kalerkantho

তিতাসে দুর্নীতির ২২ ‘কূপ খনন’ দুদকের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তিতাসে দুর্নীতির ২২ ‘কূপ খনন’ দুদকের

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ সংযোগ দেওয়া আর অবৈধ সংযোগকে বৈধ না করা, মিটার টেম্পারিং (কারসাজি), দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল আদায় না করা, বৈধ সংযোগ দিতে হয়রানি, মিটার বাইপাস করে সংযোগ দেওয়া, গ্যাস বিক্রি বেশি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া সংকেত দিয়ে অবৈধ গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায়সহ ২২টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই উৎস চিহ্নিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২টি সুপারিশ করেছে।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে গিয়ে এসংক্রান্ত অনুসন্ধানী ও পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর কাছে হস্তান্তর করেন দুদকের কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুদকের এই কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, এই মন্ত্রণালয়ে তা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হবে।’

দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক বলেন, কমিশনের এই প্রতিবেদন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজ হবে। এভাবে দুর্নীতি সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা গেলে মামলা-মোকদ্দমা করার প্রয়োজন পড়বে না।

দুর্নীতির চিহ্নিত উৎস

অবৈধ সংযোগ : তিতাস গ্যাস কম্পানিতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়ে থাকে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। অবৈধভাবে বিভিন্ন কারখানায় বিদ্যুতের লোড নেওয়া হয় এবং বৃদ্ধি করা হয়। তিতাসের ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয় অবৈধ সংযোগের কারণে। ঢাকার আশপাশের জেলা বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জে বিপুল পরিমাণ অবৈধ গ্যাস লাইন সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়। গৃহস্থালির চেয়ে শিল্পেই বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে। তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী তিতাসে কর্মরত নয় এ রকম কিছু টেকনিক্যাল ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে ঘুষের বিনিময়ে স্বাভাবিক সংযোগের পাশাপাশি রাতের আঁধারে চোরাই লাইনে সংযোগ দেয়।

নতুন সংযোগে অনীহা এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা : কেউ নতুন সংযোগের জন্য আবেদন করলে বা অবৈধ সংযোগ বৈধ করার জন্য আবেদন করলে সেটি সহজে অনুমোদন পায় না। কারণ বৈধ সংযোগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় না। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, একটি অবৈধ সংযোগ নিতে তিতাসের কর্মচারীকে ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হতো। বর্তমানে আরো বেশি দিতে হয়। এ জন্য অবৈধ সংযোগ বৈধ করতে আগ্রহী নয় তারা।

অবৈধ লাইন পুনঃসংযোগ : ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিলেও রাতের আঁধারে সেটি অর্থের বিনিময়ে পুনঃসংযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া : অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত হলে গ্রাহকের মামলার পর আদালতের আদেশে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হলেও অবৈধ সংযোগ বন্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ : অনেক সময় অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয় বা ওই হস্তক্ষেপের কারণে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা যায় না। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তিতাস গ্যাস কর্মকর্তার (ম্যানেজার) সমন্বয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কমিটি রয়েছে। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটি রয়েছে। অবৈধ সংযোগের তথ্যের আলোকে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ হয়। এ ক্ষেত্রেও অদৃশ্য প্রভাব কাজ করে বলে জানা যায়।

গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা : শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি উপদেষ্টাকে সভাপতি এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে সদস্যসচিব করে একটি কমিটি রয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্তেই গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার স্বার্থে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে কমিটির পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

একই কর্মকর্তার একাধিক দায়িত্ব পালন : একই কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করায় কোনো দায়িত্বই সঠিকভাবে পালন না করে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়।

বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ প্রদান : শিল্প শ্রেণির গ্রাহকদের কম মূল্যে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার নিয়ম থাকায় অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহক যেমন—হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, সুপারশপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেওয়া হয়।

মিটার টেম্পারিং : অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমেও দুর্নীতি হয়ে থাকে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে মিটার টেম্পারিং করে গ্রাহকের প্রকৃত বিল গোপন করে।

অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ : ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটর সংযোগ দেওয়া হয়।

বৈধ সংযোগ দিতে হয়রানি : যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা আবাসিক গ্রাহক বৈধভাবে সংযোগ নিতে চায় বা মিটারের নাম পরিবর্তন করতে চায় তাদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যথায় গ্রাহকদের খুব হয়রানি করা হয়।

মিটার বাইপাস করে সংযোগ প্রদান সংক্রান্ত দুর্নীতি : ঢাকা এবং আশপাশের অনেক কম্পানির মিটার বাইপাস করে অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে এ কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।

ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহস্থালিতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া : ইচ্ছাকৃতভাবে তিতাসের কর্মচারীরা গৃহস্থালিতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দিয়ে ওই সময়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাইপাস করে গ্যাস দেয়।

ইচ্ছাকৃতভাবে ইভিসি না বসানো : তিতাসসহ অন্যান্য কম্পানি অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রাহক পর্যায়ে অনুমোদনের কম বা বেশি গ্যাস সরবরাহ করে। সরবরাহ কম-বেশি হওয়া পরিমাপ করার জন্য মিটার আছে, যাকে ইভিসি (Electronic Volume Corrector) বলে, যার মাধ্যমে প্রবাহিত গ্যাসের তাপ ও চাপ সংক্রান্ত তথ্য সার্বক্ষণিক রেকর্ড হয়। এতে ৮০-৯০% সঠিক হিসাব আসে। কিন্তু তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ইভিসি বসায় না অথবা গরমিল করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে শিল্প এলাকায় পোস্টিং : অর্থের বিনিময়ে শিল্প এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পোস্টিং নিয়ে আছেন অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এতে তাঁরা খুব সহজেই সিন্ডিকেট গড়ে দুর্নীতি করেন।

এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো : ২০১৫-১৬ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই অর্থবছরে আবাসিক খাতে এস্টিমেটেড প্রবাহ ছিল ১০,৩১৭,৬৯,৩৫,৫৬৮ সিএফটি। কিন্তু ব্যবহৃত হয়েছে ৮,৮৩৯,৭৪,৯৬,৮৯৯ সিএফটি। দেখা যায় এস্টিমেশন অপেক্ষা ১,৪৭৭,৯৪,৩৮,৬৬৯ সিএফটি বা ৪১,৮৫০,৬৭,০৩ ঘনমিটার গ্যাস কম ব্যবহৃত হয়েছে। যার মূল্য ২৯২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯২১ টাকা। অথচ এস্টিমেশন থেকে গ্যাস কম ব্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও সিস্টেম লস দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় অবৈধ সংযোগ বা বাইপাস করে তা গৃহস্থালিতে সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয়।

অবৈধ চুলাপ্রতি বৈধ চুলার সমান টাকা আদায় করে আত্মসাৎ : ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিনজিরা, ফতুল্লা, সোনারগাঁও, নরসিংদী ও গাজীপুরে এক লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫টি অবৈধ চুলা বা সংযোগ চিহ্নিত করা হয়। প্রতি মাসে প্রতি চুলা বাবদ ৬৫০ টাকা হারে গ্যাসের মূল্য ধরে, ওই সব অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন না করায় সিন্ডিকেট প্রতি মাসে ৯২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

গ্যাস বিক্রি বেশি দেখিয়ে আত্মসাৎ : কম্পানির ভিজিল্যান্স ডিভিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৬৫৬২.৭৩৮ এমএমসিএম গ্যাস বিক্রি হয়েছে অথচ কম্পানির ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী ওই সময়ে গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ১৬৫৮৩.৩৩ এমএমসিএম। দুটির মধ্যে পার্থক্য ২০.৫৯২ এমএমসিএম বা ২,০৫,৯২,০০০ ঘনমিটার, যার মূল্য ১৪ কোটি ৪১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ওই অতিরিক্ত টাকা শ্রমিক অংশীদারি তহবিলে ‘বেশি অর্থ বণ্টনের স্বার্থ জড়িত’, যা পরে লভ্যাংশ হিসেবে কর্মচারী-শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

ভুয়া সংকেত দিয়ে অবৈধ গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায় : সিন্ডিকেট করে বিল ভাউচারে ভুয়া সংকেত দিয়ে অবৈধ গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায় করা হয়। ভুয়া সংকেত হওয়ায় সেগুলো তিতাসের ব্যাংক হিসাবে পোস্টিং এবং লেজারে এন্ট্রি দেওয়া হয় না। যেমন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের অডিটে ১৬,৭১,৩৭,২২৬ টাকা শুধু আবাসিক গ্রাহকের নন-পোস্টেড ভাউচারের তথ্যে দেওয়া হয়েছে, যার গ্রাহক সংকেতের কোনো মিল ছিল না।

আঞ্চলিক ব্যাংক হিসাব থেকে তিতাসের মাদার অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে টাকা স্থানান্তর না হওয়া : আঞ্চলিক বিপণন বিভাগ থেকে নিয়মানুযায়ী এক মাসের জমাকৃত অর্থ স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরের মাসের প্রথম সপ্তাহে কম্পানির মাদার অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হয়। স্থানীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা থাকলে ৩.৫ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। মাদার অ্যাকাউন্টে জমা থাকলে ৮ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক শাখাসমূহ ইচ্ছাকৃতভাবে টাকা মাদার অ্যাকাউন্টে দেরি করে পাঠায়। এভাবে কম্পানির কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়।

দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল আদায় না করা : ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সরকারি অডিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন শিল্প-কারখানা যেমন এশিয়ান টেক্সটাইল মিলস, পিংক ফুড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, লিথুন ফেব্রিক্স, কুশিয়ারা কম্পোজিটসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্রাহক, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কাছে তিতাস গ্যাসের শত শত কোটি টাকা পাওনা আছে। কারখানার মালিক গ্যাস কম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে অথবা অদৃশ্য প্রভাব খাটিয়ে গ্যাস সংযোগ অব্যাহত রেখেছে। অথচ গ্যাস নীতিমালা অনুযায়ী কম্পানি যথাসময়ে ব্যবস্থা নিলে তারা মামলা করার সুযোগ পেত না।

এ ছাড়া দরপত্রে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, মালামাল ক্রয়ে দুর্নীতি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্তৃক সার্বক্ষণিক কম্পানির গাড়ি ব্যবহার, জরিমানা, সংশোধিত বিল ও জামানত আদায়ে গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুসরণ না করাসহ বিভিন্ন দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তিতাসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

মন্তব্য