kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ওয়াসার পানিতে দুর্নীতির বিষ

পানি ফোটাতে বছরে খরচ ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ওয়াসার পানিতে দুর্নীতির বিষ

ঢাকা ওয়াসার নিম্নমানের পানি ও পয়োনিষ্কাশন সেবায় রাজধানীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সেবাগ্রহীতা অসন্তুষ্ট। ওয়াসার অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সেবন করে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছে নগরবাসী। ওয়াসার পানি ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করতে প্রতিবছর ৩৩২ কোটি টাকার বেশি জ্বালানি খরচ হয়। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। গতকাল বুধবার ‘ঢাকা ওয়াসা : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্য থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে এক হাজার ৭৬৮ জন সেবাগ্রহীতার ওপর জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি।

জরিপে অংশ নেওয়া সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে সাড়ে ৫১ শতাংশ ব্যবহারকারী ওয়াসার পানিকে অপরিষ্কার এবং ৪১.৪ শতাংশ দুর্গন্ধযুক্ত বলে অভিযোগ করেছে। ঢাকার মিরপুর, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মালিবাগ, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সেবাগ্রহীতারা বেশি অভিযোগ করেছে। ঢাকা ওয়াসার ভূউপরিস্থ পানির উৎস অধিক মাত্রায় দূষিত হওয়ার কারণে পরিশোধনের পরও স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না। ওয়াসার সরবরাহ করা পানি পান করে ২৪.৬ শতাংশ পরিবারের সদস্য পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ৯১ শতাংশ ব্যবহারকারীর ওয়াসার পানির ওপর আস্থা না থাকায় পানি ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে প্রতিবছর ৩৩২ কোটি ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৬২০ টাকা মূল্যের জ্বালানি খরচ হয়।

একই সঙ্গে গবেষণায় বলা হয়, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পানির উৎপাদন ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণে গত ১০ বছরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে ওয়াসার পাম্পের সংখ্যা ৪৮২ থেকে বেড়ে ৯০০ হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ভূউপরিস্থ পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির অনুপাত ৭০ঃ৩০ করার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে তা ২২ঃ৭৮ রয়েছে। এখনো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ৭৮ শতাংশ নির্ভরতা রয়েছে ওয়াসার। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে।

পয়োনিষ্কাশন সেবা ঢাকা ওয়াসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও ১৯৯০ সালের পর সংস্থাটি নতুন করে পয়োনিষ্কাশন লাইন তৈরি করেনি। দৈনিক উৎপাদিত ১৪ লাখ টন পয়োবর্জ্যের বিপরীতে ওয়াসার বিদ্যমান ট্রিটমেন্ট প্লান্টে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পয়োবর্জ্য পরিশোধন করতে পারে। ফলে বাকি সাড়ে ১৩ লাখ ঘনমিটার পয়োবর্জ্য বিভিন্ন খাল হয়ে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদের পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।

১৯৮৯ সালে ঢাকা ওয়াসার কর্মপরিধিতে নর্দমা পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যুক্ত করা হয়। সংস্থাটির আওতায় ৩৫০ কিলোমিটার নর্দমা, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট এবং ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল রয়েছে। ২৬টি খালের মধ্যে ২০টির প্রবাহ ঠিক আছে, ওয়াসা এমন দাবি করলেও বাস্তবে তা নেই বলে জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে নর্দমা ও খাল পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। চুক্তিভিত্তিক পদসহ বিভিন্ন পদে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওয়াসার বোর্ড সদস্যদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষার নজিরও রয়েছে ওয়াসা প্রশাসনের। এ ক্ষেত্রে ২০১৭ সালে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ওয়াসার বোর্ড তিনজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত বাছাই ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও ওয়াসা প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করার নজির টানা হয়েছে গবেষণায়।

মিটার না দেখে গড়পড়তা বিল করা, যোগসাজশের মাধ্যমে বিল কম-বেশি করা, রাজস্ব পরিদর্শক কর্তৃক মিটার রিডিং না নিয়ে ‘ডুবলি’ নিয়োগের মাধ্যমে মিটার রিডিং নিয়ে গ্রাহক ঠকানোসহ ওয়াসার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ উঠে এসেছে গবেষণায়। মিটার না দেখে বিল করার কারণে প্রতি মাসে বিল জমে গিয়ে বছর শেষে অনেক বড় অঙ্কের অর্থ জমে গেলে তা দিতে হিমশিম খেতে হয় গ্রাহকদের। এই বড় অঙ্কের বিল কমাতে গেলে গ্রাহকদের কাছে ঘুষ দাবি করা হয়। রাজস্ব পরিদর্শকের সঙ্গে যোগসাজশে এক হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে কম টাকা বিল পরিশোধের বিষয়ে এক গ্রাহক টিআইবিকে জানিয়েছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

ঢাকা ওয়াসার ক্রয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও দুর্নীতির উপস্থিতি পেয়েছে টিআইবি। পণ্যের উপযোগ বিবেচনায় না নিয়ে ক্রয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং পণ্যের নিম্ন মান সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরও তা কেনা বন্ধ না করার প্রমাণ মিলেছে ওয়াসার বিরুদ্ধে। ক্রয় প্রক্রিয়ায় ওয়াসার অনিয়মের প্রমাণ করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকার অটোমেটিক মিটার রিডিং মিটার ক্রয়ের বিষয়টির জের টেনেছে টিআইবি। মিটার আনার পর বিকল হয়ে রিডিং বন্ধ হয়ে গেলেও তা বাতিল করা হয়নি। ওয়াসার এক কর্মকর্তা টিআইবিকে বলেন, ‘যখন দেখা যায় মিটারগুলো ব্যবহার করতে সমস্যা হচ্ছে, তখন ওয়াসা মিটার কেনা বন্ধ করে দিতে পারত। কিন্তু তা না করে পরবর্তী সময়ে আরো দুই ধাপে মিটার ক্রয় করা হয়।’

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা, অহেতুক ব্যয় বাড়ানো, নিম্নমানের কাজ এবং প্রকল্পের কাজে তদারকির ঘাটতি রয়েছে বলে জানানো হয়েছে গবেষণায়। ওয়াসার একটি প্রকল্পে দুবার মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে ২৯৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

জনভোগান্তি কমাতে এবং সক্ষমতা অর্জনে ওয়াসার নেওয়া বেশ কিছু ইতিবাচক বিষয়ও ঠাঁই পেয়েছে গবেষণায়। সিস্টেম লস কমানো, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিলের তথ্য জানা এবং মোবাইল ফোন ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ ব্যবস্থা, পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল বিলিং সিস্টেম চালুর অভিযোগ শুনতে হটলাইন চালুসহ সংস্থাটির বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ওয়াসা লক্ষ্য অনুযায়ী সুপেয়, নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পানির উৎপাদন ও সরবরাহ এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ, ঢাকা ওয়াসার সুশাসনে ঘাটতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি।’

সেবার মান বাড়াতে ১৩ সুপারিশ

ওয়াসার সরবরাহ করা পানির মানোন্নয়ন, জনভোগান্তি কমিয়ে জবাবদিহি বাড়াতে এবং সংস্থাটির সার্বিকভাবে সক্ষমতা অর্জনে ১৩ দফা সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য তিনটি এবং ঢাকা ওয়াসার জন্য ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে।

টিআইবি জানায়, পানি ও পয়োনিষ্কাশন সেবায় মূল্য নির্ধারণে স্বতন্ত্র রেগুলেটরি কমিশন গঠন করে গণশুনানির মাধ্যমে ন্যায্যতার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ আবশ্যক। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ডের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠন করতে হবে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার নর্দমা ব্যবস্থাপনা একাধিক কর্তৃপক্ষের কাছে না রেখে একক সংস্থার কাছে ন্যস্ত করা উচিত।

ওয়াসার প্রতি সুপারিশ 

চুক্তিভিত্তিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, বয়স সুনির্দিষ্ট করে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। শূন্যপদগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি অর্গানোগ্রাম হালনাগাদ করা উচিত।  এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রম, খাল পরিদর্শন, রাজস্ব আদায়, নর্দমা ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পানি ও পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের লক্ষ্যে নতুন পয়ঃলাইন তৈরিসহ বিদ্যমান লাইনের যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।

এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পানির উৎপাদন নিশ্চিতে বৃষ্টির পানি ধারণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। ওয়েবসাইটে সেবাসংক্রান্ত তথ্যাদি হালনাগাদ করা এবং সেবাসংক্রান্ত উদ্যোগ সম্পর্কে প্রচারণা বাড়ানো উচিত। প্রধান কার্যালয় ও প্রতিটি মড্স জোনে লজিস্টিকস এবং পরিদর্শনের জন্য পরিবহন সুবিধা থাকা উচিত। ঢাকা ওয়াসার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রণোদনার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। সেবার মান যাচাই ও উন্নতিকল্পে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সেবার মান মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা উচিত বলে মনে করে টিআইবি।

মন্তব্য