kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

মোদিতেই মাতোয়ারা ভারত

বিজেপির বিপুল বিজয়,পরাজয় মেনে কংগ্রেসের অভিনন্দন

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মোদিতেই মাতোয়ারা ভারত

লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ফের ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে আবারও পাঁচ বছরের জন্য দিল্লির মসনদ নিজ দখলেই রাখলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। এর মধ্য দিয়ে মোদি হতে যাচ্ছেন ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী, যাঁর দল টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিরঙ্কুশ জয়লাভ করল। নির্বাচনপূর্ব আভাস উড়িয়ে দিয়ে বিরোধীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো সুযোগ না দিয়ে বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনের চেয়েও অভূতপূর্ব ভালো ফল করেছে। ফল ঘোষণা চলমান থাকা অবস্থায়ই গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরাজয় মেনে নিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্ব নেতাদের অভিনন্দনেও সিক্ত হচ্ছেন মোদি।

গতকাল রাতে লোকসভা নির্বাচনের সর্বশেষ ফল ঘোষণা অনুযায়ী, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট জয়লাভসহ ৩৪৯টি আসনে এগিয়েছিল। সরকার গঠনে ২৭২টি আসন প্রয়োজন হলেও বিজেপি একাই এগিয়েছিল ৩০২ আসনে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট জয়লাভসহ এগিয়েছিল ৯২ আসনে। কংগ্রেস এককভাবে জয়লাভ করে ৫০টি আসনে। বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের ধাক্কায় কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী তাঁর নিজ পারিবারিক আসন উত্তর প্রদেশের আমেথিতেই হেরে গেছেন। তিনি বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজিত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তবে কেরালার ওয়ানন্দ আসন থেকে জয়লাভ করায় লোকসভায় প্রবেশের সুযোগ হয়েছে রাহুলের। এ ছাড়া সর্বশেষ ফল অনুযায়ী,

মহাঘটবন্ধন (এমজিবি) এগিয়েছিল ১৫টিতে। অন্যরা এগিয়েছিল ১০০ আসনে। প্রসঙ্গত, লোকসভার ৫৪৫টি আসনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী ভোট হয় ৫৪৩টি আসনে এবং বাকি দুটি আসনে মনোনয়ন দেন প্রেসিডেন্ট। তবে তামিলনাড়ুর একটি আসনে ভোট স্থগিত থাকায় ভোট হয় ৫৪২টি আসনে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু আসনসংখ্যা নয়, নিজেদের ইতিহাসে ভোটের সংখ্যা এবং ‘রাজ্যবিস্তার’ তথা পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যের আসন প্রাপ্তিতেও অগ্রসর বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩১ শতাংশের বেশি ভোট পেলেও গতকাল রাতে সর্বশেষ ফল ঘোষণা অনুযায়ী, ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পায় বিজেপি, যা দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গতবার পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দুটি আসন পেলেও গতকাল রাতে সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, ১৭টি আসনে এগিয়ে ছিল বিজেপি। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, সর্বভারতেই বামদলগুলোর বাজে পরাজয়ের ইঙ্গিত। সর্বভারতে ৫টি আসনে এগিয়ে ছিল বামদলগুলো।। পশ্চিমবঙ্গে একটি আসনেও জয়লাভ বা এগিয়ে নেই দীর্ঘদিন রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা সিপিআইএম।

এই ফলের মধ্য দিয়ে বুথফেরত জরিপও সত্য হলো। বেশির ভাগ বুথফেরত জরিপই বিজেপি এককভাবে ৩০০ আসন এবং জোটগতভাবে প্রায় সাড়ে তিন শ আসন পাবে বলেছিল। কিন্তু কংগ্রেস, তৃণমূলসহ বিরোধীরা এ জরিপকে উড়িয়ে দিয়েছিল। বুথফেরত জরিপের ফল সত্য হলো কংগ্রেস এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির এগিয়ে যাওয়ার বার্তাও। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, বিজেপির পক্ষে ভোট টানতে মোদি একাই যথেষ্ট। বিপরীতে ভোটের আগে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোয় কার্যকর জোট গড়তে ব্যর্থ হয়েছিল কংগ্রেস। পরাজয়ের মাধ্যমে শত বছরের দলটির দুর্বলতাও পরিষ্কার হয়ে গেল। এর আগে গতকাল সকাল ৮টায় ভোট গণনা শুরু হয়। দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় বিজেপির কাছাকাছিও কেউ নেই।

নির্বাচনপূর্ব আভাসে বলা হয়েছিল বিজেপি জিতলেও আসন কম পাবে এবং কংগ্রেসের সঙ্গে লড়াই হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতের ভোটাররা ‘ক্যারিসমেটিক’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতেই আস্থা রাখলেন। কংগ্রেসের পক্ষে দুর্নীতি ও বেকারত্ববিরোধী প্রচার কাজে লাগেনি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলোর নিম্নগামিতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতবারের চেয়ে কংগ্রেস এবার কিছুটা ভালো করলেও অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলো ফল খারাপ করায় এগিয়ে যায় বিজেপি।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নিজেদের ইতিহাসে সূচনীয় পরাজয়ের পর গত পাঁচ বছরে কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না শতাব্দী প্রাচীন দল কংগ্রেসের। তবে এবার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে গো-বলয়ের তিন রাজ্য—ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় নির্বাচনে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল কংগ্রেস। এর সঙ্গে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগদান এবং উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (সপা) ও বহুজন সমাজবাদী পার্টিসহ বিভিন্ন দলের মহাঘটবন্ধন (এমজিবি) তথা মহাজোট গঠনেও ব্যবধান কমে আসবে বলে বিশ্লেষকরা বলেছিলেন। কিন্তু সব বিশ্লেষণই ব্যর্থ হয়েছে।

পাঁচ বছরের ব্যবধান : ২০১৪ সালে বিজেপি এককভাবে ২৮২ আসনে বিজয়ী হয়েছিল এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ মিলিয়ে পেয়েছিল ৩৩৪টি আসন। অন্যপক্ষে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেয়েছিল ৬০টি আসন। অন্যান্য

আঞ্চলিক দলগুলো পেয়েছিল ১৪৯টি আসন। কিন্তু গতবারের ২৮২ থেকে এবার বিজেপি ৩০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং তাদের জোট এনডিএও ৩৩৪ থেকে প্রায় ৩৫০ আসন পেতে যাচ্ছে।

রাজ্য বিস্তারেও গেরুয়া ঝড় : গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল বিজেপি। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, এবার ১৭টি আসনে এগিয়েছিল ক্ষমতাসীন দলটি। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ছিল ২২টি আসনে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটও বেড়ে ৩৯ শতাংশে ঠেকেছে। গো-বলয় থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতেও অগ্রসর হয়েছে মোদির বিজেপি। এর মধ্যে কর্নাটকের ২৮ আসনের ২৫টিতেই এগিয়েছিল বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডে ১৪টি আসনের মধ্যে ১১টিতে এগিয়ে বিজেপি। বিজেপির ঘাঁটি উত্তর প্রদেশে বিজেপি গতবার ৭১ আসনে বিজয়ী হলেও গতকাল রাত পর্যন্ত ৬২টি আসনে এগিয়ে ছিল।

উচ্ছ্বসিত মোদি : দুপুরের পর প্রাথমিক ফল দেখে উচ্ছ্বসিত টুইটারের এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা বেড়ে উঠেছি একসঙ্গে, সমৃদ্ধি এনেছি একসঙ্গে, একসঙ্গে থেকেই আমরা শক্তিশালী ভারত গড়ব, যা হবে সবার জন্য। ভারত আবারও জিতে গেল।’

পরে সন্ধ্যায় দিল্লিতে দলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এলে কর্মীদের ‘মোদি মোদি’ বলে অভিনন্দনে সিক্ত হন মোদি। তখন তাঁকে চেনা আত্মবিশ্বাসে দেখা যায়। দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বিজয় ভাষণে বলেন, ‘বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন। কোটি কোটি নাগরিক এই ফকিরের ঝুলি ভরতি করে দিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে সফলতম জয়।’

শপথ ২৮ মে : বিজেপির সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নরেন্দ্র মোদি শপথ গ্রহণ করতে পারেন। সূত্র জানায়, পার্টির অভ্যন্তরে ২৮ মে শপথের জন্য ঠিক হয়েছে।

ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব রাহুল গান্ধীর : নির্বাচনে ভরাডুবির পর কংগ্রেস প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের প্রস্তাব করেছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। তবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন বলে জানিয়েছে ইন্ডিয়া টিভি।

মোদিকে অভিনন্দন জানালেন এবং হৃদয় ছুঁলেন রাহুল : গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে সংক্ষেপে সংবাদ সম্মেলন করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। এ সময় তিনি বললেন, ‘কোনটা ভুল হয়েছে, আজ এ নিয়ে আলোচনার দিন নয়। জনতা নরেন্দ্র মোদিকে স্বতঃস্ফূর্ত রায় দিয়েছে। জনতার রায়কে সম্মান জানাচ্ছি।’ আমেথিতে ঐতিহাসিক হার মেনে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করছি, ওই আসনের মানুষকে স্মৃতি ইরানি ভালোবাসা দিয়ে ভালো রাখবেন।’

এ ছাড়া দলের উত্তর প্রদেশের দায়িত্বে নিয়োজিত দলের সাধারণ সম্পাদক ও রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘আমরা জনগণের রায়কে সম্মান জানাই এবং বিজেপির কর্মী ও নেতাদের এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানাই। সূত্র : বিবিসি, এনডিটিভি, আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা