kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ব্যাংকের সিএসআরের টাকায় পুলিশকে ফ্ল্যাট

জিয়াদুল ইসলাম   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্যাংকের সিএসআরের টাকায় পুলিশকে ফ্ল্যাট

নীতিমালা ভেঙে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত ২২ কর্মকর্তাকে ফ্ল্যাট কেনার জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নির্দেশনায় ১০ থেকে ১২টি ব্যাংক ওই কার্যক্রমে অংশ নেয়। এর আগে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভায় এসংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, ওই অর্থ সহায়তা দেওয়া হয় গত বছরের নভেম্বরে। ওই ঘটনা ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স বিভাগ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকটি ব্যাংক এ ধরনের কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে জেনেছি। এটা সিএসআর নীতিমালার পরিপন্থী হয়েছে। বিষয়টি আমাদের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স বিভাগ আরো খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।’

জানা যায়, একটি বিশেষ কাজে সম্পৃক্ত থাকার স্বীকৃতিস্বরূপ ওই পুলিশ সদস্যদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার পরিপন্থী। কারণ সিএসআর নীতিমালায় যেসব খাতে অর্থ খরচ করার নিয়ম আছে তাতে ওই বিশেষ অবদানের উল্লেখ নেই। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ফ্ল্যাট কেনা বাবদ প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ৩৬ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে ২২ পুলিশ সদস্যের পেছনে ব্যাংকগুলোর খরচ হয়েছে প্রায় আট কোটি টাকা। ওই তহবিল থেকে পুলিশ সদস্যদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই এর বিরোধিতা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিএসআর অনিয়মের বিষয়ে আপত্তি তুলেছিলেন ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক) মনোজ কুমার বিশ্বাস। কিন্তু তাঁর আপত্তি উপেক্ষা করেই ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির সভায় দুই পুলিশ সদস্যের অনুকূলে সিএসআর তহবিল থেকে মোট ৭২ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিদ্যমান সিএসআর নীতিমালা ভেঙে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়োজিত পর্যবেক্ষকের মতামত উপেক্ষা করে পুলিশ বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাকে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের অনুমোদন ব্যাংক কম্পানি আইনের ৪৫ ধারার লঙ্ঘন এবং একই আইনের ১০৯(১১) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মনোজ কুমার বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নীতমালা ভেঙে ওই পুলিশ সদস্যদের ব্যাংকের সিএসআর থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং বিষয়টি ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনও করা হয়। বিষয়টি নীতিমালার পরিপন্থী হওয়ায় আমি আপত্তি তুলি এবং এ বিষয়ে আমার প্রতিবেদন দিয়েছি।’ এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।

সূত্র মতে, অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায়ও পুলিশ সদস্যদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব উঠলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক পর্যবেক্ষক আপত্তি তোলেন; কিন্তু তা উপেক্ষা করে প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়।

জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকার মিরপুর ১৫ নম্বর সেকশনে ১০০টি ফ্ল্যাট প্রকল্পের আওতায় পুলিশের বিশেষ শাখার ২২ সদস্যের প্রত্যেককে একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট কেনার জন্য সিএসআর তহবিল থেকে ওই পুলিশ সদস্যদের অর্থ সহায়তা দিয়েছে ব্যাংকগুলো। অর্থ সহায়তা পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন মাহবুব হোসেন বিপিএম (বার) পিপিএম, আজিজুর রহমান চৌধুরী বিপিএম, জুয়েল আমিন পিপিএম, সৈয়দ সফিকুল ইসলাম পিপিএম, মো. মশিউর রহমান, জুবায়ের আহমেদ খান, জসিম উদ্দিন, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. শামিম আহমেদ, মো. আবুল কালাম আজাদ, বুলবুল আহমেদ, ইদ্রিস মাহমুদ, মো. শাহ আলম, নূরুল আমিন, তরিকুল সালাম, মাসুম তালুকদার, নূর আলম হোসেন, মো. জফির উদ্দিন, আবদুস সালাম, সেলিনা আফরোজ, শফিকুল ইসলাম ও পুইই লুসাই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিএসআর তহবিলের টাকা সেখানেই ব্যয় হওয়ার কথা, যেখানে পিছিয়ে পড়া জনগণ ও সমাজের উপকার হয়। কোনো বিশেষ সুবিধা বা অবদানে এ অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালাও করে দিয়েছে। এ নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংককে অ্যাকশনে যেতে হবে। এটা না করলে অন্যরাও একই কাজে উৎসাহিত হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিএসআরের টাকা ব্যাংকগুলো কোথায়, কী কাজে খরচ করবে সেটি নীতিমালায় নির্দিষ্ট করে বলা আছে; কিন্তু প্রায়ই শোনা যায়, এই নীতিমালা ভেঙেই ব্যাংকগুলো ভিন্ন খাতে সিএসআর ব্যয় করে। এটা ধরার দায়িত্ব অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর হতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকগুলোর এ ধরনের কার্যক্রম সিএসআর হতে পারে না। এটা সিএসআরের আওতায়ও পড়ে না। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান সিএসআর নীতিমালারও পরিপন্থী। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় সিএসআর ব্যয়ের যেসব খাত উল্লেখ আছে তাতে কোনো বিশেষ অবদান রাখা সরকারি কর্মকর্তারা পড়েন না। এ ছাড়া সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের গৃহ নির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য ৫ শতাংশ ভর্তুকিসহ স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মুনাফার যে অংশ সামাজিক কাজে ব্যয় করে সেটাই সিএসআর নামে পরিচিত। সিএসআর কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে ২০০৮ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকেই ব্যাংকগুলো মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করছে। এ বিষয়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জারি করা নীতিমালায় অর্থ ব্যয়ের খাত ও সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, মোট সিএসআর ব্যয়ের ৩০ শতাংশ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে ব্যয় করা যাবে। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত জনগণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা খাতে ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করার নিয়ম আছে। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে আরেক সার্কুলারের মাধ্যমে সিএসআর ব্যয়ের ১০ শতাংশ অর্থ জলবায়ু খাতে খরচের জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব কড়াকড়ি সত্ত্বেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিএসআর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ওই খাতের বেশির ভাগ অর্থ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তদবিরে ব্যয় হচ্ছে।

মন্তব্য