kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

নুসরাত হত্যায় মাদরাসা পর্ষদের ভূমিকায় প্রশ্ন

সুবর্ণচরের ঘটনায় ধর্ষণের মামলা হয়নি কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নুসরাত হত্যায় মাদরাসা পর্ষদের ভূমিকায় প্রশ্ন

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন এবং ওই মাদরাসার গভর্নিং বডির (পরিচালনা পর্ষদ) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আগেও ওই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। তখন যদি স্থানীয় প্রশাসন ও গভর্নিং বডি তাঁকে প্রশ্রয় না দিত, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত তাহলে এ রকম ঘটনা ঘটত না।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ মন্তব্য করেন। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর মাকসুমুল গ্রামে ‘ধর্ষণের শিকার’ গৃহবধূর বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা রিট আবেদনের ওপর শুনানিকালে আদালত এ কথা বলেন। আদালত বলেন, ‘সমাজটা কোথায় চলে গেছে? নৈতিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে আমাদের একের পর এক ঘটনা দেখতে হচ্ছে। শুধুই নোয়াখালী নয়, সারা দেশেই নির্যাতনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। দেড় বছরের শিশু থেকে ছয় সন্তানের জননী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন।’

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চর মাকসুমুল গ্রামে গত ২ মার্চ গৃহবধূ পলি আক্তারের বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ না আনায় হাইকোর্ট প্রশ্ন তোলেন। আদালত বলেছেন, ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হলো না কেন? ওই ঘটনায় সালিসের নামে ৬০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হলেও মামলায় সালিসকারী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে আসামি করা হলো না কেন।

আদালত এ নিয়ে জারি করা রুলে ধর্ষণ ও আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মীমাংসার নামে কথিত সালিস করা কেন আইনগত বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন।

সুবর্ণচরের ঘটনায় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুনতাসির মাহমুদ রহমানের করা এক রিট আবেদনে হাইকোর্ট এ রুল জারি করেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, সুবর্ণচরের ওসি, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেন, ওই ঘটনায় সালিসে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করল। এফআইআরে সালিসকারীর নাম আছে কি না? জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, না, তাঁকে আসামি করা হয়নি। শুধু অভিযুক্ত ধর্ষক আলাউদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর আলাউদ্দিনকে ইউপি সদস্য নুরুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৬০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।

এ সময় আদালত বলেন, এই ৬০ হাজার টাকার সুবিধাভোগী কে? মামলার এফআইআরে শুধুই ৩০৬ ধারার অভিযোগ (আত্মহত্যার প্ররোচনা) দেখছি। ধর্ষণের পর আত্মহত্যার অভিযোগ। কিন্তু মামলায় ধর্ষণের অভিযোগ তো আনেনি। এটা কেন আনা হলো না?

প্রসঙ্গত, কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বামীর সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জেরে ধর্ষণের শিকার হন পলি। পারিবারিক সূত্র জানায়, ১ মার্চ রাতে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে একই এলাকার আলাউদ্দিন ঘরে ঢুকে গৃহবধূকে ধর্ষণ করে। স্বামী সোহাগ বাড়িতে এসে স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পান। তিনি আশপাশের লোকজন ডেকে এনে আলাউদ্দিনকে আটক করেন। পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের নুরু মেম্বারসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ওই রাতেই ধর্ষককে মারধর ও ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেন। পরদিন সকালে ওই গৃহবধূ বিষপান করলে পরিবারের লোকজন তাঁকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। আদালত সুবর্ণচরের ঘটনায় রিটের শুনানির সময় ফেনীর নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনায় মামলার পর অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে গভর্নিং বডির সদস্যরা মিছিল করেছেন। যদি শুরুতেই ওই ঘটনায় মাদরাসার গভর্নিং বডি ও স্থানীয় প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিত, তা হলে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না। আদালত বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি নজরদারি করছেন। পিবিআই তদন্ত করছে। তদন্তও অনেক দূর এগিয়েছে।

মন্তব্য