kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

নারী নির্যাতন-হত্যার বিচার শেষ হয় না

রেজাউল করিম   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নারী নির্যাতন-হত্যার বিচার শেষ হয় না

যৌন হয়রানির বিচার চাইতে গিয়ে ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি খুন হওয়ার পর দেশ যে রকম উত্তাল হয়ে উঠেছে সে রকম হয়েছে আগেও বিভিন্ন সময়ে। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লায় খুন হয়েছিলেন কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। ওই ঘটনায়ও উত্তাল হয়ে উঠেছিল সারা দেশ। দাবি উঠেছিল দ্রুত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার। তিন বছরেও ওই মামলায় অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। একই বছরের ২৪ আগস্ট রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রিশার ওপর হামলা করেছিল বখাটে ওবায়দুল। চার দিনের মাথায় মারা গিয়েছিল রিশা। ওই হত্যা মামলার বিচারও শেষ হয়নি।

৩০ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে স্বামীর নির্যাতনে নিহত হয়েছিলেন সীমা মোহাম্মাদী। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্যের অভাবে শেষ হচ্ছে না ওই হত্যা মামলার বিচার। খোঁজ নেই আসামির। এরই মধ্যে মারা গেছেন সীমার মা (মামলার বাদী) ও বাবা।

নারী নির্যাতন ও হত্যার এ রকম দেড় লক্ষাধিক মামলার বিচার ঝুলে আছে বছরের পর বছর। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞরা বলেছেন, দ্রুত বিচার করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ওই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না।

ওই ধরনের ঘটনায় সাধারণত মামলা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। এসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে আইনে ১৮০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের হিসাব মতে, দেশে গত ১ জানুয়ারি পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া এক লাখ ৬০ হাজার ৭৫১ মামলা বিচারাধীন। সেগুলোর মধ্যে ৩৬ হাজার ৪৬৭টি মামলা বিচারাধীন পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। এর বাইরেও হাজারখানেক মামলার বিচার স্থগিত আছে উচ্চ আদালাতের আদেশে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নারী নির্যাতনের ঘটনায় ৯৭ শতাংশ মামলায় কোনো সাজা নেই।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে যেসব মামলা বিচারাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে একটি বড় সংখ্যা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। কোনো কোনো মামলা ২০-২৫ বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচন কেন্দ্র করে নোয়াখালীতে দুটি আলোচিত গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার বিচার শুরু হয়নি। রাফির হত্যাকাণ্ডের মতো আলোচিত ঘটনা ঘটেছে বিগত বছরগুলোতেও। তনু, মিতু ও রিশা হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো আলোর মুখ দেখেনি। গণমাধ্যমের খবরে না আসা হাজারো এ রকম বর্বর ঘটনা রয়েছে, যেগুলো আমরা অনেকে জানিই না।’ তিনি বলেন, ‘এসব মামলার বিচারে বিলম্ব হওয়ার মূল কারণ হলো, আসামিরা সব সময় প্রভাবশালী। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা চলাফেরা করে। বছরের পর বছর ঝুলে থাকে তদন্ত। এ রকম মামলা সাধারণত পুলিশ তদন্ত করে থাকে। পুলিশের কাছে সব ধরনের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে পুলিশ দায়িত্বভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। সদিচ্ছারও অভাব থাকে। আবার যদি বিচারালয়ের কথা বলি, সেখানেও অনেক বেশি মামলা থাকায় বিচারে বিলম্ব হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার করতে দেশে যত সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল আছে, তা পর্যাপ্ত নয়। দায়িত্বে থাকা আইনজীবীদেরও গাফিলতি থাকে।’

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বিচারকাজ হয় একেবারেই ধীরগতিতে। অথচ আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করার কথা। তিনি আরো বলেন, এসব মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করতে পুলিশ সময় নষ্ট করে বছরের পর বছর। আদালতে মামলার চাপ বেশি থাকায় বিচার শুরু করতে দেরি হয়। বিচার শুরু হলে সাক্ষী হাজির করা যায় না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার বিচার বিলম্ব হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, মামলা তদন্ত সঠিকভাবে হয় না। তদন্ত হলেও সাক্ষী আদালতে হাজির হয় না। আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত আদালত নেই। আবার আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় নানাভাবে মামলার বিচারে প্রভাব বিস্তার করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সরকারকে বলতে চাই, নারী নির্যাতনের ঘটনার মামলাগুলো দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আইনে একটি সময়সীমা রয়েছে, তা নিশ্চিত হয় না কোনো মামলায়। এ জন্য বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ধার্য করে দিয়ে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। রাফি হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত করতে হবে। এই নারকীয়তার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

সুলতানা কামাল বলেন, অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে আসামি জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। তারা জামিনে থেকে নানাভাবে বিচারকাজ প্রভাবিত করে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়। তিনি আরো বলেন, ‘এসব মামলার বিচারকাজে জড়িত আইনজীবী ও বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতেও উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। আর এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের সমন্বয়ে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে হবে।’

সালমা আলী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলার অন্যতম সাক্ষী হলেন ডাক্তার, যিনি মামলা রুজু হওয়ার আগে ভিকটিমের মেডিক্যাল রিপোর্ট দেন। বেশির ভাগ মামলার ক্ষেত্রে ডাক্তারকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে আনতে অনেক সময় লেগে যায়। আবার বিচার শেষ হয় এমন দেরিতে, যখন ঘটনা সবাই ভুলে যায়। তিনি আরো বলেন, বিচারে বিলম্ব হলে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বিচারপ্রার্থী। অপরাধীরাও সুযোগ পেয়ে যায়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে মামলার দীর্ঘসূত্রতা দৃষ্টি এড়ায়নি উচ্চ আদালতেরও। ২০১৬ সালের এপ্রিলে দায়ের করা এক গৃহবধূ হত্যা মামলার বিচার ১৮০ কার্যদিবসে কেন শেষ হয়নি আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তার জবাব দিতে গত মঙ্গলবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। নিহত গৃহবধূর স্বামীকে ঘটনার পরপরই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।   

আরো যত মামলা : কাচের গ্লাস ভাঙার অভিযোগে ২০১৩ সালের মার্চে ঢাকায় গৃহকর্মী জেসমিন আক্তারকে (১৮) অমানবিক নির্যাতন করেছিলেন গৃহকর্ত্রী। পরে বরিশালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসমিন মারা গেলে তাঁর বাবা হত্যা মামলা করেছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত ইসরাত জাহান নাসরিন ও নাজমা আক্তারকে অভিযুক্ত করে ২০১৪ সালে অভিযোগপত্র দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য ২০১৬ সালের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।

২০১৭ সালের জুনে বরিশালে গৃহবধূ সীমা রানীকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল যৌতুকের জন্য। ওই ঘটনায় মামলা হলেও বিচার শুরু হয়নি।

যশোরের ঝিকরগাছার খাদিজা আক্তার বিথীকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে মারধর করে হত্যা করেছিলেন তাঁর স্বামী। ওই ঘটনায় মামলা হলেও এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

২০১৬ সালের মার্চে রাজধানীর কাফরুলে গৃহকর্মী জনিয়াকে (১৫) ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠলেও কাফরুল থানায় প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে হয়েছিল হত্যা মামলা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার আলামত মেলে। এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

২০১৬ সালের নভেম্বরে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাখেলা বেগমকে হত্যা করা হলেও বিচার শুরু হয়নি।

২০১৬ সালের মে মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছিল গৃহকর্মী হাসিনার। ১১ বছর বয়সী হাসিনার সারা শরীরে ছিল নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। তাকে ধর্ষণ করার তথ্য উল্লেখ ছিল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ওই মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

 

 

মন্তব্য