kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

স্বপ্নরথের শুভযাত্রা

সাইদুজ্জামান ,লন্ডন থেকে   

৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বপ্নরথের শুভযাত্রা

স্বপ্নের মতো শুরু। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অসাধারণ জয়। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদ উল্লাহরা এমন বাঁধনহারা উল্লাস তো করবেনই। ছবি : মীর ফরিদ

লন্ডনের পাবলিক বাসগুলো টকটকে লাল। টিউবের কোথাও সবুজ নেই। তবে গতকাল রবিবার লন্ডনের নানা প্রান্ত থেকে টিউবে-বাসে চড়ে সবুজের ঢেউ আছড়ে পড়েছে ওভালের গ্যালারিতে। ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’—সকালের স্লোগান বিকালে বস্ফািরিত জয়ধ্বনিতে। এরপর যা যা ঘটেছে, তা প্রত্যাশাকেও পেছনে ফেলেছে নিশ্চিত। প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা, তবু রেকর্ড ওয়ানডে স্কোর গড়েছে বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মর্তুজার দল জিতেছেও চাপ উড়িয়ে দিয়ে। আর দিনভর গ্যালারি জমিয়ে রাখা সমর্থক ঘরেও ফিরেছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে। তবে ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রিত, বিশ্বকাপ যে কেবলই শুরু বাংলাদেশ দলের!

২০১৯ বিশ্বকাপ শুরুতে অনেক কিছুই পেল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘হাই প্রফাইল’ ব্যাটিং লাইন-আপও যে বাংলাদেশের মডেলে তাল মিলিয়েছে! আগের ম্যাচে বাউন্সারে চোট পাওয়া হাশিম আমলা খেলেননি। তাই ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে কুইন্টন ডি ককের সঙ্গে ইনিংস সূচনা করেছেন এডেন মাক্রাম। ডি কক ঝোড়ো শুরু করেন। কিন্তু সেই তিনিও শান্ত, মাক্রাম তো বটেই। তাই প্রথম ১০ ওভারে প্রোটিয়া স্কোরবোর্ডে রান ৪৯, ড্রেসিং রুমে ফিরে গেছেন বাংলাদেশের ম্যাচপূর্ব ভাবনায় বিপজ্জনক ক্যাটাগরিতে ওপরের দিকে থাকা ডি কক।

নিজেদের পালায় একই সময়কালে ৬৫ রান তোলা বাংলাদেশের জন্য এটা স্বস্তিরই। শুরু থেকেই যে বাংলাদেশকে অনুসরণ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা! তাই শুরুর অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার পর তারা বাড়াতে থাকে রান তোলার গতি। প্রথমে মাক্রাম, এরপর ডেভিড মিলারকে নিয়ে প্রোটিয়া অধিনায়ক ফাফ দু’প্লেসিস যেভাবে এগোচ্ছিলেন, তাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ক্রমে হাতবদল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতির সঙ্গে ইদানীং অভ্যস্ত হয়ে গেছে বাংলাদেশ। আগের মতো গা ছেড়ে দেওয়ার দুর্নাম আর নেই 

। স্টাম্প সোজা বল করে অপেক্ষায় থাক, ব্যাটসম্যানের একটু ভুলেই উইকেট মিলবে। মিলেছেও। সাকিব আল হাসানের ভেতরে ঢোকা বলে বোল্ড হয়েছেন মাক্রাম, যা বাংলাদেশি অলরাউন্ডারকে অনন্য এক কৃতিত্বের অধিকারীও করিয়েছে। ওয়ানডেতে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ২৫০ উইকেট এবং পাঁচ হাজার রানের মালিক সাকিব।

উইকেট সংখ্যা আরো বাড়তে পারত সাকিবের। কিন্তু তাঁর বলে প্রথমে মিড অফে মিলারের ক্যাচ ছেড়েছেন সৌম্য। একই ওভারে লং অনে তোলা মিলারের ক্যাচের নিচে ঠিকই গিয়েছিলেন মোহাম্মদ মিঠুন, কিন্তু সেটি ধরার তৎপরতা আর দেখাননি। তাও ভালো যে এর আগেই ভয়ংকর হয়ে ওঠা দু’প্লেসিসকে বোল্ড করে সাজঘরে ফিরিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে দাঁড়িয়ে মিলারের কঠিন ক্যাচও নিয়েছেন এ অফস্পিনার। তাতে স্বস্তি নেমে আসার কথা মাহমুদ উল্লাহর মনেও। মুস্তাফিজুর রহমানের বলে দেওয়া মিলারের আরেকটি সুযোগ যে নিতে পারেননি তিনিও।

ভাবা যায় ৩৩১ রান তাড়া করতে নেমে মিলারের মতো খুনে ব্যাটসম্যান তাঁর প্রথম বাউন্ডারি পেয়েছেন ৩২তম বলে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংসের ২০০ রানেই বাউন্ডারি ১৬ আর ছক্কা দুটি। সেখানে বাংলাদেশের দুই শয় ২৫ বাউন্ডারির সঙ্গে ছক্কা ছিল একটি।

তাতে অবশ্য রান রেটের ভারে নুয়ে পড়ার অবস্থায় চলে যায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ ১০ ওভারে জয়ের জন্য ওভারপ্রতি সাড়ে ৯ করে রান তোলা তো টি-টোয়েন্টিতে দক্ষ প্রোটিয়াদের জন্য অসম্ভব লক্ষ্য নয়। কিন্তু টস বাদ দিয়ে দিনের শুরু থেকে শেষটাও যে বাংলাদেশের। কোনো বোলারই উচ্চাভিলাষী কিছু করার চেষ্টা করেননি। নিজেদের সামর্থ্য মেনে উইকেট সোজা বল করেছেন। তাতে ধীরে ধীরে চাপের মেঘ জমেছে দক্ষিণ আফ্রিকানদের মনে। আর চাপের মধ্যে প্রোটিয়ারা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা তো ক্রিকেট বিশ্ব জানে। আমলার পরিবর্তে একাদশে জায়গা পাওয়া রাসি ভ্যান ডার ডুসেন মিডল অর্ডারে নেমে জয়ের আশা দেখাচ্ছিলেন দলকে। কিন্তু সেই তিনিও রানের গতি বাড়াতে গিয়ে সাইফউদ্দিনকে চালিয়ে খেলে দেখেন স্টাম্প ছত্রখান। প্রোটিয়াদের আশাও উড়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। আগের ৩ ওভারে ২২ রান দেওয়া বাংলাদেশি অলরাউন্ডারের তাতে মেডেন উইকেটও হয়ে যায়।

ক্রিস মরিসকে নিয়ে শেষ চেষ্টাটা চালিয়েছিলেন জে পি দুমিনি। কিন্তু ততক্ষণে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নেওয়া বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। ‘ডেথ ওভারে’ বোলিংয়ের জন্য মাশরাফির ঝুলিতে তখনো সাকিব, মুস্তাফিজ ও সাইফউদ্দিনের বিস্তর ওভার থাকায় টানাটানির সংসার নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়তে হয়নি মাশরাফিকে। উল্টো রানের চাপে পড়ে ফুলটস বলেও উইকেট দিয়েছেন মরিস। চাপে প্রোটিয়াদের ভেঙে পড়া তো অবধারিত বলেই মনে করে ক্রিকেট বিশ্ব!

বরং সব দুর্ভাবনা ছিল সকালে। উপমহাদেশের দলগুলো রানই করছে না। সেখানে প্রোটিয়া পেস বোলিংয়ের সামনে কঠিন পরীক্ষার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া ছিল বাংলাদেশের। তামিম ইকবাল যথারীতি ‘অ্যাংকর রোল’ নিয়ে ধীরস্থির। তাতে সৌম্য আগ্রাসী ভূমিকায়। ডেল স্টেইন খেলেননি তো কি, কাগিসো রাবাদা আর লুঙ্গি এনগিডি জুটিও কম ভীতিকর নয়। সৌম্য একবার প্লেইড অন হতে গিয়েও বেঁচেছেন, আরেকবার দুই স্লিপের ভুল-বোঝাবুঝিতে ‘জীবনে’র সঙ্গে একটা বাউন্ডারিও পেয়েছেন। তবে ক্রিকেটে ভাগ্যের সহায়তাও লাগে। এনগিডিকে এক ওভারে দুবার পুল শটে এবং রাবাদাকে অফড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে সৌম্য বড় কিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সদ্যই আক্রমণে আসা ক্রিস মরিসকে কেন যে পুল করতে গেলেন এ বাঁহাতি। সে ভুলেই বিদায় নিতে হয়েছে সৌম্যকে। তাঁর আগে প্রথম বোলিং পরিবর্তনেও সাফল্য পেয়েছে প্রোটিয়ারা। আন্দিলে ফেলুকোয়েওর বল ভেতরে ঢুকবে ভেবে লাইন মিস করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছেন তামিম।

তবে উদ্বোধনী জুটিতে নবম ওভারে ৬০ রান তো বাংলাদেশের গেম প্ল্যানের চেয়েও বাড়তি প্রাপ্তি। সাকিব-মুশফিক সেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে গড়েছেন ১৪২ রানের দারুণ এক জুটি। দুজনে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু সে আর হলো কই? লেগস্পিনার ইমরান তাহিরকে সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হওয়ার জন্য নিজেকেই দুষেছেন সাকিব। ফেলুকোয়েওকে কাভারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন মুশফিক। তাঁর ৭৮ বাংলাদেশ ইনিংসের সর্বোচ্চ স্কোর।

এর পরও বাংলাদেশ তিন শ পেরিয়েছে পরের ব্যাটসম্যানরাও অবদান রাখায়। ক্রিজে এসেই তাহিরের ফুলটসে বাউন্ডারি দিয়ে রানের খাতা খুলেছেন মিঠুন। আবার একই বোলারকে সুইপ করতে গিয়ে উইকেট দিয়েছেন তিনি। যদিও এর আগে এক শ স্ট্রাইক রেটে ২১ রান করে গেছেন মিঠুন। মাহমুদের দায়িত্ব তখন ইনিংসের বাকিটুকু টিকে থাকা। তাই তিনি যখন সংযত তখন উইকেটে এসেই মারমুখী মোসাদ্দেক হোসেন। ডারবানের সেই ফাইনালের মতো না হলেও সাত নম্বরে নেমে ২০ বলে ২৬ রান দৃষ্টিকটূ নয়। ওদিকে তাঁর সিনিয়র মেট মাহমুদ শেষ পর্যন্ত থেকে ৩৩ বলে অপরাজিত থেকেছেন ৪৬ রান করে। টেল এন্ডারের কাছ থেকে ৫ রানও মূল্যবান, মিরাজ আবার বল হাতে দু’প্লেসিসের মহামূল্য উইকেট নিয়েছেন, মিলারের ক্যাচটিও নিলামে ওঠার দাবিদার!

তবে ম্যাচ কাটাছেঁড়ার পর সেরা পারফরমার সাকিব আল হাসানই। ব্যাটে ৭৫, বোলিংয়ে ৫০ রান দিয়ে ১ উইকেট এবং ফিল্ডিংয়ে একটি ক্যাচ। তবে সমান মূল্যবান সাকিবের মনঃসংযোগ। মাঠে তাঁর পদচারণেই যা প্রকাশিত। বাংলাদেশ দলের মধ্যকার অপ্রকাশিত বিশ্বকাপ প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি যেন ওটাই।

মন্তব্য