kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা শুধুই বাণিজ্যিক স্বার্থে!

শরীফুল আলম সুমন   

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা শুধুই বাণিজ্যিক স্বার্থে!

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে একসময় শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়লেও এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানও পড়ছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতেই অভিভাবকরা সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছেন ওই সব স্কুলে। কোনো কোনো পরিবারের কাছে এটি সামাজিক মর্যাদারও বিষয়। কিন্তু সন্তানদের ভর্তি করার পর শিক্ষা ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয় অভিভাবকদের। স্কুলগুলো বড় অঙ্কের ফি নিলেও সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এমনকি নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টাও দৃশ্যমান নয়। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীতে তিন ধরনের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আছে। যেসব স্কুলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে, সেগুলোতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য মাসে ব্যয় হয় কমপক্ষে তিন লাখ টাকা। যে ধরনের স্কুলে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে, সেখানে মাসিক ব্যয় জনপ্রতি প্রায় এক লাখ টাকা। আর মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পেছনে মাসে ব্যয় হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। তবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্যয় দ্বিগুণে গিয়েও ঠেকে।

জানা যায়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঠিকঠাক ক্লাস করলেও নবম শ্রেণির সবাই ক্লাসে যায় না। এ নিয়ে খুব একটা চাপ থাকে না স্কুল কর্তৃপক্ষেরও। অষ্টম শ্রেণির পরের পড়াশোনা মূলত প্রাইভেট টিউটর ও কোচিং নির্ভর। যে যত বেশি প্রাইভেট-কোচিং করতে পারে সে তত এগিয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষকের কাছে ব্যাচে (কয়েকজনের সঙ্গে) পড়লে প্রতি বিষয়ের জন্য দিতে হয় সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর শিক্ষক বাসায় গিয়ে পড়ালে দিতে হয় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রতি বিষয় দুজন শিক্ষকের কাছেও পড়ে। 

রাজধানীর একটি নামি স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্প্রতি এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আলাপচারিতায় বলেন, ‘আমরা শিক্ষাদান করলেও এটা আমাদের ব্যবসা। আমরা ইনভেস্ট করেছি, এখান থেকে আমাদের ফিডব্যাকও পেতে হবে। এখানে যেসব অভিভাবক অ্যাডজাস্ট করতে পারবে তারাই থাকবে। তবে ব্যবসা হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।’

স্কলাসটিকা স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার সন্তান স্ট্যান্ডার্ড নাইনে পড়ে। বেতন ১৭ হাজার ৬০০ টাকা। তবে এখন সে আর ঠিকমতো ক্লাসে যায় না। বলতে গেলে, ক্লাসে যাওয়ার সময় পায় না। সারা দিন তাকে প্রাইভেট-কোচিং নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। এমনকি একই বিষয়ে দুজন টিচারের কাছেও পড়ে। শুধু ম্যাথের টিচারকে দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। অন্যদের সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা। স্কুলের শিক্ষকরাই এই প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। ব্যাচে পড়ার পরও মাসে প্রাইভেটের পেছনেই যায় ৫০ হাজার টাকার বেশি। সব মিলিয়ে আমার ছেলের পড়ালেখার পেছনে খরচ লক্ষাধিক টাকা।’

মাস্টারমাইন্ড স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘আমার ছেলের মাসিক ফি ১৪ হাজার টাকা। প্রাইভেট টিচারকে মাসে দিতে হয় আট হাজার টাকা। আর বই-খাতা, স্টেশনারিসহ অন্যান্য কাজে খরচ হয় আরো সাত হাজার টাকার মতো। যাতায়াত, টিফিন তো আছেই। সব মিলিয়ে মাসে খরচ ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি।’

মেপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘প্রতি মাসে স্কুলের ফি আট হাজার ৩০০ টাকা। প্রাইভেট টিচারকে মাসে সাত হাজার টাকা দিতে হয়। প্রতিদিন যাতায়াত খরচ দিতে হয় ২০০ টাকা। এ ছাড়া টিফিন, বই-খাতা, স্টেশনারিসহ নানা খরচ আছে।’

জানা যায়, আদালত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোকে সেশন চার্জ না নিতে নির্দেশ দিলেও তারা তা মানছে না। এ জন্য ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে তারা। বছরের শুরুতে একবারে সেশন চার্জ না নিয়ে তা মাসিক ফির সঙ্গে ভাগ করে দিয়েছে। অভিভাবকরা তা পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া আদালত একটি নীতিমালা করার নির্দেশ দিলেও এখনো সেটি করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

জানা যায়, রাজধানীতে বেশ কিছু স্কুলে ফি দিতে হয় ডলারের হিসাবে। মূলত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে সেসব স্কুলে। বারিধারার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ফি প্রায় ২৪ হাজার ডলার (প্রায় ২০ লাখ টাকা)। ওই সব স্কুলে ভর্তি হতেও মোটা অঙ্কের টাকা লাগে। এ ছাড়া উচ্চমধ্যবিত্তদের সন্তানরা পড়ে কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মতো কিছু স্কুলে। সেখানে মাসিক ফি ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে উত্তরার আগা খান স্কুল, ইন্টারন্যাশনাল হোপ স্কুল, স্কলাসটিকা স্কুল, মাস্টারমাইন্ড স্কুল, মেপললিফসহ কিছু স্কুলে। সেগুলোতে মাসিক বেতন ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। ওই সব স্কুলে ভর্তি হতে লাগে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে আমরা অন্তত দুটি বিষয় দেখতে চাই। প্রথমত, প্রতিটি স্কুলে বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইটি পড়ানো হচ্ছে কি না আর টিউশনসহ বিভিন্ন ফির একটা স্তর নির্ধারণ করে দিতে চাই। তবে এ ব্যাপারে এখনো আমাদের কাজ চলছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাধারণ বেসরকারি স্কুলে সরকারি সহায়তা মেলে। কিন্তু ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোনো সহায়তা নেই। ফলে সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই সরকারের।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অভিভাবকদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট আমিনা রত্না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন মধ্যবিত্তের সন্তানরাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বেশি পড়ছে। কিন্তু এসব স্কুল কোনো নিয়ম-নীতি মানছে না। প্রতিবছর বেতন বাড়ানো হচ্ছে। উচ্চমূল্যে বিদেশি বই কিনতে হচ্ছে। যতই আন্তর্জাতিক কারিকুলাম হোক না কেন, যে দেশে স্কুল পরিচালিত হচ্ছে সেই দেশের সরকারের কি কোনোই নিয়ন্ত্রণ থাকবে না? সরকারের ন্যূনতম হলেও এই শিক্ষায় বিনিয়োগ করা উচিত। ব্যবসায়ী মনোভাবে কোনো শিক্ষাই চলতে দেওয়া উচিত নয়।’

জাতীয় কারিকুলামের অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে ইংলিশ ভার্সন। অর্থাৎ একই স্কুলে একই সঙ্গে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভার্সন চালু আছে। কিন্তু বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায় করা হয়। রাজধানীর বাংলা ভার্সনের নামি স্কুলগুলোর মাসিক ফি এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে হলেও ইংরেজি ভার্সনে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। ইংরেজি ভার্সনে কোচিং-প্রাইভেটও পড়তে হয় উচ্চ বেতনে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে ১৫৯টি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের নিবন্ধন আছে। এতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ৬৪ হাজার ৫০৭। প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘ও’ লেভেলের ৬৪টি, ‘এ’ লেভেলের ৫৪টি এবং জুনিয়র লেভেলের ৪১টি। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড নিবন্ধন দিয়েছে ১০২টি স্কুলের। আর বাংলাদেশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। শিক্ষার্থীসংখ্যা তিন লাখের ওপরে।

মন্তব্য