kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

ভোট শেষে ফেরার পথে ব্রাশফায়ার, নিহত ৭

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি ও জাকির হোসেন, দীঘিনালা থেকে   

১৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভোট শেষে ফেরার পথে ব্রাশফায়ার, নিহত ৭

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে নির্বাচনকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের নয়মাইল এলাকায় এ সশস্ত্র হামলা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই শিক্ষক মো. আমির হোসেন, ভিডিপি সদস্য আল আমিন, বিলকিস বেগম, মিহির কান্তি দত্ত ও জাহানারা বেগম এবং পথচারী মন্টু চাকমা নিহত হন। সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আহত আবু তৈয়ব আলী। স্থানীয় এক মাদরাসার এই শিক্ষক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। আহতদের নাম তাত্ক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা অভিযোগ করেছেন, জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ এই হামলা চালায়। তবে অভিযুক্ত পক্ষের নেতারা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এই নির্বাচনী কর্মীরা বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাঘাইহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে সারা দিন দায়িত্ব পালন শেষে একসঙ্গে বিজিবি পাহারায় গাড়িবহর নিয়ে ফিরছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, সাজেক ইউনিয়নের তিনটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ নির্বাচন কর্মকর্তারা সহযোগী আনসার ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিজিবি পাহারায় বাঘাইছড়ি ফিরছিলেন। পথে তিনটি চাঁদের গাড়িতে থাকা নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করা হলে দ্বিতীয় গাড়িটি আক্রান্ত হয়। তবে আক্রান্ত গাড়ির চালক না থেমে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে গাড়ি থেকে নামানোর পর একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকেন গুলিবিদ্ধরা।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাদিম সারোয়ার জানান, তিনটি কেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে তাঁদের ওপর এ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে।

চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। আহত আরো ১০ জনকে এই হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তিনটি হেলিকপ্টারে করে তাঁদের চট্টগ্রাম সম্মিলিত হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে পাঁচজন পুলিশ, তিনজন আনসার সদস্য এবং বাকিরা বেসামরিক কর্মকর্তা বলে এক চিকিত্সক জানিয়েছেন। তবে তাঁদের অবস্থা কেমন তা কেউ উদ্ধৃত হয়ে বলতে চাননি।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা অভিযোগ করেছেন, সন্তু লারমার জেএসএসের বড়ঋষি চাকমা নিশ্চিত পরাজয় জেনে সকালে নির্বাচন বর্জন নাটক করেন এবং সন্ধ্যায় সরকারি কাজে নিয়োজিতদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছেন।

তবে এ বিষয়ে জানতে কথা বলা সম্ভব হয়নি বড়ঋষি চাকমার সঙ্গে। তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় ঘটনার পর থেকেই। কিন্তু সংগঠনটির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক  ও বড়ঋষির রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ত্রিদিব চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে আমাদের দূরতম সম্পর্কও নেই। কারণ ওই এলাকায় আমাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থান নেই। সিটি পুরোটাই ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। আর আমরা যেহেতু সকালেই নির্বাচন বর্জন করেছি এবং লিখিতভাবে আমাদের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি, আমরা কেন এমন কাজ করব? আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী; গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই আমাদের আস্থা আছে।’

সংগঠনের তরফে ত্রিদিব চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করলেও ভোট বর্জনের বিবৃতিতে হুমকি ছিল। ‘অনতিবিলম্বে বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে  কেন্দ্র দখল করে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিল করা না হলে বাঘাইছড়ি উপজেলায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারই দায়ী থাকবে।’ এভাবেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন রাঙামাটির প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সমর্থনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়া বড়ঋষি চাকমা। সকালে ভোট বর্জন করে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারিটি পাওয়া যায়।  তিন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সুমিতা চাকমা, সমীরণ চাকমা ও অমরশান্তি চাকমাও বর্জন করেন ভোট। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাঙামাটির নির্বাচনী ইতিহাসে অনাকাঙ্ক্ষিত শুধু নয়, ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেছেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সুস্থ মস্তিষ্কের কারো কাজ নয়। এই নির্বাচনে আমাদের এখানে কোনো প্রার্থীও ছিল না। আমরা কেন এই কাজ করতে যাব?’

এই উপজেলায় নির্বাচনে জাতীয় কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা সুদর্শন চাকমা। এই দুই নেতার ভোটযুদ্ধ নিয়ে উত্তাপ ছিল যথেষ্ট। ভোটের প্রচারণার মধ্যেই গত ৩ মার্চ উপজেলার বঙ্গলতলিতে হামলায় নিহত হন জনসংহতি সমিতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা উদয় জয় চাকমা চিক্কোধন। গতকাল সর্বশেষ ভোটের দিন সকালে নির্বাচনে অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল এবং চারটি কেন্দ্রে রাতেই ভোট দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে সকাল ১০টায় ভোট বর্জন করেন জনসংহতি সমিতির প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা।

এদিকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন জাতীয় দায়িত্ব পালনরত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ওপর এরূপ কাপুরুষোচিত বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।’ আক্রান্তরা ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচনী ফল, মালামালসহ উপজেলা সদরে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে ফিরছিলেন বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

সর্বশেষ খবর মতে, গুরুতর আহত সাতজনকে উন্নত চিকিত্সার জন্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা