kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

এক হত্যাকাণ্ডে ২ মামলা, বিচার ঝুলছে ২৪ বছর

আশরাফ-উল-আলম   

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এক হত্যাকাণ্ডে ২ মামলা, বিচার ঝুলছে ২৪ বছর

একটি হত্যাকাণ্ডে পুলিশ দুটি হত্যা মামলা গ্রহণ করায় ২৪ বছর ধরে এর বিচার ঝুলছে। আর কত ২৪ বছর লাগবে কেউ বলতে পারছে না। আদৌ বিচার সম্ভব কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে। ফৌজদারি অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের ও পৃথক তদন্ত বৈধ নয়। অথচ পুলিশ তা-ই করেছে। আরো অবাক করা বিষয়, বিচারের জন্য এখন দুটি মামলাই অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে উঠেছে। কিন্তু দ্বিতীয় মামলাটি বিচারের জন্য আদালতে ওঠায় প্রথম মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে যায়। আবার হাইকোর্টের আদেশে দ্বিতীয় মামলাটিও স্থগিত হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ১৯৯৪ সালের এক রাতে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার দিগরাজ গ্রামে মৎস্যঘেরের দুই পাহারাদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়। এই মামলার জটিল দিকটি হচ্ছে, প্রথম মামলায় যারা বাদী, দ্বিতীয় মামলায় তারাই আসামি। তবে দোষী যারাই হোক, এ মামলায় বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই হয়রানির শিকার হচ্ছে।

১৯৯৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাগেরহাট জেলার মোংলা বিদ্যারবাহন দিগরাজ গ্রামের একটি মৎস্যঘেরের কক্ষে খুন হন কামরুল ইসলাম ও আবদুর রশিদ নামের দুই পাহারাদার। সন্ত্রাসীরা গুলি করে  তাঁদের হত্যা করে। মাছের ঘেরসংক্রান্ত বিরোধের কারণে বিরোধী পক্ষ দলবলসহ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায় বলে স্থানীয়রা জানায়।

দুই মামলা : একটি মামলার এজাহার ও নথিপত্র থেকে জানা যায়, বাগেরহাটের রামপাল থানার শ্রীফলতলা গ্রামের গোলাম আজমের বড় ভাই গোলাম মাওলা (কাকন) ওই ঘেরে মাছ চাষ করে আসছিলেন। এলাকার অন্য একটি মহল জমির প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে ঘের লিজ নিতে না পেরে বারবার ওই ঘেরের ক্ষতি করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এরই জের ধরে তারা রাতের বেলায় ঘেরে হামলা চালায়।

ঘেরের পাহারাদার দুজন খুন হওয়ার পর ঘেরের মালিকের ভাই গোলাম আজম বাদী হয়ে ঘটনার এক দিন পর অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোংলা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর ৪/১১.০৯.৯৪)। মামলায় আসামি করা হয় দিগরাজ গ্রামের আরজ আলী ডাকুয়া, হেমায়েত ডাকুয়া, পিন্টু রায়, বাবুল শেখ, মান্নান সরদার, বিদ্যারবাহন গ্রামের নসরুদ্দীন ফকির, বুড়িডাঙ্গা গ্রামের কৃষ্ণপদ রায় ও দিপক রায়কে।

অন্যদিকে ঘটনার ১০ দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর নিহত পাহারাদার কামরুল ইসলামের ভাই মো. সফরুল শেখ বাদী হয়ে একই থানায় আরেকটি হত্যা মামলা (নম্বর-৮, তারিখ ২০.০৯.১৯) দায়ের করেন। এই মামলায় প্রথম মামলার বাদী গোলাম আজম, বাদীর ভাই ও ঘের মালিক গোলাম মাওলা (কাকন), রামপাল থানার বাঁশতলা গ্রামের আ. ছালাম, আবুল কালাম, আবু সাঈদ শেখ, হাইজার শেখ, মোহাম্মদ আলী শেখ ও সোলায়মান শেখ এবং সোনাইলতলা গ্রামের ইউনুস সরদার, হুমাউন সরদার, মহসিন সরদার ও হোগলাডাঙ্গা গ্রামের ইউনুস মল্লিককে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকেও আসামি করা হয়। এই এজাহারে বলা হয়, প্রথম মামলার বাদী বা ঘের মালিক তাঁদের শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নিজেরা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে ঘের পাহারাদার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ না করেই মামলা করেছেন।

পৃথক তদন্তের পালা ও  জটিলতা : একই ঘটনায় দুটি মামলা হওয়ার পর মোংলা থানা প্রথমে তদন্ত করে। পরে সিআইডি তদন্ত করে। প্রথম মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আরজ আলী ডাকুয়া, হেমায়েত ডাকুয়াসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালের ৭ নভেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বাগেরহাট অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ওই আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হওয়ার পর বর্তমানে যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

এদিকে দ্বিতীয় মামলার তদন্তও পৃথকভাবে চলতে থাকে। সিআইডি তদন্ত করে দুই দফায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম মামলার আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিহত কামরুল ইসলামের ভাই ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর অভিযোগের সপক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এরপর নিহত কামরুলের ভাই সফরুল শেখ নারাজি দেন। নারাজির আবেদন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নামঞ্জুর হয়। এরপর জজ আদালতেও নামঞ্জুর হয়। পরে হাইকোর্ট নারাজি মঞ্জুর করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। বাগেরহাটের তৎকালীন দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট দাউদ খান বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ২০০৫ সালের ২৫ জুন প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় মামলার আসামি তথা ঘের মালিকদের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।

সর্বশেষ মামলাটি বিচারের জন্য বাগেরহাট অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই আদালতেই এখন দুটি মামলা বিচারাধীন। প্রথম মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এটি যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য ছিল। এখন দ্বিতীয় মামলা বিচারের জন্য একই আদালতে স্থানান্তরের জন্য পাঠানোয় প্রথম মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি হচ্ছে না। আবার দ্বিতীয় মামলাটিও হাইকোর্টের নির্দেশে ছয় মাসের জন্য স্থাগিত আছে।

বিচার নিয়ে সংশয় ও আইনবিদদের মত : দুই মামলায় পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ায় এখন মামলার বিচার নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এখন দুজনকে খুনের ঘটনায় দায়ী কে বা কারা তা নিরূপণ করাও দুরূহ হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয় মামলার আসামি শেখ কায়জার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা নিজেরা মামলা থেকে বাঁচতে নিহত কামরুলের ভাইকে দিয়ে মিথ্যাভাবে দ্বিতীয় মামলা করিয়েছে। বারবার তদন্ত করে পুলিশও সে প্রমাণ পেয়েছে। এর পরও বিচার বিভাগীয় তদন্তে ভিন্নরূপ প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কায়জার আরো জানান, প্রথম মামলার আসামি দিপক রায় তদন্তের সময় একটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন। ওই অস্ত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি দিয়ে তিনটি গুলি করে মৎস্যঘেরের পাহারাদার কামরুল ও রশিদকে হত্যা করা হয়। এর পরও দ্বিতীয় মামলায় মৎস্যঘেরের মালিকসহ অন্যদের আসামি করা হয়, যা হয়রানিমূলক। এতে হত্যাকাণ্ডের বিচারও থমকে আছে। অন্যদিকে কিছু লোকও ভোগান্তিতে আছে।

ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, একই ঘটনায় দুটি মামলা ভিন্ন ব্যক্তি দায়ের করতে পারেন। কিন্তু প্রথম যে মামলা রুজু হবে, দ্বিতীয়টি সেটির সঙ্গে যুক্ত হবে। অর্থাৎ একই সঙ্গে তদন্ত হবে। পৃথক তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। থানা ভিন্নভাবে মামলা রুজু করতে পারে না। তিনি বলেন, একসঙ্গে তদন্ত হলে ২৪ বছর ধরে একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার ঝুলে থাকত না। এখন যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে সেটিতে প্রকৃত হত্যাকারী কে তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

ঢাকার আরেক বিশিষ্ট আইনজীবী শফিকুল ইসলাম বলেন, দুটি মামলা রুজু করার সুযোগ নেই। একই ঘটনায় দুই মামলা সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্ট বলা না থাকলেও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে, দ্বিতীয় মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি হিসেবে প্রথম মামলার সঙ্গে যুক্ত হবে। পুলিশ দুটি মামলা রুজু করে বেআইনি কাজ করেছে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য আইনবিষয়ক জার্নাল ‘ঢাকা ল রিপোর্ট’-এর ৩৮তম সংখ্যার ৩১১ পৃষ্ঠায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত এসেছে। মুসলিম উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র মামলায় ১৯৮৬ সালে আপিল বিভাগ বলেছেন, প্রথম যে এজাহার দায়ের হবে সেটিই মামলা। এরপর যতগুলো এজাহার হবে তা সাক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবেন তদন্ত কর্মকর্তা। পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টেরও এমন সিদ্ধান্ত রয়েছে।

পুলিশের খামখোয়ালিপনা ও বেঠিক সিদ্ধান্তেই এখন কামরুল ও রশিদ হত্যার বিচার ঘুরপাক খাচ্ছে বলেই মনে করেন আইনজীবীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা