kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বিমানের সিন্ডিকেট ভাঙার কেউ নেই!

মাসুদ রুমী   

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিমানের সিন্ডিকেট ভাঙার কেউ নেই!

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বছরের পর বছর চলছে দুর্নীতি-অনিয়ম। কেউই এর লাগাম টানতে পারছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিমান সংস্থাটির ঘাটে ঘাটে নানা সিন্ডিকেট সক্রিয়। ‘শক্ত’ সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো মন্ত্রী। এমনকি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মীদেরও অপরাধপ্রবণতা কমাতে পারেননি বিদায় নেওয়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী শাহজাহান কামাল। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘জীবন দিয়ে’ হলেও তিনি বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

এর আগের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিদায় নেওয়ার সময় শাহজাহান কামালকে সতর্ক করে বলেছিলেন, বিমান নিয়ে গালি খেতে হতে পারে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়াকে কাউকে ‘আগুনে নিক্ষেপের’ সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তখন শাহজাহান কামাল বলেছিলেন, ‘বিমান আগুন নয়, এটা আমার জন্য পানি।’

কিন্তু ‘আগুনকে পানি করতে না পারার’ মধ্যেই দুজন মন্ত্রী বদল হয়েছেন। বিমানের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় দৃশ্যত বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। নতুন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী দায়িত্বনিয়ে বিমান বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এর মধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিমান বাংলাদেশ ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ১৯ দুর্নীতির উেসর কথা জানাল সরকার ও দেশবাসীকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির শক্তিশালী ইউনিয়ন ও অসাধু চক্র নিয়েও বিস্তর অভিযোগ উঠেছে নানা সময়। কথায় কথায় বিমানের চাকা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও আসে। গলাসমান ঋণ ও লোকসানের বোঝা মাথায় শিডিউল মেনে না চলা, আর্থিক সংকট, দুর্নীতি, কেনাকাটা, টেন্ডার প্রদানে অনিয়ম, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, অপচয়, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সব কিছুই আগের মতোই চলছে। দুর্নীতি আর অনিয়ম বেড়েছে বিমানের বৈদেশিক অফিসগুলোতেও।

সূত্র জানায়, বিগত পর্ষদ আমলে বিমান যেভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল, সেখান থেকে সংস্থাটিকে তুলে আনা এখন কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় বিপুল অংকের আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়লেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিমানবন্দরে কার্গো শাখায় বিপুল অংকের দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হয়েছে বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে অনির্ধারিত মালবাহী ফ্লাইটে আসা এবং বিদেশে যাওয়া মালামাল থেকে আদায়যোগ্য মাসুল ৭২ কোটি টাকার বেশি বিমানের কোষাগারে জমা পড়েনি। ২০০৮ সাল থেকে এটা চলছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী, দুই বছরে ৭২ কোটি টাকা করে ধরলে ১০ বছরে এই খাত থেকেই অন্তত ৩৬০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

বিমানের দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ভাঙা যাচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নের জবাবে রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ওপর সরকারের পুরোপুরি কর্তৃত্ব নেই। আমি বহু চেষ্টা করেছি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা বেসরকারি খাতে ছাড়ার। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বিদেশ থেকে একাধিক বিনিয়োগকারী নিয়ে এসেছি; কিন্তু বিমান কিছুতেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্ব ছাড়তে চায় না। আমার কাছে তত্কালীন চেয়ারম্যান এক বছর সময় চেয়েছিলেন। বিমানের ভেতরে যাঁরা আছেন তাঁরা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ছাড়ার ব্যাপারে ঘোর বিরোধী। এর পরও আমি শ্রমিকদের রাজি করিয়েছিলাম, কিন্তু পরে দেখলাম বিমানের ম্যানেজমেন্টই চায় না। তারা যদিও মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিন্তু তারা অনেক সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। এর ফলে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম হচ্ছে। আমরা এটাকে যত দূর সম্ভব কমিয়ে এনেছিলাম, কিন্তু সেটা এখন আছে কি না আমি জানি না।’

সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বিমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘বিমানে দুর্নীতিবাজ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতিবাজদের স্থান নেই।’

দুদকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মুহিবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুদক অনেকগুলো বিষয় তুলে ধরেছে, এগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রতিবেদনে অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তারা বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতির কথা বলেছে, কিন্তু কবে হয়েছে, কী নিয়ে হয়েছে, কোন কাজ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, যা নিয়ে আমরা ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে পারি। এর পরও এটাকে আমরা মূল্যায়ন করে আরো তদন্ত করে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিমান ও বেবিচকের দুর্নীতিতে লাগাম টানতে মন্ত্রীরা ব্যর্থ হচ্ছেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ মোমেন বলেন, ‘এভিয়েশন খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি মন্ত্রণালয় বরাবরই অবহেলিত। এই মন্ত্রণালয়ের সফলতায় মন্ত্রীদের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করার জন্য যে ক্ষমতা ও দক্ষতা দরকার তা অনেকটাই অনুপস্থিত। অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করে পাঠানো হতো। ফলে অসাধু চক্রের সঙ্গে তাঁরা পেরে উঠতেন না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা