kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

এবার শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমায় নিহত ২৯০

জরুরি অবস্থা জারি সন্দেহে এনটিজে

রক্তাক্ত ইস্টার সানডে : সতর্কতা পুলিশ পেয়েছিল আগেই। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ বিদেশি ৩৭, আহত ৫০০

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জরুরি অবস্থা জারি সন্দেহে এনটিজে

হামলার পর রক্ত ছিটকে এসে লাগে যিশুর প্রতিকৃতিতে।

রবিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা—আধাঘণ্টায় ছয়টি বিস্ফোরণ। কেঁপে ওঠে শ্রীলঙ্কার তিনটি ক্যাথলিক চার্চ আর তিনটি পাঁচতারা হোটেল। এখানেই শেষ নয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরো দুটি। সব মিলিয়ে আটটি বিস্ফোরণে রক্তের অববাহিকায় রূপ নেয় দ্বীপরাষ্ট্রটি। ইস্টার সানডের সকালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগে ভরে যায় যিশুর প্রতিকৃতি।

আত্মঘাতী এ সিরিজ হামলায় প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা মৃতের সংখ্যা শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৯০ জনে দাঁড়িয়েছে। আহতের সংখ্যা অন্তত ৫০০। নিহতদের মধ্যে এক বাংলাদেশি শিশুসহ ৩৭ জন বিদেশি নাগরিক।

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় এ প্রাণহানির দায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। তবে সরকারের অভিযোগ, ইসলামপন্থী উগ্র সংগঠন ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত (এনটিজে) এই হামলা চালিয়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৪টা পর্যন্ত জারি থাকবে কারফিউ। ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যের কমিটি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দিন দশেক আগে পুলিশের পক্ষ থেকে হামলার বিষয়ে সতর্ক করা হলেও কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?

আত্মঘাতী হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া তিনটি চার্চ হলো—রাজধানী কলম্বোর সেইন্ট স্টুয়ার্ট অ্যান্থনি ক্যাথলিক চার্চ, পশ্চিম উপকূলীয় রেগোম্বো শহরের সেইন্ট সেবাস্টিয়ান ক্যাথরিক চার্চ এবং পূর্ব উপকূলীয় বাত্তিকালোয়ার জিয়ন চার্চ। রক্তাক্ত হওয়া কলম্বোর তিনটি পাঁচতারা হোটেল হলো—সিনামোন গ্র্যান্ড, শাংরি লা এবং কিংসবেরি। প্রথম হামলাটি হয় স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে। এরপর ৯টার দিকে হামলা হয় বাকি দুটিতে। এই সময়ের মধ্যে হামলার শিকার হয় চার্চ তিনটিও। হামলার সময় ছয়টি স্থানেই ইস্টার সানডে উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ছিল।

দুপুরের পর দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। এর একটি ঘটে কলম্বোর দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি হোটেলে। সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়। আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার একটি বাড়িতে। সেখানে তল্লাশি চালাতে গেলে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া কলম্বোর প্রধান বিমানবন্দরে একটি বোমা পাওয়া যায়। তবে বিস্ফোরণের আগে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।

শ্রীলঙ্কার দুই কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে খ্রিস্টান ৬ শতাংশ। এর আগেও তারা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কিন্তু এবারের ভয়াবহতা আগের সব নজিরকে তুচ্ছ করে দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

সেইন্ট সেবাস্টিয়ান চার্চে প্রাণ হারিয়েছে ৭৪ জন। সেখানে হামলার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন এন এ সুমনপালা। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে রক্তের স্রোত। চারপাশ দিয়ে এমনভাবে ছাই উড়ছিল, যেন আকাশে কালো মেঘ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি সাহায্য করতে চার্চের দিকে দৌড়ে যাই; দেখি ভেতর থেকে এক যাজক বেরিয়ে আসছেন। তাঁর পুরো শরীর রক্তে ভেজা।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে হামলাকারী খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। একপর্যায়ে সে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। হোটেলটি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত। হোটেলের এক ব্যবস্থাপক বলেন, ‘ব্যবসায়িক কাজের কথা বলে গত রাতে (শনিবার) আজম মহম্মদ নামে এক শ্রীলঙ্কান হোটেলে উঠেছিল। সে যে ঠিকানা দিয়েছিল, পরে দেখা যায় সেটি ভুয়া।’ ওই ব্যক্তিই আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে ধারণা ম্যানেজারের।

সতর্কতা ছিল

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, তারা একটি নথি পেয়েছে। ওই নথি অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধান পুজুথ জয়াসুন্দারা শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, ভারতীয় হাইকমিশনসহ ক্যাথলিক বড় চার্চগুলোতে আত্মঘাতী হামলা হতে পারে। আর জয়াসুন্দারা বিষয়টি জেনেছিলেন বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর, তাদের দেশের গোয়েন্দারাই বিষয়টি শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধানকে জানিয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও স্বীকার করেছেন যে হামলার বিষয়ে আগাম বার্তা ছিল। তার পরও এ ব্যাপারে কেন পদক্ষেপ নেওয়া হলো না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ বিদেশি ৩৭

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৭ জন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি জায়ান চৌধুরীও (৮) রয়েছে। বাকি ৩৬ জনের মধ্যে আটজন যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ভারতের তিনজন, তুরস্কের দুজন ও পর্তুগালের একজন রয়েছে। নিখোঁজ ছিল ৯ বিদেশি। নিহতদের মধ্যে পরিচয় মেলেনি ২৫ জনের। ধারণা করা হচ্ছে, এই ২৫ জনের মধ্যে ৯ বিদেশির লাশও আছে।

এদিকে নিহতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেউ আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, ‘হতাহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আমেরিকান রয়েছে।’ তবে ভারতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানিয়েছে, তাদের কোনো নাগরিক নিহত হয়নি।

গ্রেপ্তার ২৪

হামলার পর থেকে গতকাল রাত পর্যন্ত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানী কলম্বো এবং আশপাশের এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের ব্যাপারে পুলিশ বিস্তারিত কোনো তথ্য জানায়নি। পুলিশ বলছে, সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, হামলার নেপথ্যে কোনো বিদেশি গোষ্ঠীর হাত রয়েছে কি না।

এনটিজের প্রতি অভিযোগ

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে শ্রীলঙ্কা সরকার বলছে, ইসলামপন্থী স্থানীয় উগ্র সংগঠন ন্যাশনাল তাওহিদ জামায়াত (এনটিজে) এই হামলা চালিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র রাজিথা সেনারত্নে বলেন, ‘আমরা এখন এটাই খতিয়ে দেখছি যে এনটিজের পেছনে বাইরের কোনো শক্তির হাত রয়েছে কি না। কেননা, এত ছোট একটি সংগঠনের পক্ষে একা এত বড় হামলা চালানো সম্ভব নয়।’

মুসলিম কাউন্সিল অব শ্রীলঙ্কার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ দাবি করেন, তিনি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে প্রায় তিন বছর আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এনটিজে যেকোনো সময় আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারে।

এনটিজের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ধর্মীয় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া সংগঠনটি এর আগে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিমা ভাঙচুর করেছে। ধর্মীয় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল রাজিককে ২০১৬ সালে গ্রেপ্তারও করেছিল পুলিশ।

শ্রীলঙ্কার এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, এনটিজেকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের শ্রীলঙ্কা শাখা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এদিকে জঙ্গিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা প্রতিষ্ঠান—সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ দাবি করেছে, আইএস রবিবারের সিরিজ হামলা উদ্যাপন করেছে।

তদন্ত কমিটি

হামলার কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা। কমিটিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর প্রধান করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বিজিৎ মালালগোদাকে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন—সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী পদামাসিরি ও সাবেক আইজিপি এন কে ইলানগাকুন।

বিশ্বনেতাদের নিন্দা

হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। তাঁদের মধ্যে আছেন পোপ ফ্রান্সিস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডান, মিসরের আল-আজহারের গ্র্যান্ড ইমাম আহমেদ আল-তায়েব, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, ‘প্রার্থনার সময় হামলা করা হয়েছে। এ ধরনের নিষ্ঠুর সহিংসতার শিকার যারা হয়েছে, তাদের সবার প্রতি আমি সহমর্মিতা জানাই।’ ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শ্রীলঙ্কানদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা সহায়তার জন্য প্রস্তুত আছি।’ সূত্র : বিবিসি, এএফপি।

 

মন্তব্য