kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

রাতের ঢাকা

থাকে না পুলিশ, জ্বলে না বাতি

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



থাকে না পুলিশ, জ্বলে না বাতি

রাত ১২টা। মিরপুর রোড। সিটি কলেজ পার হতেই ব্যাপক যানজট। গুনে গুনে ৬৫টি মালবাহী ট্রাক পাওয়া গেল। পেছনেই অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস এমনকি অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে আছ। কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই। ছিল না কোনো টহল পুলিশও। এভাবে পৌনে এক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এ সময় অ্যাম্বুল্যান্সের চালকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি দ্রুত গাড়ি টান দিয়ে শুধু বলেন, ‘রোগীর অবস্থা ভালো না, ঢাকা মেডিক্যালে যাচ্ছি।’

বুধবার রাত ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর ফার্মগেট, পান্থপথ, বাংলামোটর, শাহবাগ, মৎস্য ভবন মোড়, পল্টন, কাকরাইল, বাড্ডা এবং মালিবাগসহ মতিঝিল এলাকা—সবখানেই দেখা গেল গাড়ির চাপ। এর পরও রাত ২টার পর রাজধানীর বেশির ভাগ সড়কে কোনো ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়েনি। শুধু কি ট্রাফিক অনুপস্থিতি? বিকল্প হিসেবে থাকা ট্রাফিক সিগন্যাল বাতিও কাজ করছিল না। এ অবস্থায় বেপরোয়া ট্রাকচাপায় একজন শিক্ষকসহ দুজন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম বলেন, ‘এমনিতেই ট্রাফিক পুলিশে জনবল কম। দিনের ডিউটির পর রাতের ডিউটি অমানবিক হয়ে যায়। তবে এর পরও রাত ২টা পর্যন্ত সড়কে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালে পুলিশ থাকে। এরপর টহল পুলিশ সারা রাত থাকে।

সরেজমিন : রাত পৌনে ১টা। নীলক্ষেত মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালের মুখে চতুর্দিকের গাড়ি একত্র হয়ে আটকে আছে। ট্রাফিক পুলিশ চোখে পড়ল না। সিগন্যাল বাতিও জ্বলছিল না। রাত ১টা পর্যন্ত এখানে দাঁড়িয়ে থেকে জয়নাল নামের এক অটোরিকশাচালক বললেন, ‘সারা রাত আমরা গাড়ি চালাই। ঢাকার বেশির ভাগ ট্রাফিক সিগন্যালে পুলিশ থাকে না, ট্রাফিক বাতিও জ্বলে না। কত দুর্ঘটনা চোখের সামনে দেখি। ট্রাক কাউকে ছাড়ে না।’

রাত ১টা ১০ মিনিটে আজিমপুর ট্রাফিক মোড়েও দেখা গেল ট্রাফিক পুলিশ নেই। পলাশী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে রাত দেড়টার দিকে শাহবাগ ট্রাফিক মোড়ে চোখে পড়ল গাড়িগুলো কোনো রকম নিয়ম-নীতি ছাড়াই চলছে। পাশে দুজন ট্রাফিক কনস্টেবল দাঁড়িয়ে—নজরুল ইসলাম ও লুত্ফর রহমান। নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হাতের ইশারায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কতক্ষণ পারা যায়! সিগন্যাল বাতি থাকলেও জ্বলে না। ভোর ৬টা থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রথম শিফটে ডিউটি করেছি। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত রেস্ট নিয়ে আবার এসেছি। রাত ২টা পর্যন্ত থাকতে হবে।’ লুত্ফর রহমান জানান, রাত ২টার পর এখানে কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকবে না। এ সময় এখানে গাড়ি চলবে অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে। তাঁদের পাশেই কিছুটা দূরে ছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট কায়সার মাহমুদ জীবন। তিনি বললেন, ‘এমনিতেই ট্রাফিক পুলিশে জনবল কম। সারা দিন ডিউটি করে রাতে ফের ডিউটি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ওপর ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি কাজ করছে না। এটা ঠিক করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। বেপরোয়া ট্রাক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ট্রাকগুলো রাতে আইন মেনে চলতে চায় না। দূরপাল্লার বাসের অবস্থাও একই। কেউ গতি নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চালায় না। ট্রাফিক সিগন্যালে এসেও তারা একই গতিতে গাড়ি চালায়। আমরা হাত বাড়ালেও অনেক সময় তারা মানতে চায় না। আসলে কেউ যদি রাষ্ট্রকে সম্মান করে নিজে থেকে আইন না মেনে চলে, তাহলে শুধু পুলিশ দিয়ে জোর করে আইন মানানো সম্ভব নয়।’

রাত দেড়টার পর বাংলামোটরে গিয়ে কামাল নামের এক ট্রাফিক পুলিশকে একা চার সড়কের আটটি মুখের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়। এরপর মগবাজার হয়ে কাকরাইল, পল্টন ও মৎস্য ভবন, মালিবাগ, বনশ্রী ও বাড্ডা এলাকার প্রধান সড়ক ঘুরে জানা গেল, রাত ২টার পর এসব এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। সিগন্যালও কাজ করে না।

এর ঘণ্টা কয়েক আগে রাত ১০টার দিকে মগবাজার চার রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্বরত দেখা গেলেও সিগন্যাল বাতি ছিল না। কোনো গাড়িই সতর্কতা সংকেত মানছিল না। এরই মধ্যে একটি প্রাইভেট কার উল্টো দিকে আসতে দেখে হাত উঁচু করে ট্রাফিক পুলিশ থামিয়ে দেয়। তখন ভেতর থেকে জানালার কাচ নামিয়ে গলা উঁচু করে এক নারী বলতে থাকেন, ‘এটা পুলিশের ডিআইজির স্ত্রীর গাড়ি।’ তখন ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল বলতে থাকেন, ‘আইন সবার জন্য সমান।’ এরপর ওই নারী কাউকে ফোন করে ফোনটি পুলিশ সদস্যকে দিয়ে বলেন, ‘এই নেন কথা বলেন।’ কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্যটি বেজার মুখে বলতে বাধ্য হন, ‘যান ম্যাডাম।’ এরপর গাড়িটি উল্টো পথেই চলে যায়। এরপর পুলিশের আরো একটি গাড়িকে উল্টো পথে যাওয়া ঠেকাতে ব্যর্থ চেষ্টা করে ট্রাফিক পুলিশ।

এরপর রাত ২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কোনো ট্রাফিক পুলিশ সড়কে চোখে পড়েনি। ট্রাফিক পুলিশবিহীন রাজপথে রাত ৪টার দিকে কল্যাণপুর দূরপাল্লার বাস টার্মিনালের সামনে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক মাদরাসা শিক্ষক রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান। বুধবারই রাত ৯টার দিকে পল্টন মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে একটি কাভার্ড ভ্যান রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক ব্যক্তিকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলে।

 

মন্তব্য