kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

প্রথম চ্যালেঞ্জ দক্ষিণ আফ্রিকা

স্বপ্নরথের যাত্রা আজ শুরু

সাইদুজ্জামান,লন্ডন থেকে   

২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বপ্নরথের যাত্রা আজ শুরু

মাশরাফির নেতৃত্ব আর সাকিবের নৈপুণ্য—বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে এটাই কি জয়ের মন্ত্র? বিশ্বের শীর্ষ ওয়ানডে অলরাউন্ডারের সঙ্গেই হয়তো ম্যাচের কৌশল নিয়ে আলাপ করছেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। ২০০৭ সালে গায়ানায় প্রোটিয়াদের হারানোর সাক্ষী দুজন, হবে কি এবারও! ছবি : মীর ফরিদ

এত দিন বিশ্বকাপের ট্রেলার দেখেছে বাংলাদেশ। আজ ওভালে রোমাঞ্চের প্রথম দৃশ্য মঞ্চায়ন হবে। এ দৃশ্যের চিত্রনাট্যকারকেই জানা নেই। ক্রিকেটে তো অদৃষ্টই স্ক্রিপ্টরাইটার থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউটরও। তাই দর্শকদের মতো মাশরাফি বিন মর্তুজারাও দাঁতে নখ কাটছেন, কী যে হয়! ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রথম ম্যাচ বলে কথা। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার উত্তেজনা তো থাকবেই।

কিন্তু দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ উড়িয়ে দিলেন সব গুমোট ভাব, ‘মোটেও না। সবাই ফুরফুরে মেজাজে আছে। সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে মন খুলে খেলতে।’ গত রাতে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে ডিনার করেছেন ক্রিকেটাররা। সেটিকে সামনে রেখে ম্যানেজার মারফত বোর্ড সভাপতির প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন অধিনায়ক, তিনি যেন ডিনারের বিনিময়মূল্য হিসেবে ক্রিকেটারদের মন থেকে বিশ্বকাপ রোমাঞ্চজনিত চাপটুকু তুলে নেন!

এর ফলাফল পরদিন জানা যাবে। তবে গতকাল দুপুরের প্র্যাকটিসে একে একে সুখবরের সৌরভ ছড়িয়েছে বাংলাদেশ দল। আগের দিন বাঁ বাহুতে চোট পাওয়া তামিম ইকবাল সবার আগে নেটে। থ্রো ডাউনের পর ফিল্ডিং অনুশীলনও করেছেন। মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের পিঠের চোট নিয়ে সামান্য সংশয় আছে বটে, তবে স্পট বোলিং করেছেন তিনিও। মুস্তাফিজুর রহমানের ফিটনেস নিয়ে কোনো সংশয় নেই। মাশরাফি তো ব্যথা নিয়েই এত দিন ধরে খেলছেন, আজকের ম্যাচও তাঁর জন্য নতুন কিছু নয়।

আরেকজনকে দেখা গেল ব্যাটসম্যানদের শেষ পালায় নেটের দিকে এগিয়ে আসছেন। নেটে ঢোকার আগে নেটের পাশে নকও করেছেন। ম্যাচের আগের দিন সাকিব আল হাসানকে এতটা মন লাগিয়ে ব্যাটিং করতে দেখা যায়নি আয়ারল্যান্ড সিরিজের আগে। মোদ্দাকথা চোট এখন দলের আলোচ্যসূচিতে নেই। সাকিবও ম্যাচ মোডে। বিশ্বকাপের মাঠে নামার আগে এর চেয়ে ভালো প্রস্তুতি আর কী হতে পারে।

ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মিলার চাকরিসূত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন। গতকাল সকালে দেখা হতে তিনি ফিসফিসিয়ে আশ্বস্ত করছিলেন, ‘তোমাদের (বাংলাদেশ) পর সাউথ আফ্রিকার পরের ম্যাচ ভারতের বিপক্ষে। তাই তোমাদের হারাতে মরিয়া হয়ে থাকবে। আর জানোই তো এমন পরিস্থিতিতে ওরা কতটা সফট!’

মাশরাফি অবশ্য এ জাতীয় ভাবনা মনেই আনতে রাজি নন, ‘আমরা নিশ্চিত ওরা কাল (আজ) সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আর ক্রিকেট খেলায় আমি ওসব বিশ্বাস করি না। কাল ভালো কিছু করলেও পরের ম্যাচের কোনো গ্যারান্টি নেই। আপনাকে সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। আমরা আয়ারল্যান্ডে জিতে এসেছি। সবাই সেখানে ভালো করেছে। তবে সেসব এখানে ভালো করার একমাত্র কারণ নয়। এটা ঠিক যে রান-উইকেট আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। কিন্তু পরের ম্যাচটি সেই শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। তাই ছেলেদের বলেছি, ওরা যেন সেটা মাথায় রেখে খেলতে নামে। ছেলেরাও সেভাবেই তৈরি হচ্ছে।’

তবে তিনি তো এখন সংসদ সদস্যও। সে কারণেই কিনা গতকালের দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে প্রায় সব প্রশ্নের উত্তরেই একটা অনুরোধ জুড়ে দিচ্ছিলেন। আইসিসির গত দুটি ইভেন্টে নক আউট পর্বে খেলেছিল। ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে ধরলে ওয়ানডেতে সেরা সময়ই কাটাচ্ছে বাংলাদেশ। তাতে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ যে আকাশ ছুঁয়েছে, সেটি নজরে এসেছে মাশরাফিরও। তাই টিম প্ল্যানের পাশাপাশি আবেগপ্রবণ জনতাকেও ‘শান্ত’ করতে হচ্ছে বাংলাদেশ অধিনায়ককে, ‘গত বিশ্বকাপ এবং চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে আমরা নক আউটে খেলেছিলাম। স্বভাবতই আমাদের কাছে আরো বেশি কিছু চাইবেন আপনারা (সংবাদমাধ্যম), দেশের মানুষ। কিন্তু এবারও আমরা সেমিফাইনাল খেলব, বলতে পারছি না। একটি করে ম্যাচ নিয়ে ভাবব। তবে সবার প্রত্যাশা বেড়েছে, মানে আমাদের পারফরম্যান্সেও উন্নতি ঘটেছে। এটা একভাবে মনে সাহসও জোগাতে পারে। তবু বলব, এখনই সেমিফাইনালের কথা ভাবলে ভুল হবে।’

ক্রিকেট আশ্চর্য একটা খেলা। হারলে সব দলই কমবেশি গুটিয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা যেমন গতকালের ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে পাঠিয়েছে ইমরান তাহিরকে, আজকেরটি তাঁর ক্যারিয়ারের শততম ম্যাচ যে! প্রোটিয়া লেগস্পিনার দারুণ ফর্মে আছেন। পুরো সংবাদ সম্মেলনে সেসব নিয়েই সুখী সুখী সব প্রশ্ন হয়েছে বেশি। শুধু একটা প্রশ্নেই চোখ কিছুটা বস্ফািরিত দেখিয়েছে ইমরানের। উপমহাদেশের ব্যাটসম্যানরা স্পিন ভালো খেলেন। তাতে বাংলাদেশ ম্যাচ তাঁর জন্য পরীক্ষাও কিনা? উত্তরে কোনো বিরক্তি নেই। তবে সব শেষ আইপিএলে ইমরান তাহিরের নৈপুণ্যে উপমহাদেশীয় ব্যাটসম্যানশিপের বাহাদুরি নেই। প্রোটিয়া এই লেগ স্পিনারেরও একদল অনুরাগী আছেন বাংলাদেশ দলে, যাঁরা আজ বাউন্সারের পাশাপাশি বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তবে মূল দুশ্চিন্তা প্রোটিয়া পেসারদের পাঁজর তাক করে করা শর্ট বোলিং। প্রসঙ্গ তুলে মাশরাফিকে খুব বেশি উদ্বেগে ফেলা গেল না, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে পেসাররা বিশ্বকাপে খেলছে, তাঁদের বেশির ভাগকেই আমরা আয়ারল্যান্ডে খেলেছি। এটা ঠিক যে প্রতিপক্ষ আমাদের বাউন্সার দেবে। তবে আমরাও প্রস্তুত।’

ইটের বদলে অবশ্য পাটকেলও তৈরি রেখেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার আজন্ম দুর্বলতা স্পিনের বিরুদ্ধে। ওভালের শুকনো উইকেটে সে সুবিধাটাই নিতে চায় বাংলাদেশ। আইসিসির তরফ থেকে উপহারও মিলেছে, ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের উইকেটেই খেলা হবে আজ। সেদিনের ম্যাচ দেখে উৎসাহিতই মনে হয়েছে মাশরাফিকে, ‘উইকেটে বল কিছুটা গ্রিপ করছিল।’ এক দিনের বিরতিতে সে উইকেটের তাজা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরেকটু ধীর মন্থরতায় আক্রান্ত হওয়ারই কথা। সেখানে মুস্তাফিজের কাটার কাজ করবে। তার চেয়েও বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা স্পিনারদের, যাঁরা উইকেট থেকে সামান্য সুবিধা পেলেই অস্বস্তিতে ফেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের। তাতে সাকিব ও মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে স্পিন বিকল্প হিসেবে একাদশে মোসাদ্দেক হোসেনের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। মোসাদ্দেকের অন্তর্ভুক্তি মানেই সাব্বির রহমানের বেঞ্চে বসে থাকা। সাইফ উদ্দিন পুরোপুরি ফিট ঘোষিত হলেও রুবেল হোসেনের সঙ্গে তাঁর লড়াই অব্যাহত থাকছে। প্রথমজন অলরাউন্ডার হওয়ায় তাঁর ব্যাটিংকে প্লাস পয়েন্ট মনে করেন কোচ স্টিভ রোডস। কিন্তু পুরো ফিট রুবেল হোসেনের সামর্থ্যের ওপর বিপুল আস্থা আছে টিম ম্যানেজমেন্টের ক্ষমতাবান অংশের। সে ক্ষেত্রে তৃতীয় পেসার হিসেবে সাইফ উদ্দিনের পরিবর্তে আজকের ম্যাচে রুবেল হোসেনের থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

একটা সম্ভাবনা অবশ্য গতকালই উড়িয়ে দিয়েছেন মাশরাফি। তিন শ-সাড়ে তিন শর লক্ষ্যে শুরু থেকেই ছুটবে না বাংলাদেশ। শুরুতে উইকেট আগলে রেখে পরিস্থিতি বুঝে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার অভ্যস্ত পথেই হাঁটবে বাংলাদেশ।

বোঝা যাচ্ছে, অনভ্যস্ত ঝুঁকির পথে না গিয়ে নিজস্ব ‘ব্র্যান্ডে’র ক্রিকেটেই বিশ্বমঞ্চে আজ তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

 

মন্তব্য