kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

জটিল আবর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা

আজিজুল পারভেজ   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জটিল আবর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা

জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। অমুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে সঠিক ও নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য নেওয়া সর্বশেষ উদ্যোগও ভেস্তে যেতে বসেছে। নতুন উদ্যোগে তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়া তো যাচ্ছেই না, উপরন্তু নতুন প্রায় ২৭ হাজার জনের প্রস্তাব এসেছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি জন্য। সংখ্যাটি অস্বাভাবিক হওয়ায় তা আবার যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)।

বারবার যাচাই-বাছাই, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাদ দিতে না পারায় এবং পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তালিকা প্রণয়নের বিষয়টি সমালোচিত হওয়ায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে। সব মিলিয়ে দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৮। মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ জন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা এবং সন্তান, নাতি-নাতনির জন্য চাকরির কোটা নির্ধারণ, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অবসরের সময়সীমা এক বছর বাড়ানোর কারণে মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ ও তালিকাভুক্তির জন্য হিড়িক পড়ে। এই সুযোগে অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ঘোষণা করেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা এমনভাবে তৈরি করা হবে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে কেউ থাকবে না। যারা ভুয়া তাদের বাদ দেওয়া হবে। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সনদ ও গেজেটধারী ৪৫ হাজার জনকে যাচাই-বাছাইয়ে অংশ নিতে বলা হয়।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা/জেলা/মহানগর কমিটি গঠন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৪ জন এবং সরাসরি ১০ হাজার ৯০০ জন আবেদন করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত ৪৭০টি কমিটির মধ্যে ৩৮৬টি কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। ৮৪টি কমিটি কাজ করতে পারেনি সদস্যদের দ্বন্দ্ব ও কমিটি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায়। যেসব কমিটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে তারা ২৬ হাজার ৯৪২ জনকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করেছে। ঢাকা বিভাগের ২৮ হাজার ২৫৩ জন আবেদনকারীর মধ্যে চার হাজার ৮৪২ জনকে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩ হাজার ৪৯৪ জনের মধ্যে ছয় হাজার ৬২৬ জনকে, সিলেট বিভাগের দুই হাজার ২৫৭ জনের মধ্যে ৮০১ জনকে, খুলনা বিভাগের ১৫ হাজার ৫১১ জনের মধ্যে তিন হাজার ৪০১ জনকে, বরিশাল বিভাগের ১০ হাজার ৪৭৭ জনের মধ্যে তিন হাজার ৪১৯ জনকে, রাজশাহী বিভাগের ১৫ হাজার ২৮৬ জনের মধ্যে চার হাজার ৭৫২ জনকে এবং রংপুর বিভাগের ৯ হাজার ৪৭৩ জনের মধ্যে তিন হাজার ১০১ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার যাচাই-বাছাইয়ের কাজ যথার্থভাবে সম্পন্ন হয়নি। ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও পালন করা হয়। আদালতে মামলাও হয়। জামুকার কাছে যেসব প্রস্তাব আসে তাও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এসব কারণে কমিটিগুলোর কাছে তাদের প্রতিবেদনের অস্পষ্টতা দূর করার জন্য স্পষ্টীকরণ ও সপক্ষে প্রমাণপত্র চাওয়া হয় জামুকার পক্ষ থেকে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ২৫টি কমিটি, চট্টগ্রামের ১৯টি, রাজশাহীর ২৯টি, রংপুরের ১৯টি, সিলেটের পাঁচটি এবং খুলনার ২২টি কমিটি জবাব দিয়ে স্পষ্টীকরণসংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠায়। কিন্তু জামুকা কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। কর্তৃপক্ষ তাদের মতামতে জানায়, ‘বেশির ভাগ আবেদনকারীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রমাণক নেই। বেশির ভাগ প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ। এগুলো চুড়ান্তকরণের জন্য প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে পুনঃ যাচাই প্রয়োজন। যেসব কমিটি প্রতিবেদন দেয়নি সেগুলো পুনর্গঠন করা যায়।’

এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইসংক্রান্ত কার্যক্রম এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যাচাই-বাছাই কমিটি, মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল, ভাতা বন্ধ, মুক্তিযোদ্ধা বয়সসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে হাইকোর্টে আট শতাধিক মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনের ওপর সংক্ষুব্ধ হয়ে ৩৫ হাজার ৬২ জন জামুকায় আপিল করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত মেয়াদে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। নতুন মেয়াদে সরকার গঠনের পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ২৬ মার্চের আগেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানান। গত ২১ মার্চ জামুকার নতুন মেয়াদের প্রথম বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রস্তাব পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে জানান, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি যেসব প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, জামুকার সভায় তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। দেখা গেছে,  কোনো কোনো উপজেলায় এক-দেড় শ গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, সেখানকার কমিটি নতুন করে তিন-চার শ জনকে তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করেছে। এগুলো অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তা ছাড়া, যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও যে নীতিমালা তাদের দেওয়া হয়েছিল, সেটি তারা সঠিকভাবে অনুসরণ করেনি। বেশির ভাগ কমিটিই ‘হ্যাঁ বা না’ লিখে মতামত দিয়ে পাঠিয়েছে, কিন্তু কেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা বা কেন নয় সেটা তারা বলেনি। এ অবস্থায় জামুকার সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেসব উপজেলা কমিটি ১০ ভাগের নিচে সুপারিশ পাঠিয়েছে, সেগুলো গ্রহণ করা হবে। বাকিগুলো নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। এ জন্য কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।

জামুকার মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটিগুলোর সব প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়া হয়নি। যেসব প্রস্তাব কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি সেসব প্রস্তাবই ফের যাচাই-বাছাই করা হবে। আপিলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজন ও গবেষকদের মতে, মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা কোনো অবস্থায়ই দেড় লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা। যতবার তালিকা তৈরি করা হয়েছে ততবারই বেড়েছে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা। আর একবার তালিকা বা গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে তাঁকে বাদ দেওয়াও যায় না। আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী গতকাল সোমবার ফোনে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা তৈরির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে কবে সেই তালিকা দেওয়া সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

বারবার তালিকা, বারবার যাচাই-বাছাইকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকর বলে মনে করেন সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের সংখ্যা তো বৃদ্ধি কিংবা কমার কথা নয়। প্রকৃত লোকদের দিয়ে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বলেই নির্ভুল তালিকা হচ্ছে না।

খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বারবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হচ্ছে। কিন্তু একবারও ভুয়াদের বাদ দিতে দেখিনি। বিত্তশালীদের অন্তর্ভুক্ত হতে দেখছি, সচিবদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিতে দেখছি। অথচ উত্তরায় আমার বাসার পাশের বস্তিতে থাকেন আকবর নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা, কর্নেল তাহেরের সঙ্গে ১১ নম্বর সেক্টরে যিনি যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁর নাম তো মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই! এখন বস্তিতে জীবন যাপন করেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য এর চেয়ে পরিতাপের কী হতে পারে!’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা