kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

খুনির বন্দুকে এবা হত্যার প্রতিশোধ!

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খুনির বন্দুকে এবা হত্যার প্রতিশোধ!

খুনি ব্রেন্টন টারান্ট

সেন্ট্রাল স্টকহোমে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল শ্রবণপ্রতিবন্ধী একাদশী সুইডিশ কিশোরী এবা অকারল্যান্ডকে ট্রাকচাপা দিয়ে মেরেছিল ‘আইএস অনুগত’ ও অভিবাসনপ্রত্যাশী মুসলিম রখমত আকিলভ। প্রায় দুই বছরের মাথায় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে মুসলমানদের মেরে সেই হামলার প্রতিশোধ নিয়েছে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী অস্ট্রেলীয় ব্রেন্টন টারান্ট। ইউরোপ তথা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে অভিবাসী মুসলমানদের বিতাড়নও ছিল বর্ণবাদী ও জাতিবাদী এই সন্ত্রাসীর হামলার লক্ষ্য। এসব লক্ষ্যের বিষয়ে রাইফেলের গায়ে লিখে হামলা চালিয়ে সারা বিশ্বকে বার্তা দিতে চেয়েছিল টারান্ট।

অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলা চালানোর কারণ ব্যাখ্যা করে অনলাইনে নিজের ‘ইশতেহার’ ঘোষণা করেছিল ওই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার আগেই ‘বিশ্বের দ্বিতীয় নিরাপদ দেশের’ শান্ত শহর ক্রাইস্টচার্চের আল নুর ও লিনউড মসজিদে গতকাল দুপুরে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় অর্ধশত প্রাণ ঝরে গেছে। ধরা পড়েছে টারান্টা। হামলায় আরো সন্ত্রাসী জড়িত আছে বলে সে দেশের পুলিশ জানিয়েছে।

যে টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টারান্ট উগ্রবাদী বার্তা, অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক ধাঁচের পোশাকের ছবি প্রকাশ করেছে সেটি গতকালের হামলার পর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার অস্ত্রের গায়ে অতীতে বিভিন্ন লড়াই ও সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলাগুলোর কথা উল্লেখ রয়েছে। টারান্টের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সরিয়ে নেওয়ার আগে ১৭ মিনিট ধরে নির্মম, বর্বর, নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সরাসরি প্রচার করেছে সে। এই ভিডিওটি পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

উগ্রবাদী ও মুসলিমবিরোধী টারান্ট তার ৭৪ পৃষ্ঠার লেখায় নিজেকে ‘একজন জাত শ্বেতাঙ্গ’ হিসেবে উল্লেখ করে। ২৮ বছর বয়সী ওই অস্ট্রেলীয় খ্রিস্টান সন্ত্রাসীর জন্ম নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারে। তার পূর্বপুরুষরা স্কটিশ, আইরিশ ও ইংরেজ।

ফেসবুকে প্রকাশ করা ‘ইশতেহারের’ শুরুতেই ব্রেন্টন টারান্ট তার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল একটি কবিতার মাধ্যমে, যার একটি পঙিক্ত ছিল, ‘জন্মহার অবশ্যই বদলাতে হবে।’ তার লেখায় অইউরোপীয়দের নিন্দা এবং ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। সে উইকিপিডিয়ার বেশ কিছু পাতার উদ্ধৃতি দিয়েছে। কট্টর বর্ণবাদী শব্দসংবলিত ওই লেখনীতে ‘হোয়াইট জেনোসাইড’ (শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা) বলে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

টারান্ট তার প্রতিশোধমূলক সন্ত্রাসী হামলার কারণ হিসেবে অভিবাসী মুসলমানদের ‘দখলকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছে, ‘আমাদের ভূমি কখনো তাদের হবে না।’ সে আরো লিখেছে, এই হামলা এবা অকারল্যান্ড হত্যার প্রতিশোধ। সে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এবা অকারল্যান্ডের ওপর সন্ত্রাসী হামলার কথাও উল্লেখ করে।

টারান্ট তার পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছে, ‘দখলকারীদের শারীরিকভাবে শেষ করে দিয়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ইউরোপীয় ভূমিতে সরাসরি অভিবাসনের হার কমানো যাবে।’

অভিবাসী মুসলমানদের ওপর হামলার কারণ প্রসঙ্গে টারান্টের যুক্তি, এরা বড় অভিবাসীগোষ্ঠী। তাদের জন্মহার বেশি, সামাজিক বন্ধন জোরালো এবং স্থানীয়দের হটিয়ে এদের ‘দখলদারির’ বড় ইতিহাস আছে।

ব্রেন্টন টারান্ট দুই বছর ধরে এই হামলার ছক কষছিল। গত তিন মাসে তার দৃষ্টি পড়ে মসজিদের লোক সমাগমের দিকে।

শুক্রবারই কেন হামলা—এ প্রসঙ্গে টারান্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে, তার দৃষ্টিতে গত বৃহস্পতিবারই ছিল হামলার সেরা সময়। দ্বিতীয় সেরা সময়টি ছিল শুক্রবার। যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিজের হিসাব-নিকাশ চুকানো, নিজের বক্তব্য অনলাইনে প্রকাশ শেষে হামলা চালিয়েছে সে।

হামলার জন্য নিউজিল্যান্ডকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে টারান্ট লিখেছে, নিউজিল্যান্ড শুরুতে তার হামলার জন্য পছন্দের জায়গা ছিল না। বরং সাময়িকভাবে থাকার জন্য সে সেখানে গিয়েছিল। এর পর সেখানে হামলার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর পশ্চিমের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে নিউজিল্যান্ডকে হামলার জন্য আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করে সে।

উগ্র ডানপন্থী ওই সন্ত্রাসী নিজেই লিখেছে, ‘নিউজিল্যান্ডে হামলা হলে তা হবে আমাদের সভ্যতার জন্য সত্যিকারের আঘাত। এতে বোঝা যাবে যে বিশ্বের কোনো স্থানই নিরাপদ নয়।’ সুইডেনে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সে নিজে যে হামলাটি করেছে সেটিকেও সন্ত্রাসী হামলা বলেই স্বীকার করে। সে দাবি করেছে, ‘দখলদারি (অভিবাসী) শক্তির বিরুদ্ধে এটি আংশিক উদ্যোগ।’

‘ইশতেহারে’ ওই সন্ত্রাসী আরো বলে, হামলায় বর্ণবাদী উপাদান আছে। তবে বিচারের মুখোমুখি হয়ে সে নিজেকে নির্দোষ বলেই দাবি করবে।

অস্ত্রের গায়ে ছিল মুসলমানবিদ্বেষ

টারান্টের ব্যবহার করা রাইফেলের গায়ে লেখা ছিল মুসলমানদের ওপর হামলাকারী অনেকের নাম। নামগুলো হচ্ছে : অ্যান্টন লুন্ডিন পিটারসন, সুইডেনে দুজন অভিবাসী শিক্ষার্থীকে হত্যাকারী ছাত্র; আলেকজান্ড্রে বিসোনেট, ২০১৭ সালে কানাডায় মসজিদে হামলাকারী ও ছয়জনকে হত্যাকারী; স্ক্যান্ডারবার্গ, অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেপথ্যের নেতা; অ্যান্টোনিও ব্র্যাগাডিন, ভেনিশীয় সামরিক কর্মকর্তা যিনি চুক্তি ভেঙে বন্দিদের হত্যা করেছিলেন; চার্লস মর্টেল, টুরসের যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজিত করা সামরিক নেতা। 

একনজরে ব্রেন্টন টারান্ট

অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ড—কোনো দেশের নিরাপত্তাকর্মীদের কাছেই টারান্টের ব্যাপারে আগাম কোনো তথ্য ছিল না। স্কাই নিউজের খবরে বলা হয়, টারান্টের বসবাস গ্রাফটোন শহরে। কিন্তু ওই শহরের লোকজন তাকে ‘নিরীহ’ মানুষ হিসেবেই জানত। ২০১০ সালে তার বাবা ক্যান্সারে মারা যান। এর পর সে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায়। টারান্টের ঘনিষ্ঠজনদের ধারণা, ওই সময়গুলোতে সে উগ্র মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা