kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

ভালো ঋণগ্রাহকের সুদ বেশি, খেলাপির কম!

জিয়াদুল ইসলাম   

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভালো ঋণগ্রাহকের সুদ বেশি, খেলাপির কম!

দীর্ঘদিনের দেনদরবারেও যে সুবিধা প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পায়নি, সেই সুবিধাই ঋণখেলাপিদের বন্দোবস্ত করে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার ঋণখেলাপিদের গণসুবিধা দিয়ে যে বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়েছে, তাতে ঋণখেলাপিদের ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নেমে গেছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধে ১২ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ টানা ১০ বছর সময় পাচ্ছে তারা। অন্যদিকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেও এক অঙ্কের সুদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ভালো গ্রহীতারা। তাদের ঋণ পেতে এখন ১৪ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। অর্থাৎ খেলাপির চেয়ে দ্বিগুণ সুদ ভালো গ্রাহকের ঘাড়ে পড়ছে।

এ ছাড়া এর আগে ভালো গ্রাহকদের যেসব প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি চার বছরেও। তাই খেলাপিদের নয়, ভালো গ্রাহকদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। তাঁরা বলছেন, যারা ভালো গ্রাহক ও নিয়মিত ঋণের টাকা শোধ দেয়, তারা কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না। ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনারও যথাযথ বাস্তবায়ন দাবি করেছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীদের এসব দাবির প্রতি সহমত জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদরাও। তাঁরা বলছেন, নিয়মিত ঋণের টাকা ফেরত দিয়ে ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখে ভালো গ্রাহকরা। তাই ভালো গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং সুদের ওপর ১০ শতাংশ প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশ ভালো গ্রাহকের হাতে। তবু ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দিতে যেন অনীহা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। জানা যায়, চার বছর আগে ভালো ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধিত সুদের ওপর ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা দিয়ে সার্কুলার জারি করা হয়েছিল। ওই সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করেছিল, ভালো ঋণগ্রহীতাদের উৎসাহিত করার জন্য কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা প্রদান করার নীতিমালা নেই। তাই দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতাদের অতিরিক্ত কিছু সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাংকই তা বাস্তবায়ন করেনি। অথচ গত কয়েক বছর ঋণখেলপিদের পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহে কোনো ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এটি আশ্চর্যের ব্যাপার যে ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের আগ্রহ নেই। যারা নীতিনির্ধারণ করে তারাও ভালো ঋণগ্রহীতার ব্যাপারে বিমুখ। ভালো ঋণগ্রহীতাদের ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। যেখানে ঋণখেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সরল সুদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ভালো ঋণগ্রহীতারা ১৫-১৬ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করে ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা পেলে তার সুদ গড়ে ১ শতাংশ কমে। এটি ফাঁকিবাজি ছাড়া কিছুই নয়। তাই খেলাপিদের সুবিধা না দিয়ে ভালো ঋণগ্রহীতাদের রিবেট সুবিধা ১৫ শতাংশ করার পক্ষে মত দেন সাবেক এই গভর্নর।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতে ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় ভালো গ্রাহকদের সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তারা পায়নি। এ ধরনের সুবিধা বাস্তবায়িত হলে ভালো গ্রাহকরা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো উৎসাহিত হবে। এতে দেশে শিল্পায়ন হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। অন্যদিকে এ সুবিধা নিশ্চিত হলে যারা ভালো করেনি, তারাও ভালো গ্রাহক হওয়ার চেষ্টা করবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আর্থিক খাতে একটি পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। 

দীর্ঘদিন ধরেই ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। এ জন্য ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে সরকার থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক মালিকদের বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যই ছিল সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে সুলভ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনোভাবেই তা এক অঙ্কে নামানো যায়নি। উল্টো ঋণের সুদ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলে ক্ষুদ্র ও শিল্পের মেয়াদি ঋণে দুটি বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সর্বোাচ্চ সুদহার ২০ থেকে সাড়ে ২০ শতাংশে ওঠে। একই খাতে বেশির ভাগ ব্যাংকের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ১৫ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। অন্যদিকে বড় ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণে বেশির ভাগ ব্যাংকের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে ছিল।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভালো ঋণগ্রহীতারা ব্যাংকের প্রণোদনা সুবিধা পেয়েছে এ রকম তথ্য আমার জানা নেই। এ ধরনের সুবিধা প্রদানের যে ঘোষণা এসেছে, সেটার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় সেটির তদারকিও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে করতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও ব্যাংকগুলো সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনছে না। ভালো ঋণগ্রহীতাদের সুদের হার এক অঙ্কের বেশি হওয়া উচিত নয়।

খেলাপিদের গণসুবিধা দিয়ে বৃহস্পতিবার ঋণ পুনঃ তফসিলের একটি বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় ছোট, মাঝারি ও বড়—সব খেলাপিই এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সরল সুদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া সুবিধা গ্রহণকারীরা ব্যাংক থেকে আবার নতুন করে ঋণ নিতে পারবে। তাদের আগের অনারোপিত সব সুদও মাফ করে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। অন্যদিকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের পরিশোধিত সুদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ মওকুফ (রিবেট) সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে পৃথক সার্কুলারে। এ ছাড়া পুরস্কার হিসেবে সনদ ও সেরা ১০ ঋণগ্রহীতার ছবি ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু ভালো গ্রহীতাদের ঋণের সুদ কমানোর কোনো ঘোষণাই সার্কুলারে দেওয়া হয়নি।

সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালো গ্রাহকদের বঞ্চিত করে ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যা মোটেও যৌক্তিক নয়। আমি মনে করি, ভালো গ্রাহকদের সুবিধা দেওয়া দরকার। কারণ ভালো গ্রাহকরাই ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখছে। আর খারাপ খেলাপিদের বয়কট করা উচিত। কারণ তাদের জন্য ব্যাংকগুলোকে অসুবিধায় পড়তে হয়। এ ছাড়া খেলাপিদের সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানোর কথা যারা ভাবে, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছে।’

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক দিনে দুটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। একটিতে ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যটিতে ভালো গ্রাহকদের সুদের ওপর ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমি বলব, ঋণখেলাপিদের প্রদত্ত সুবিধার চেয়ে এটা অপ্রতুল। বরং যারা নিয়মিত ঋণ শোধ করে তাদের ঋণখেলাপিদের থেকেও বেশি সুবিধা পাওয়া উচিত। এ ছাড়া এটি সার্কুলার জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।’

 

মন্তব্য