kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ মত

শ্রীলঙ্কার অনেকের মধ্যেই কিছু একটা ঘটার শঙ্কা ছিল

ইমতিয়াজ আহমেদ

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রীলঙ্কার অনেকের মধ্যেই কিছু একটা ঘটার শঙ্কা ছিল

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের পর ১০ বছর হয়ে গেছে। পর্যটন খাত আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। আমি কিছুদিন শ্রীলঙ্কায় ছিলাম। সেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যে সম্পর্ক তা যে খুব একটা মধুর ছিল তা বলব না। আমি নিজেই বারবার বলছিলাম যে ‘কাম (Calm) বিফোর দ্য স্টর্ম ’ (ঝড়ের আগের শান্ত পরিস্থিতি)। বোঝাই যাচ্ছিল, এক ধরনের অসহিষ্ণুতা। দিন দিন তা বাড়ছিল। এটি মোটামুটি পরিষ্কারও হচ্ছিল। কিন্তু এত বড় আকারে একটা ঘটনা ঘটবে সেটি হয়তো চিন্তা করা যায়নি। কিন্তু অনেকেই বলা শুরু করেছিল যে শ্রীলঙ্কায় কিছু একটা হচ্ছে। বেশ কিছু কারণে। এখানে ভূরাজনৈতিক কারণ, অভ্যন্তরীণ সংকটও আছে। মানুষের মধ্যে বলতে গেলে ভয়ভীতি ছিল।

শ্রীলঙ্কায় গত রবিবারের হামলার ব্যাপারে এত তাড়াতাড়ি উপসংহার টানা ঠিক হবে না। যদিও দেখছি, অনেকে উপসংহার টানার চেষ্টা করছে। আমার মনে হয়, এর সময় এখনো আসেনি। বেশ কতগুলো কারণে এটি ঠিকও নয়।

একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা। তিনটি শহরে একই সঙ্গে বোমাগুলো বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এগুলো বড় মাত্রার বিস্ফোরণ। এর অর্থ হলো হামলাগুলো যথেষ্ট পরিকল্পিত। এটি এক-দুই দিনের কাজ নয়। অন্তত বেশ কয়েক মাসের।

এখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এভাবে ব্যর্থ হলো, কোনোটাই ধরতে পারল না—এর কারণ নিয়ে আরো গবেষণা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, পুলিশপ্রধান নিজেই বলছেন যে গত ১০ এপ্রিল তিনি একটি চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে এ ধরনের হামলা হতে পারে এবং একটি গোষ্ঠীর নামও বলেছিলেন। তার পর কেন সেটি গুরুত্ব দেওয়া হলো না? সেই জায়গায় বিষয়টি যদি দেখি তাহলে দেখতে পারব শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী বলার চেষ্টা করছেন যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্বের ফলে যে তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়া উচিত সেটি ঠিক সেভাবে যায়নি। সেই ধরনেরই একটি ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। এর কারণ হলো—নিরাপত্তার বিষয়টি প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারে। তাই যদি হয়ে থাকে তবে তারা হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য কেন জানতে দিল না?

একই সঙ্গে যে বিষয়টি দেখা দরকার তা হলো—বলা হচ্ছে যে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের খবর দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা কিভাবে জানল? যদি জেনেই থাকে তবে বিদেশি সেই সংস্থা তাদের নিজের দেশের লোকদের কেন সাবধান করে দিল না? দেখা গেছে, হতাহতদের মধ্যে সেই দেশের লোকেরাও আছে। তাই এ বিষয়ে বাড়তি অনুসন্ধান, গবেষণা ছাড়া সম্ভব নয়।

তৃতীয় যে বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার তা আরো জটিল। যদিও ইস্টারে হামলা করা হয়েছে এবং একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে। তবে এটিও দেখা যাচ্ছে, বড় বড় তিনটি পাঁচ তারা হোটেলে হামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে কিংসবারি ও সিনামন হোটেল শ্রীলঙ্কার মালিকানায় আছে। আক্রান্ত অপর হোটেল সাংগ্রিলা মালয়েশিয়ার মালিকানাধীন। এতেও বোঝা যাচ্ছে, এক ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। যে পর্যটন খাত নিয়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি চালিত হয় সে জায়গায় আঘাত করা হয়েছে। এখানে তো বোঝা যাচ্ছে যে ধর্মের সঙ্গে এই হামলার সম্পর্ক নেই। তাহলে এই ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে তারা কী বার্তা দিচ্ছে?

চতুর্থ বিষয়টি হলো—এমন সময় ঘটনাটি ঘটেছে যার প্রভাব এই উপমহাদেশে কম-বেশি পড়বে। এর একটি বড় কারণ হলো যেহেতু শ্রীলঙ্কায় বিভিন্ন ধর্ম-গোষ্ঠীর লোক আছে এবং ওই একই ধর্ম-গোষ্ঠী ও ভাষার লোক শ্রীলঙ্কার বাইরেও আছে, বিশেষ করে এই উপমহাদেশে। সেই অর্থে এমন একটি সময় হামলাগুলো হলো যার প্রভাব না পড়ার কোনো কারণ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেভাবে এই হামলার খবর প্রচার করছে তা থেকেও বোঝা যাচ্ছে যে এই হামলার প্রভাব ইতিমধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে, ভারতের নির্বাচন চলছে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সমস্যা বড় আকারে তৈরি হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় এবং এ অঞ্চলে এই হামলায় কে লাভবান হবে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশ্লেষণে এ বিষয়গুলো আসবে।

এর কারণ হলো—বারবার শ্রীলঙ্কার সরকার বলছে যে তাদের প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে হামলাটি দেশের লোকজনই করেছে। দেশের লোকেরাই যদি করে থাকে এবং তাতে আমরা যদি একটু নজর দেই তাতে বোঝা যাচ্ছে যে শ্রীলঙ্কায়ও কিন্তু এ বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের সঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সম্পর্কে নতুন একটি মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, আগে সিরিসেনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের যে সম্পর্ক ছিল সেটি এখন আর নেই বললেই চলে।

হামলাগুলো শ্রীলঙ্কানরাই ঘটিয়েছে—এমনটি যখন বলা হচ্ছে তখন আমি মনে করি, যে পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণ না পাওয়া যাবে সে পর্যন্ত কোনো সমাধানে পৌঁছা ঠিক হবে না। চার্চের ফাদারও প্রথম দিনই বলেছেন, তদন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে।

 

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক।

(অনুলিখন : মেহেদী হাসান)

 

মন্তব্য