kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অক্টোবর ২০১৯। ৩০ আশ্বিন ১৪২৬। ১৫ সফর ১৪৪১       

নিষিদ্ধ চুক্তিতেই চলে ‘সুপ্রভাত’

অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামে চালকরা

পার্থ সারথি দাস, ঢাকা ও শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নিষিদ্ধ চুক্তিতেই চলে ‘সুপ্রভাত’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি গত বছরের ৯ আগস্ট থেকে চালকদের দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ না দেওয়ার নিয়ম চালু করলেও সুপ্রভাত বাস কম্পানি তা মানেনি। এ কারণে যাত্রী ধরা ও বেশি ট্রিপ দেওয়ার জন্য বেপরোয়া গতিতে ছোটা, ওভারটেক ও যত্রতত্র থামানোর প্রতিযোগিতায় ‘স্পেশাল’ এই সার্ভিস আর সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। পথচারী, ছোট ও কম গতির পরিবহন—কাউকে পাত্তা দিত না এর চালকরা।

সুপ্রভাত স্পেশাল বাসের চাপাতেই গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বসুন্ধরা গেট এলাকায় প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। ঢাকা মহানগরী থেকে গাজীপুরের গাজীপুরা পথে চলাচল করে সুপ্রভাত পরিবহন। সুপ্রভাত পরিবহনের পাশাপাশি বছরখানেক আগে ‘আকাশ সুপ্রভাত’ নামে আরো একটি ব্যানারে বাস পরিচালনা শুরু করে কম্পানিটি। দুই নামে এখন গাড়ি আছে প্রায় ৪০০। এদের বাস এর আগেও ঢাকা ও তার আশপাশে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটিয়েছে।

সুপ্রভাত সার্ভিসটি আগে পরিচালনা করতেন মোটর পার্টস ব্যবসায়ী মো. আশরাফ উদ্দিন। এক বছর ধরে এ সার্ভিস চলছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহর নিয়ন্ত্রণে।

গত ১ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসের চাপায় নাহিদ পারভীন পলি (২২) ও মিম নামে দুই পোশাক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর মালিবাগে আবুল হোটেলের সামনে বাসচালকের শাস্তির দাবিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে রাখে। ওই ঘটনার পর বাস ও বাসের চালককে আটক করেছিল হাতিরঝিল থানা-পুলিশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রভাতের একজন বাসচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশরাফ উদ্দিন দায়িত্বে থাকার সময় যাত্রীরা টিকিট কেটে বাস উঠত। সব আয় একসঙ্গে জমা হতো। চাঁদাসহ সড়কের সব খরচ মালিক দিতেন। চালক, হেলপার ও সুপারভাইজরদের দেওয়া হতো নির্দিষ্ট বেতন। তাই চালকদের যাত্রী ধরার তাড়া ছিল না। কিন্তু খন্দকার এনায়েত উল্লাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই প্রথা বাতিল করেন। এখন চুক্তির ভিত্তিতে বাস চালাতে হয় চালকদের। মালিকের দৈনিক জমা চার হাজার, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে চাঁদা দিতে হয় এক হাজার ৩০ টাকা, পাঁচ জায়গায় ওয়েবিল চেক হয়। চেকারদের দিতে হয় ১০ টাকা করে ৫০ টাকা। জ্বালানি লাগে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার। সার্জেন্ট, পুলিশ ও অন্যান্য খরচ হয় আরো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এসব খরচ বাদ দেওয়ার পর হেলপার ও সুপারভাইজরকে ২০০ করে ৪০০ টাকা দেওয়ার পর যদি কিছু থাকে তা নেয় চালক।’

তিনি জানান, দিনে দুই ট্রিপ দিলে ওই সব খরচের পর আর কিছু থাকে না। আবার পুলিশ প্রায়ই মামলা দেয়। তাই তিন ট্রিপ ধরার জন্য দ্রুতগতিতে চলতে বাধ্য হয় চালকরা। আবার মামলা দিলে জরিমানার টাকার অর্ধেক মালিক, অর্ধেক চালককে দিতে হয়। নানা হয়রানি করে। তাই ট্রাফিকের হয়রানি থেকে বাঁচতেও অনেক সময় চালকরা বেপরোয়া চলে।

রাজধানীর প্রগতি সরণি-কুড়িল সড়কে গতকাল সাতসকালে শিক্ষার্থী আবরারকে পিষে ফেলা বাসটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো ব-১১-৪১৩৫। দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বাসটির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে সারা দিন খোঁজার পর অবশেষে পাওয়া তথ্য অনুসারে জানা যায়, বাসটির রুট পারমিট নেওয়া হয়েছিল বিআরটিএর এলেনবাড়ীর সদর কার্যালয় থেকে। চলাচলের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত। এর মালিকানায় রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডের নাম। ব্যাংক ঋণে বাসটি কেনা হয়েছিল ২০০৮ সালে।

প্রায় ১০ বছরের পুরনো বাসটির মডেল ছিল ২০০৭ সালের। নিবন্ধন করা হয়েছিল ২০০৮ সালের ৩১ আগস্ট। রুট পারমিট হালনাগাদ করা ছিল না। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২ মে পর্যন্ত রুট পারমিটের অনুমোদন ছিল। তবে রুট পারমিটের মেয়াদ হালনাগাদ করার জন্য বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে বাসটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষ আবেদন করেছিল। বাসের ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদও ছিল না। এই মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩১ আগস্ট।

এই অবস্থায় গতকাল বিকেলে বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয় থেকে পরিচালক (প্রকৌশল) মো. রফিকুল ইসলাম বাসটির মালিকের কাছে নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে বলে চিঠি পাঠিয়েছেন। রুট পারমিটও বাতিল করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, গতকাল দুর্ঘটনায় জড়িত বাসটি বেপরোয়াভাবে চালচ্ছিলেন চালক সিরাজুল ইসলাম। পুলিশ তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।

গতকাল দুর্ঘটনার পর ঢাকার রাস্তায় সুপ্রভাত পরিবহনের বাস চলাচল করেনি। চালক, চালকের সহকারীরা বিভিন্ন স্থানে বাস রেখে নিরাপদে সরে যায়। কুড়িল চৌরাস্তা থেকে ৩০০ ফুট সড়কের পাশে সুপ্রভাত পরিবহন ও আকাশ সুপ্রভাত পরিবহনের বাসগুলোর দরজা বন্ধ করে বেশির ভাগ পরিবহনকর্মী আশপাশে অবস্থান করছিল। কেউ কেউ বাসের ভেতরেও ছিল।

সুপ্রভাত পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১২০৯০১) ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, বিভিন্ন আসন ছেঁড়া। আসন আছে ৪৮টি। এই বাসের চালকের সহকারী জুয়েল ইসলাম বলেন, ‘দিনে ১৫ হাজার টাকা আয় না হলে আমাদের বেতন হয় না। অথচ দিনে খরচ হয় সাড়ে ৯ হাজার টাকা। এ কারণে প্রতিযোগিতা করে চালাতে হয়।’ নির্দিষ্ট বাস স্টপেজে বাস কেন থামান না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, সার্জেন্ট দাঁড়িয়ে থাকেন, মামলা দেন, তাই চলন্ত অবস্থায় যাত্রী তুলতে হয়। তিনি জানান, কয়েকটি মামলা আছে গাড়ি ও চালকের বিরুদ্ধে।

কুড়িলে সড়কের পাশে অর্ধশতাধিক সুপ্রভাত পরিবহনের বাসের চালক ছিল লাপাত্তা। এই বাসগুলোয় উঠেও দেখা গেল কোনোটির আসন ছেঁড়া, কোনোটির জানালার গ্লাস ভাঙা। একটি বাসের (নম্বর-ঢাকা মেট্রো-ব-১৫৩৮৫৪) চালকের সহকারী রতনুজ্জামান বলেন, ‘সদরঘাট থেকে গাজীপুরা রুটে আমাদের ২২০টি বাস চলত। তবে এখন সুপ্রভাত, আকাশ সুপ্রভাতসহ কমপক্ষে ৪০০ বাস চলে। এ কারণে রাস্তায় প্রতিযোগিতা করেই বাস চালাতে হয়। আমি ছয় দিন ধরে এ বাসে সহকারীর কাজ করছি। একটি বা কয়েকটি বাসের মালিক একজন। তবে দুটি ব্যানারের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত আছেন নির্দিষ্ট কয়েকজন।’

জানা গেছে, আকাশ সুপ্রভাত চলাচল করে উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে কদমতলী পর্যন্ত। প্রগতি সরণি হয়ে চলাচলকারী মোটরসাইকেলের চালক মো. মাসুদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এই সড়কে সুপ্রভাত পরিবহনের চালকরা বেশি বেপরোয়া। কোনো নির্দিষ্ট স্টপেজে তারা থামতে চায় না। বারবার দুর্ঘটনা ঘটায়।

ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আবদুল আলীম বলেন, সুপ্রভাত পরিবহনের বাসে দাঁড় করিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হয়। চালকরাও বেপরোয়া। উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে কদমতলী রুটে আকাশ সুপ্রভাত চলাচল করে ২৩টি। এই বাসে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৫৫ টাকা। কিন্তু বাসে উঠলেই যাত্রীদের দিতে হয় কমপক্ষে ১৫ টাকা।

একাধিক শ্রমিক, বাসচালক ও সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুপ্রভাত স্পেশাল বাস সার্ভিসটির রুট পারমিট রাজধানীর সদরঘাট থেকে রামপুরা হয়ে উত্তরা পর্যন্ত। পরিবহন নেতার প্রভাবের কারণে চলছে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর গাজীপুরা পর্যন্ত। ৭০টি বাস চলার অনুমোদন থাকলে চলছে প্রায় ৪০০। গতকাল দুপুরে গাজীপুরা গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সারি সারি করে রাখা হয়েছে সুপ্রভাতের বাস।

সুপ্রভাতের টঙ্গী স্টেশন রোডের সুপারভাইজার কামরুল ইসলাম জানান, তিনি বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে বাস চলাচল তত্ত্বাবধান করেন। রুট পারমিটসহ অন্যান্য বিষয়ে তিনি খন্দকার এনায়েত উল্লাহর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। যোগাযোগ করা হলে এনায়েত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চুক্তিতে চলা বন্ধ করেছিলাম ৮০ শতাংশ বাসে। তবে সিটি করপোরেশন কাউন্টার করার জায়গা না দেওয়ায় আমাদের এ উদ্যোগের সুফল ধরে রাখতে পারিনি। সুপ্রভাত পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল ইসলাম। আমাদের সমিতি থেকে একজন প্রতিনিধিকে কম্পানির বাস চলাচল দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলাম।’ 

বেসরকারি সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত নূর বলেন, গত বছরের ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসচাপায় দুই স্কুল শিক্ষার্থী নিহতের জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। ওই সময় বেপরোয়া গতির জন্য দায়ী ‘চুক্তিভিত্তিক বাসচালক নিয়োগ’ পদ্ধতি বাতিলের দাবি উঠেছিল সব মহল থেকে। ওই অঙ্গীকার আর আলোর মুখ তো দেখেইনি বরং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাশালী পরিবহন নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ নিজেই চুক্তিভিত্তিক বাস সুপ্রভাত বাস চালাচ্ছেন।

গাজীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী আশরাফ সিদ্দিকী সুপ্রভাত স্পেশাল সার্ভিসের রুট পারমিট ও অনুমোদিত বাসের সংখ্যা প্রসঙ্গে জানান, এ বিষয়ে তাঁর জানা নেই। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (দক্ষিণ) কমিশনার মো. নজরুল ইসলাম জানান, তিনি সাময়িক দায়িত্বে রয়েছেন। তাই সুপ্রভাতের রুট পারমিট, বাসের সিলিং ও ভাড়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাবেন।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, সুপ্রভাত পরিবহনের অভিযুক্ত চালকদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া কম্পানির দায় নিরূপণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকার রাস্তায় প্রতিযোগিতায় নামে অপ্রশিক্ষিত চালকরা। এখানে মালিক ও পরিচালনা পর্যদের দায়িত্বহীনতাও আছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা