাইদুজ্জামান, লন্ডন থেকে   

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টুর্নামেন্টসেরা হওয়ার মিশনে সাকিব!

মাত্রই একটি ম্যাচ গেছে। দারুণ খেলেছেন। তবে তাতেই এবারের বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার আগাম ঘোষণা দেওয়ার লোক সাকিব আল হাসান নন। তবে তাঁর খেলা এবং গভীর মনঃসংযোগে আশাবাদী হওয়ার বিস্তর উপকরণ রয়েছে। সেসব দেখেই বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ আর আশাবাদ গোপন রাখতে পারেননি, ‘আমার বিশ্বাস সাকিব এবার ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হবে।’

প্রথম ম্যাচেই ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেছেন সাকিব। তবে একটি ম্যাচই তো পুরো টুর্নামেন্টের ব্যালান্স শিট নয়, বড়জোর হালখাতা। কিন্তু এমন এক সাকিবকে বিশ্বকাপের মাঠে-ময়দানে দেখছেন মাহমুদ, যে আগাম বাজি ধরতে এতটুকু বুক কাঁপছে না তাঁর, ‘সত্যি বলতে কি, আমি এবার ডিফারেন্ট সাকিবকে দেখছি। নিজেকে দারুণভাবে তৈরি করেছে। সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ছে সেটা ওর ইনভলভমেন্ট। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, প্র্যাকটিসে হয়তো কোনো জুনিয়র প্লেয়ারের পানি লাগবে। সেটা ও এগিয়ে দিচ্ছে। টিম মিটিং বলেন কিংবা প্র্যাকটিস—সব কিছুতেই সাকিব শতভাগ দিচ্ছে। মাঠে সেটার সুফলও দেখতে পাচ্ছি।’

প্র্যাকটিসে মনোনিবেশ যে বেড়েছে, সেটি ডাবলিনেই বলেছিলেন সাকিব। এবারের আইপিএল তাঁকে কিছুটা অবজ্ঞাই করেছে, সানরাইজার্স হায়দরাবাদের অনেক ম্যাচেই ছিলেন দর্শক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ওই অবজ্ঞাই শাপে বর হয়েছে বাংলাদেশ দলের জন্য। বাংলাদেশ দলের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস সানরাইজার্সেও একই দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর কাছেই শোনা, ‘সাকিব ভাই যে কী কষ্ট করেছে, অবিশ্বাস্য! ফিটনেস নিয়ে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছে। সেটার ফল তো উনাকে দেখলেই বোঝা যায়।’ কঠোর অনুশীলন করে মাত্র চার সপ্তাহে ছয় কেজি ওজন কমানো সাকিব নিজেও সন্তুষ্ট, ‘ফিটনেস নিয়ে এত কাজ কখনো করেছি বলে মনে পড়ে না। এখন নিজেকে ২০১১ সালের মতো ফিট মনে হয়।’

দুর্দান্ত ফিটনেস ফিরিয়ে আনা সাকিব বিশ্বকাপে এসেছেনও বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে। সেসব তো আর মুখ ফুটে বলেননি, তবে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরুর পরই জানিয়েছিলেন, “একটা ‘কিক’ পেয়েছি।” সেই ‘কিক’ যেন ফিরিয়ে এনেছে সেরা সময়ের সাকিবকে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তো আর অভিজ্ঞতা ছিল না। এবার সেটি যোগ হওয়ায় ম্যাচ পরিস্থিতিতে আরো দারুণভাবে ‘রিঅ্যাক্ট’ করছেন সাকিব। ব্যাটিংয়ের শুরুতে আগের অস্থিরতা নেই। ‘ইগো’কে দূরে ঠেলে পরিস্থিতির দাবি মেটাচ্ছেন ব্যাটে-বলে। ফিল্ডিংয়ে তিনি বরাবরই ভালো। তবে কখনো কখনো গুটিয়ে থাকা সাকিবকে দেখা গেছে মাঠে। কিন্তু এই সাকিব ডাবলিনের প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মাঝেও বলের ওপর চোখ রাখেন বাজপাখির মতো। ফিটনেসজনিত ক্ষিপ্রতা তাঁর স্বভাবজাত অ্যাটাকিং ফিল্ডিংয়েও সহায়তা করছে।

সেই আয়ারল্যান্ড সিরিজ থেকেই সাকিবের অভাবিত পরিবর্তনে দারুণ লাভবান বাংলাদেশ দল। পছন্দের তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে রান করছেন প্রায় প্রতিদিনই। বোলিংটা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তবে যত সময় যাচ্ছে, বোলিংয়েও হারানো সুর ফিরে পাচ্ছেন তিনি। তবে দলের থিংকট্যাংকের কাছে সাকিবের সমাদর আরো বেড়েছে তাঁর টিম টকে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেওয়া দেখে। তিনি সহ-অধিনায়ক। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট-সংস্কৃতিতে এ পদটি কার্যত ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো, অলংকারসর্বস্ব। এ নিয়ে সাকিবের কেন, কারোরই গর্ববোধ করার বিশেষ কারণ নেই। অবশ্য রাজদণ্ড না থাকলেও সাকিবের অভিমতের বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে দলে। সবচেয়ে আশার কথা, সেটি তিনি নিজে উপলব্ধি করছেন। টিম মিটিংয়ে, প্র্যাকটিসে, মাঠে সবখানে তৎপর সাকিব।

একার সাফল্য তো সেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকে পেয়ে অভ্যস্ত সাকিব আল হাসান। কিন্তু সেসব সাফল্যের অর্ধেকেরও বেশি দলীয় হারের গ্লানিতে ডুবে গেছে। তিনি বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হয়েছেন, কিন্তু আইসিসির র্যাংকিংয়ে দল সেই তলানিতে পড়ে। তাতে তাঁর হতাশায় আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সেসব দিন বদলেছে। এখন জয় আর অধরা নয় বাংলাদেশের জন্য। তবু কজন আর পাত্তা দেয় বাংলাদেশ দলকে? এবারের সম্ভাব্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নের রেসে নামিদামি কেউই তো বাংলাদেশকে রাখেননি। উল্টো মানহানিকর মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ। এসব তাতায় সাকিবকে, পরশুর জয়ের পর মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে তেমনটাই বলছিলেন, ‘আমরা সব সময়ই নিজেদের বিপজ্জনক দল মনে করি। কিন্তু বাকিরা খুব বেশি পাত্তা দেয় না। ওই জায়গাগুলোতে আমাদের প্রমাণ করার অনেক কিছু আছে। শুরুটা ভালো হলো। আমি মনে করি যে মানসিকভাবে সবাই ভালো অবস্থায় আছে। এভাবে যদি আমরা যেতে পারি, তাহলে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।’

একটা দেখিয়ে দেওয়া মনোভাবটাই কি সাকিবের সেই ‘কিক’? নানা প্রলোভনেও ‘কিক’ এর বিস্তারিত এখনই ফাঁস করবেন না তিনি, ‘সময় হলেই বলব।’ এ রহস্যময়তার কোথায় যেন বিপিএল দল ঢাকা ডিনামাইটস কোচ খালেদ মাহমুদ এবং অধিনায়ক সাকিবের ‘কিক’ মিলে যাচ্ছে! ফ্র্যাঞ্চাইজি কোচ অধিনায়ককে দেখছেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হাতে। আর অধিনায়ক ‘কিক’ ফাঁস করবেন সময় হলে পরে। সেই সময়টা কি বিশ্বকাপের শেষ দিনে? সম্ভবত!

 

 

মন্তব্য