kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক

প্রাইভেট-কোচিংয়েই হিমশিম অভিভাবক

শরীফুল আলম সুমন   

৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



প্রাইভেট-কোচিংয়েই হিমশিম অভিভাবক

মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা শাহানা বেগমের স্বামী ব্যাংক কর্মকর্তা। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ে পড়ে হলি ক্রস কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে। আর বড় ছেলে সিটি কলেজের অনার্সের ছাত্র। ছোট ছেলে সাতটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে ব্যাচে। প্রতি বিষয়ে এক হাজার ৪০০ টাকা হিসাবে প্রাইভেট টিউটরদেরই দিতে হয় মাসে ৯ হাজার ৮০০ টাকা। স্কুলের ফি মাসে এক হাজার ১৫০ টাকা। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া মেয়ে প্রাইভেট পড়ে চার বিষয়ে। প্রতি বিষয়ে দুই হাজার টাকা হিসাবে তার লাগে মাসে আট হাজার টাকা। তার কলেজের মাসিক ফি দুই হাজার টাকা। আর ছেলের জন্য ছয় মাসের প্রতি সেমিস্টারে দিতে হয় ৪৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসে খরচ আট হাজার ১৬৬ টাকা। শাহানার তিন সন্তানের স্কুল-কলেজের ফি আর প্রাইভেট পড়ার পেছনেই ব্যয় হয় মাসে ২৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া বই-খাতা, স্টেশনারি সামগ্রী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, টিফিন মিলিয়ে আরো লাগে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। দুই সন্তানের বছরের শুরুতে ভর্তি ফি, ইউনিফর্ম ও পরীক্ষার ফি বাবদ মাসে আরো দুই হাজার টাকা লাগে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনেই ব্যয় করতে হয় মাসে ৪৬ হাজার টাকা।

শাহানা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্কুলে তেমন একটা লেখাপড়া হয় না। প্রতি ক্লাসে ৮০ জন করে শিক্ষার্থী। পড়ানোর সময় কই? তাই বাচ্চাদের পড়ালেখা মূলত প্রাইভেট-কোচিংনির্ভর। কিন্তু এসবের পেছনে টাকা ঢালতে ঢালতে সংসার চালানোই দায় হয়। এর পরও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যেভাবেই হোক চলতে হচ্ছে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের স্কুল-কলেজে নানা খাতে বড় অঙ্কের ফি পরিশোধ করতে হলেও পড়াশোনা হয় নামমাত্র। শিক্ষার্থীরা এখন পুরোপুরি নির্ভরশীল কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর। এই খাতে খরচ করতে করতে দিশাহারা অভিভাবকরা। তাই যে অভিভাবকের আয় যত বেশি তার সন্তান তত ভালো মানের পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য শহরের চেয়ে রাজধানীতে পড়ালেখার ব্যয় প্রায় দেড় গুণ। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ফি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় প্রায় সমান।

শিক্ষার বিভিন্ন খাতে ব্যয় নিয়ে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করা হয়েছে গত দুই মাস। খাতগুলো হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফি, বই-খাতাসহ স্টেশনারি সামগ্রী এবং যাতায়াত, ইউনিফর্ম, টিফিন, প্রাইভেট ও কোচিং ইত্যাদি। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মণিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয়ের ১০টি খাত নিয়ে কথা হয়েছে অভিভাবকদের সঙ্গে। তথ্য নেওয়া হয়েছে ময়মনসিংহ, খুলনা, লক্ষ্মীপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলার অভিভাবকদের কাছ থেকেও।

অর্ধশতাধিক অভিভাবকের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে ব্যয় হয় গড়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা। মাধ্যমিক স্তরে এই ব্যয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আর উচ্চ মাধ্যমিকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে পিইসি, জেএসসি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরো বেশি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়া ও কোচিংয়ের পেছনে। এরপর ব্যয় বেশি যথাক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি, সেশন ফি, পরীক্ষার ফি, মাসিক ফি, যাতায়াত ও টিফিন, বই-খাতাসহ অন্যান্য খাতে।

মিরপুরের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ চাকরি করেন একটি বেসরকারি কম্পানিতে। ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে মণিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। আর মেয়ে পড়ে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে। ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ছেলের মাসিক ফি এক হাজার ৩৫০ টাকা, পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা, কোচিংয়ে দিতে হয় তিন হাজার টাকা। আর মেয়ের মাসে ফি এক হাজার ৬৫০ টাকা এবং দুটি কোচিংয়ের ফি লাগে ছয় হাজার টাকা। এ ছাড়া যাতায়াত, টিফিন, বই-খাতা মিলিয়ে দুজনের পেছনে আরো যায় প্রায় আট হাজার টাকা। সব মিলিয়ে খরচ হয় ২০ হাজার ২০০ টাকা। অথচ আমি বেতন পাই ৪০ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মাসেই দেনা বাড়ছে।’

বেসরকারি চাকুরে অনুপ গুহ ঠাকুরতার এক মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে এবং আরেক মেয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে ভিকারুননিসায়। বড় মেয়ের স্কুলের ফি মাসে এক হাজার ৩০০ টাকা, চারটি কোচিংয়ে লাগে তিন হাজার টাকা। ছোট মেয়ের মাসিক ফি এক হাজার টাকা, দুটি কোচিংয়ে লাগে চার হাজার টাকা। টিফিন, বই-খাতা ও যাতায়াত মিলিয়ে দুজনের পেছনে আরো ব্যয় ১০ হাজার টাকা। বছরের শুরুতে ভর্তি, ইউনিফর্ম বাবদ আরো লাগে ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দুজনের লেখাপড়ার খরচ মাসে ২২ হাজার টাকা। অনুপ গুহ ঠাকুরতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি ক্লাসে ৮০ থেকে ৮৫ জন ছাত্রী। ক্লাসে তো কিছুই শিখতে পারে না। ফলে দৌড়াতে হয় প্রাইভেট-কোচিংয়ের পেছনে। এমনও অভিভাবক আছে যারা এক মেয়ের পেছনেই মাসে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করে। সেই মেয়েটা অবশ্যই আমার মেয়ের চেয়ে ভালো শিখছে!’

খুলনার হোমিও চিকিৎসক আরিফা মামুনের দুই মেয়ের একজন পড়ে খুলনা করোনেশন স্কুলে দশম শ্রেণিতে, আরেকজন খুলনা সরকারি আজম খান কমার্স কলেজে ম্যানেজমেন্টে। আরিফা মামুন বলেন, ‘সরকারি স্কুল-কলেজ হওয়ায় খুব একটা বেতন নেই; কিন্তু তাতে কি! দশম শ্রেণির মেয়েটাকে চারটি কোচিং করতে হয়। এতে যায় ১০ হাজার টাকা। কোচিংয়ের জন্য রিকশা রিজার্ভ করে দেওয়া আছে। রিকশাচালককে দিতে হয় ছয় হাজার টাকা। কলেজে পড়া মেয়ের তিনটা প্রাইভেটের পেছনে ব্যয় হয় ৯ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ তো আছেই। সব মিলিয়ে দুই মেয়ের পেছনে ৩০ হাজার টাকা খরচ। একেবারে টাই টাই চলতে হয়।’

ময়মনসিংহের অভিভাবক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে জিলা স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাকে ছয়টা প্রাইভেট পড়তে হয়। স্কুলের বেতন মাসে ১২ টাকা হলেও প্রাইভেটের পেছনে ঠিকই ১০ হাজার টাকা চলে যায়। আরেক ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তাকেও প্রাইভেট পড়াতে হয়। এখন কোচিং-প্রাইভেটেই স্কুলের চেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

লক্ষ্মীপুরের অভিভাবক এম এ রহিম বলেন, ‘আমার ছেলে রায়পুর সরকারি মার্চেন্ট একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সামনে জেএসসি পরীক্ষা, প্রায় সব বিষয়েই প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে। এ খাতেই ব্যয় করতে হয় ১৫ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ তো আছেই। দিন যত যাচ্ছে গরিবের জন্য লেখাপড়া কঠিন হয়ে পড়ছে। পড়াশোনা এখন পুরোপুরি প্রাইভেট-কোচিংনির্ভর।’

ফরিদপুর সরকারি জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক আখতার হোসেন বলেন, ‘স্কুলের খরচ নেই বললেই চলে। পাঠ্য বইও সরকার দেয়; কিন্তু তাতে কি! প্রতি বিষয়ের দুই-তিনটা সহায়ক বই কিনতে হয়। ব্যাচে দুটি বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। সপ্তাহে তিন দিন করে পড়ায়। তাতে যায় দুই হাজার টাকা। বাসায় একজন শিক্ষক আসে, তাকে দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। যাতায়াত, খাতা-কলম, টিফিন মিলিয়ে ছেলের পড়ালেখার পেছনে খরচ হয় মাসে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। সামনে পিইসি পরীক্ষা। কষ্ট হলেও খরচ করতেই হচ্ছে।’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন ক্লাসরুমে এমনভাবে পড়ানো হচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিংয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া পরীক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে চলছে গ্রেড ভালো করার প্রতিযোগিতা। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতেও দলীয় নেতাদের আধিপত্য। ফলে তারাও মনিটর করতে পারছে না। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের শুধু আর্থিকভাবেই নয়, মানসিক চাপও বাড়ছে।’

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার মূল খরচ প্রাইভেট-কোচিং ও নোট-গাইড। তবে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা যাতে প্রাইভেট-কোচিংয়ে যুক্ত হতে না পারেন সে জন্য আমরা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে ঠিকভাবে পড়ালেখা হয় সে ব্যাপারে মনিটরিং বাড়িয়েছি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও করণীয় আছে। তারা চাপ দিলে স্কুলের শিক্ষকরা প্রাইভেট-কোচিং করাতে ভীত হবেন। অর্থাৎ আমাদের চেষ্টার সঙ্গে অভিভাবকদেরও যোগ দিতে হবে। তবে ফ্রিল্যান্স কোচিং থাকতে পারে। যার প্রয়োজন মনে হবে সে করবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ প্রতিবেদনেও দেখা যায়, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ২৯.১৩ শতাংশ ব্যয় হয় প্রাইভেট ও কোচিংয়ের পেছনে। শহরে এই ব্যয় আরো বেশি ৩২.৮০ শতাংশ আর মফস্বলে ২৬.২০ শতাংশ।

জানা যায়, দেশে ২০০৯ সালে চালু হয় সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি। আগে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের শুধু ইংরেজি, ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও অ্যাকাউন্টিং এবং বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হতো। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের বাংলা, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ের মতো বিষয়েও প্রাইভেট-কোচিং করতে হয়। এতে অভিভাবকদের ব্যয় বাড়ছে।

আগে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের মাত্র ছয়টি বই পড়তে হতো। কিন্তু এখন পড়তে হয় ১৩টি বিষয়। ফলে পঞ্চম শ্রেণিতে ছয়টি বিষয় পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই ১৩টি বিষয়ের চাপ নিতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। এতে প্রাইভেট-কোচিংয়ের পেছনে দৌড়াতে হয়। কিন্তু কারিকুলাম নিয়ে যাদের কাজ করার কথা সেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তাদের আসল কাজ ফেলে পাঠ্য বই ছাপানো নিয়ে ব্যস্ত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা