kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী

ভালো ডাক্তার হওয়ার প্রথম শর্ত ভালো মানুষ হওয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ    

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভালো ডাক্তার হওয়ার প্রথম শর্ত ভালো মানুষ হওয়া

ব্যবধানটা ২০ বছরের। লোতে শেরিং ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের আর দশ শিক্ষার্থীর মতোই একজন। সাধারণ ছাত্রদের মতোই ছিল তাঁর চলাফেরা। ক্লাস, হোস্টেল, খেলাধুলা এই নিয়ে জীবন। ২০ বছর পর সেই ডা. লোতে শেরিং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। চার দিনের সফরে গত শুক্রবার তিনি যখন ঢাকায় আসেন, তখন ১৯ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁর আগমনীবার্তা প্রচার করা হয়েছে। বিমানবন্দরে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এত রাষ্ট্রাচার, ব্যস্ততার মধ্যেও লোতে শেরিং ভোলেননি তাঁর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও এর হাসপাতালের সার্জারি বিভাগকে। ১০ বছর বাংলাদেশে পড়ালেখার সুবাদে বাংলা ভালোই রপ্ত করার কথা জানান দিয়েছিলেন গত রবিবার সকালে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সুরের ধারার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তিনি সবাইকে বাংলায় নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। এরপর ময়মনসিংহের আঞ্চলিক টানে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা সবাই পান্তা খাইছেন?’ বাংলাদেশকে নিজের দ্বিতীয় বাসভূমি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ময়মনসিংহে যাওয়া নিয়ে তিনি বেশ ‘এক্সাইটেড’ (উতলা) হয়ে আছেন।

স্ত্রী ডা. উগেন ডেমাকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে পৌঁছান ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। ময়মনসিংহ মেডিক্যালের শিক্ষার্থীরা তখন ফুল দিয়ে বরণ করে নেয় তাদের পূর্বসূরিকে।

লোতে শেরিং এরপর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ মিলনায়তনে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সহপাঠী, শিক্ষকদের সামনে পেয়ে স্মৃতির ঝাঁপি মেলে ধরেন। মেডিক্যালের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রাবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসকর কক্ষে ঢুকতেই তাঁকে এক ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেই চিকিৎসক কোনো ‘ডায়াগনসিস’ (রোগ নির্ণয়) ছাড়াই ওষুধ দিয়েছিলেন। ওষুধে সুস্থ না হয়ে তিনি আবার যখন ওই চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তাঁকে ভর্তি করা হয়। এভাবে বেশ কিছু দিন যাওয়ার পর এক দল সার্জন এসে বুঝতে পারেন যে তাঁর অ্যাপেনডিক্স ফেটে যাচ্ছে। সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়।

অ্যাপেনডিক্সের সমস্যার বিষয়টি যে সার্জন ধরতে পেরেছিলেন, তাঁর সেদিনের বক্তব্যই তুলে ধরেন লোতে শেরিং। সেই সার্জন তখন অন্যদের বলছিলেন, ‘এ ছেলেটার এভাবে রাখার কোনো মানে হইল? এটা তো অ্যাপেনডিসাইটিস, ভাই। এটা তো বার্স্ট হতো এখনই। ফর হাউ লং হি হ্যাজ বিন লাইক দিস? (কত সময় ধরে সে এভাবে আছে?) এটার কোনো মানে হইল? আমাদের জিজ্ঞেস করলেও হইত। দ্য শুড হ্যাভ কনসালটেড আস (আমাদের সঙ্গে তাদের পরামর্শ করার দরকার ছিল)।’

লোতে শেরিং বাংলায় বলেন, ‘রোগী দেখতে হইলে ভালো করেই দেখতে হবে। স্ট্যান্ডিংয়ে (তৎক্ষণাৎ) একটা প্রেসক্রিপশন দিলে ডায়াগনসিস মিস হয়ে যায়। যেটা আমরা সব সময়ই করি। কিন্তু সেই দিন একবার আমার নিজের ওপর হইছে বলেই আমার মনে আছে এখনো।’

মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও চিকিৎসক—সবাইকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ওপর জোর দেন লোতে শেরিং। তিনি বলেন, এমন হতে পারে যে একজন রোগী ওই চিকিৎসকের কাছে জীবনে একবারই আসবে। চিকিৎসকরা দিন-রাত রোগীর সেবা করে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারেন। কিন্তু রোগীর অসুখের বিষয়টি তাঁরা যখন একটু হালকাভাবে নেন বা বেখেয়ালি হন, তখনই রোগীর জীবন বিপণ্ন হতে পারে।

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে লোতে শেরিং বলেন, তাঁরা যে একদিন সার্জন হবেন, সে ব্যাপারে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁরা কতটা ভালো সার্জন হতে পারবেন, সেটি নিয়েই তাঁর চিন্তা।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের লক্ষ্যই হওয়া উচিত একজন ভালো সার্জন হওয়া। পাঠ্যপুস্তক ভালো সার্জন তৈরি করে না। ভালো সার্জন হওয়ার ১ নম্বর শর্ত হলো ভালো মানুষ হওয়া। মাঠ ভালো না হলে যা-ই রোপি (রোপণ করি) না কেন, ভালো কিছু উঠবে না সেখানে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভিত্তি (ভালো মানুষ) যদি ভালো হয় তবে সেখানে সার্জারি, মেডিসিন, প্যাডিয়াট্রিকস বপন করতে হবে। তারা ভালো ফল দেবে।’  তিনি বলেন, ‘আমরা রোগীর সঙ্গে সব সময় থাকি; কিন্তু রোগীরা সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকে না। হয়তো একজন রোগী একবারই আসে। সে জন্য প্রত্যেক রোগীর প্রতি সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।’ চিকিৎসক হিসেবে একজন রোগীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে লোতে শেরিং বলেন, ‘আমরা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে কাজ করি। এটা মনে রাখতে পারলে তা হবে সেরা অর্জন।’

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজজীবনের স্মৃতিচারণা করে লোতে শেরিং বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি ও তাঁর স্বদেশি বড় ভাই বর্তমান ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাসে ২০ নম্বর কক্ষে থেকেছেন। টান্ডি দরজি ছিলেন ম-২৪ ব্যাচের ছাত্র। আর তিনি নিজে ম-২৮ ব্যাচের। এখন একসঙ্গে রাজনীতি করছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁদের মধ্যে কোন দিন কোনো মনোমালিন্য হয়নি।

টান্ডি দরজি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আজকে তাঁর কারণেই আমি প্রধানমন্ত্রী। তিনিই আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন।’ আবেগমাখা কণ্ঠে লোতে শেরিং বলেন, ‘আমি কিন্তু আমার পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে আসিনি। বরং এই পেশাকে গভীরভাবে ভালোবাসি বলেই রাজনীতিতে এসেছি।’

৫১ বছর বয়সী লোতে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস করার পর ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্জারিতে নিয়েছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। দেশে ফিরে প্রায় এক দশক চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত থাকার পর ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন ডা. শেরিং।

তিনি বলেন, ২০১৩ সালের নির্বাচনে তাঁর দল প্রত্যাশিত ফল পায়নি। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি চাকরি করেননি, বিদেশেও চলে যাননি। এর বদলে তিনি ভুটানের মানুষের কথা ভেবেছেন, তাদের নিয়ে কাজ করেছেন। আজ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী।

বক্তব্য দেওয়ার পর ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোতে শেরিং তাঁর ৭৭ জন সহপাঠীর সঙ্গে এক ঘণ্টা গল্পগুজব করে কাটান। তাঁর কয়েকজন সহপাঠী জানান, লোতে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পড়ার সময় ২ নম্বর গ্যালারির মাঝামাঝির একটি আসনে সব সময় বসতেন। তাই তাঁরা সেই ২ নম্বর গ্যালারিতেই তাঁকে নিয়ে যান আড্ডা দেওয়ার জন্য। পরিকল্পনা করে সেই আসনটি ফাঁকা রাখেন। সহপাঠীদের চমকে দিয়ে লোতে শেরিং ছুটে গিয়ে আসনটিতে বসে পড়েন। এরপর প্রাণ খুলে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তাঁর সহপাঠী চিকিৎসকরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একটি নির্দিষ্ট রঙের জার্সি পরেছিলেন। লোতে শেরিংও সেই জার্সি পরে নেন। তিনি ছাত্র থাকার সময় সহপাঠীদের সঙ্গে একবার শিক্ষাসফরে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। সেসব স্মৃতিচারণা করেন আবেগপ্রবণ গলায়। একসময় তিনি বলেন, এখনো সপ্তাহে দুই দিন তিনি নিজের দেশে বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচার করেন। জানান, চিকিৎসক হিসেবেই নিজের জীবনের শেষ দিনটি কাটাতে চান তিনি।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আনোয়ার হোসেন। ভুটানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী লায়োনপু দিহেন ওয়াংমু, বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্যসচিব জি এম সালেহ উদ্দিন, ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার, ময়মনসিংহ বিএমএর সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য