kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

‘সিরাজ মুক্তি পরিষদের’ নেপথ্যে তিন হোতা

নূর-মাকসুদ গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি    

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘সিরাজ মুক্তি পরিষদের’ নেপথ্যে তিন হোতা

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের পর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অধ্যক্ষ (বরখাস্ত) সিরাজকে রক্ষা করতে তাঁর সহযোগীরা ‘সিরাজ উদ দৌলা সাহেব মুক্তি পরিষদ’ নামে কমিটি করেছিল। এই কমিটি মাদরাসার সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মানববন্ধনে যেতে বাধ্য করে। পরোক্ষভাবে কয়েকজন এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকলেও তিনজনই ছিল এর নেপথ্যের কারিগর। তারা হলো মাদরাসার ফাজিল পড়ুয়া ছাত্র নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম, পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাকসুদ আলম। এ তিনজনই যথাক্রমে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহারভুক্ত ২, ৩ ও ৪ নম্বর আসামি। এদের মধ্যে মাকসুদকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অভিযানে নূর উদ্দিন ও মাকসুদ গ্রেপ্তার হয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে এজাহারভুক্ত পাঁচজনসহ মোট ১১ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এখনো অধরা আছে এজাহারভুক্ত তিন আসামি। তবে শাহাদত হোসেন শামীমকে পিবিআই ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে গতরাতে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেলেও দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষই তা নিশ্চিত করেনি।

সিরাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূর ও মাকসুদ গ্রেপ্তার হওয়ায় রাফিকে কারা পুড়িয়ে হত্যা করেছে সে প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গতকাল পর্যন্ত সে রহস্যের জট খোলেনি।

সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সিরাজ গ্রেপ্তারের পর তাঁর মুক্তির দাবিতে ‘সিরাজ উদ দৌলা সাহেব মুক্তি পরিষদ’ নামে একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়ক নূর উদ্দিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম। পেছন থেকে এই কমিটি সংগঠিত করে দেয় মাকসুদ আলম। কমিটির ব্যানারে ২৮ ও ৩০ মার্চ দুই দফায় সিরাজের মুক্তি চেয়ে সোনাগাজী শহরে মানববন্ধন ও মিছিল হয়।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ তিনজনসহ সিরাজের সহযোগীরা নানা অপকর্মে জড়িত।

জানা গেছে, ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, চাঁদাবাজি, হয়রানি, মাদরাসায় ফাও খাওয়াসহ বিভিন্ন অপকর্মের কারণে বখাটে নূর উদ্দিন ও শামীমকে ভয় পেত সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সূত্র জানায়, মাকসুদ আলমের বাসা মাদরাসার পাশেই। কয়েক বছর আগেও সে ছিল সবজি বিক্রেতা। আর এখন সে কোটিপতি। জোর করে ঠিকাদারি কাজ নিয়ে অনিয়মসহ অনেক অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে আঁতাত করে মাকসুদ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অভিভাবক সদস্য হয়। অথচ তার কোনো সন্তান এ মাদরাসায় পড়ে না। তার ছেলে উলফাত ইসলাম বিজয় ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তাকেই এ মাদরাসার ছাত্র দেখানো হয়।

গত বছর মাদরাসা পরিচালনা কমিটি গঠন করার সময় মাকসুদ হুমকি দিয়ে মাওলানা মোশারফ হোসেন, ডা. ইসমাইল হোসেন ও আইয়ুব খান নামের তিন অভিভাবক সদস্য পদপ্রার্থীকে প্রার্থিতা প্রত্যহার করতে বাধ্য করে। আইয়ুব খান তাঁর ভয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। পরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয় মাকসুদ। রাফির ঘটনার আগেও সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে মাকসুদ তা ধামাচাপা দেয়। ২৮ মার্চ মানববন্ধনের আগে মাদরাসায় যে সভা হয়েছে সেখানে সে উপস্থিত ছিল। রাফির ঘটনায় বিচার দাবি করা শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে হুমকি দেয় মাকসুদ। তার বিরুদ্ধে সিরাজের সঙ্গে আঁতাত করে মাদরাসার আয় লুট করারও অভিযোগ আছে।

মাদরাসার নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা ও অফিস সহায়ক নূরুল আমিন জানান, ছাত্রদের মধ্যে নূর উদ্দিন ও শামীমই ছিল অধ্যক্ষ সিরাজের ঘনিষ্ঠ। তাদের বিভিন্ন কাজে ডাকতেন সিরাজ।

একাধিক সূত্র জানায়, নূর ও শামীম দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় ফরম পূরণের সময় বাণিজ্য করে। তারা সিরাজকে দিয়ে ফি কমিয়ে দেওয়ার কথা বলে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়। পরীক্ষার সময় নকল সরবরাহ করার কথা বলেও তারা টাকা নেয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষার সময় এমন আশ্বাস দিয়ে ৫৮৭ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলে তারা। আলিম পরীক্ষার সময়ও বিদায় ও মিলাদ অনুষ্ঠানের নামে তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা চাঁদা তোলে। সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ায় ২৮ মার্চ নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি হয়নি।

উত্তর চরচান্দিয়ার দরিদ্র কৃষক আহসানউল্লাহর ছেলে নূর উদ্দিন অধ্যক্ষ সিরাজের প্রধান ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। শিবিরকর্মী নূর উদ্দিন দুই বছর আগেও দাখিল পরীক্ষার সময় রাফিকে উত্ত্যক্ত করেছিল। রাফি তার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে চুনের ঘোল ছুড়ে মারে নূর। অন্য মেয়েদেরও উত্ত্যক্ত করত সে। প্রতিদিনই মাদরাসার হেফজখানায় গিয়ে ছাত্রদের জন্য দেওয়া খাবার খেয়ে ফেলত। সিরাজের ভয়ে তার ব্যাপারে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না।

চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঁইয়াবাজারের আব্দুর রাজ্জাকের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে শামীম ছোট। তার দুই ভাই প্রবাসী। সংসারের টাকা উড়িয়ে বখাটে বনে যাওয়া শামীম আগে সোনাগাজী উপজেলা শাখা শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সম্প্রতি সে নিজেকে সভাপতি করে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ এই আসামি এখনো পলাতক।

দুই আসামি গ্রেপ্তার, মাঠে পিবিআই : আমাদের ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি মোখলেছুর রহমান মনির স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানান, গতকাল সকাল ১১টার দিকে উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের আকবর হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পিবিআইয়ের একটি দল।

আকবর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরখোয়াজ গ্রামে। প্রায় ১০ বছর হলো আমি জমি কিনে ভালুকার আমতলীতে বসবাস করে ব্যবসা করছি। নূর উদ্দিনকে আমি চিনতাম না। লাভলী আক্তার নামে আমার এক খালা আমার বাসায় ভাড়ায় বসবাস করে স্থানীয় একটি কটন মিলে কাজ করেন। লাভলীর আগের স্বামীর আত্মীয়তার সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার রাতে নূর উদ্দিন আমার কাছে আসে। সে রাতেই নূর উদ্দিনকে আমি প্রথম দেখি। মামলার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। জানলে আমি তাকে জায়গা দিতাম না।’

শফিকুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক শ্রমিক নেতা বলেন, ‘সেই বাসা থেকে নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের কাজে পিবিআইকে আমি সহায়তা করেছি।’ তবে পিবিআইয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নূরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনী পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল আমি মাকসুদকে বুঝে পেয়েছি। আর কোনো আসামি এখনো পাইনি।’ তিনি জানান, গতকালই মাকসুদকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

আমাদের ফেনী প্রতিনিধি জানান, মাকসুদকে বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে আটক করে পিবিআই। আগামী সোমবার মাকসুদের রিমান্ড আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেছেন ফেনীর মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক তানিয়া ইসলাম।

পিবিআই সূত্র জানায়, গতকাল সকালেই পরিদর্শক শাহ আলম ও মোনায়েম মিয়া রাফির মাদরাসা, বাড়িসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা রাফির সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন আলামত যাচাই ও সংগ্রহ করেন।

সোনাগাজীতে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তদল : গতকাল সকালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি তদন্তদল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যায়। এ সময় দলের সদস্যরা রাফির কয়েকজন সহপাঠী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাঁরা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামে রাফিদের বাড়িতে যান। এ সময় তদন্তদলের সদস্যরা রাফির স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার ব্যাপারে কিছু তথ্য জানতে চান।

মাদরাসায় যাওয়ার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহামুদ ফয়জুল কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাফির মামলাটির বিচার যেন দ্রুত কার্যকর হয়, সে জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি ন্যস্ত করার জন্য আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ করব।’ এ সময় কমিশনের উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম, সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল পারভেজ ও পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন উপস্থিত ছিলেন।

ছাত্রলীগের মানববন্ধন : রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর থেকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সোনাগাজীতে কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়নি। মেয়েটি মারা যাওয়ায় গতকালই প্রথম সোনাগাজীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে উপজেলা ছাত্রলীগ। সকালে শহরের জিরো পয়েন্টে এ মানবন্ধনে কয়েক শ নেতাকর্মী অংশ নেয়। এই মানববন্ধনে অধ্যক্ষ সিরাজ ও তাঁর সহযোগীদের ফাঁসি দাবি করেন বক্তারা।

কর্মসূচিতে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল মোতালেব চৌধুরী রবিন জানান, রাফির খুনিদের বিচারের দাবিতে উপজেলা ছাত্রলীগ তিন দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। গতকাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। আজ শনিবার উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে বিক্ষোভ মিছিল হবে। আগামীকাল রবিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি পেশ করবেন তাঁরা।

গত ৬ এপ্রিল মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। গুরুতর অবস্থায় ওই দিন তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ২৭ মার্চ মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন রাফির মা। গত রবিবার রাফি চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া শেষ জবানবন্দিতে বলেছিল, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা