kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

অজ্ঞাত নারী বাঁচিয়ে দিল বাংলাদেশ দলকে

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অজ্ঞাত নারী বাঁচিয়ে দিল বাংলাদেশ দলকে

মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ম্যাট বাসবির হাতে গড়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দল, কলম্বিয়ার বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন চাপেকোয়েনশে ফুটবল ক্লাবের বেশির ভাগ খেলোয়াড়। ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও এভাবে এক ঝটকায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দেশের ক্রিকেট এখন সামর্থ্যে, খ্যাতিতে, অর্থে—সব দিক দিয়েই শীর্ষবিন্দুতে, সেখান থেকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারত এক লহমাতেই। বাঁচিয়ে দিলেন অজ্ঞাতপরিচয় এক মহিলা। সংবাদ সম্মেলন শেষে জুমার নামাজের জন্য আল নূর মসজিদে পৌঁছতে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল তামিম ইকবাল-মাহমুদ উল্লাহদের। সেই দেরিটাই বোধ হয় আয়ুরেখা বাড়িয়ে দিল তাঁদের। মসজিদের খানিকটা আগেই অজ্ঞাতপরিচয় এক মহিলা তাঁদের সাবধান করে দেন, সামনে গোলাগুলি হচ্ছে। তাই মসজিদে না গিয়ে বাসেই থেকে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেছেন ক্রিকেটাররা।

টিম বাসের সামনের দিকের আসনে বসা ছিলেন দলের সাপোর্ট স্টাফ মোহাম্মদ সোহেল। তিনি বলেন, ‘প্রথমে একজন মহিলা আমাদের থামান। আমরা ভেবেছিলাম, উনি বুঝতে পারছেন না উনি কী করছেন। পরে আরেকজন মহিলা আমাদের থামান। তাঁর গাড়িতে গুলি লেগেছিল। তখন আমরা বুঝতে পারি একটা কিছু হয়েছে।’ হোটেলে ফেরার পর বাংলাদেশ দলের ভিডিও অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরন ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইকে জানান মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার কথা, ‘আমি প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি। এ রকম পরিস্থিতিতে ভয়ে কিছু কাজ করে না মাথায়, আমারও করেনি। মসজিদ থেকে কয়েক মিটার দূরে ছিলাম আমরা, হঠাৎ গুলির আওয়াজ পেলাম। কেউ বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। হঠাৎ দেখলাম এক নারী রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। ভেবেছি সে অজ্ঞান হয়ে গেছে। এরপর বুঝতে পারলাম ঘটনা আরো ভয়াবহ। জীবন বাঁচাতে সবাই দৌড়াচ্ছে। সব জায়গা ছিল রক্তে ভেজা। আমাদের সবাইকে বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়তে বলা হলো। জানি না কতক্ষণ আমরা ওভাবে ছিলাম।’ দলের ম্যানেজার খালেদ মাসুদ হোটেলে ফেরার পর জানিয়েছেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা, ‘আমরা সত্যিকার অর্থেই খুব ভাগ্যবান। বাসে আমরা ১৬-১৭ জন ছিলাম। ঘটনাস্থল থেকে ৫০ গজের মতো দূরে ছিলাম। আর যদি তিন-চার মিনিট আগে আসতাম, তাহলে হয়তো মসজিদের ভেতরে থাকতাম। তখন অনেক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেত। আমরা খুব সৌভাগ্যবান বলেই বেঁচে গেছি।’ বাসের ভেতর থেকেই রক্তাক্ত মানুষকে মসজিদ থেকে বের হতে দেখেছেন মাসুদ। পুরো ব্যাপারটাই তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্যের মতো, ‘বাসের ভেতর থেকে দেখছিলাম, অনেক রক্তাক্ত মানুষ বেরিয়ে আসছে মসজিদ থেকে। প্রায় ৮-১০ মিনিট আমরা বাসের ভেতরে মাথা নিচু করে ছিলাম, যাতে বাসে গুলি করলেও আমরা বেঁচে যেতে পারি। অবশ্য পরে বাস থেকে বেরিয়ে এসেছি, কারণ মনে হয়েছে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে কেউই বাঁচব না।’ সংবাদ সম্মেলনের পর ক্রিকেটাররা মসজিদের দিকে চলে যান নামাজের জন্য। সাংবাদিকদের অনেকেই ছিলেন হ্যাগলি ওভালেই। তামিম ইকবালই প্রথম ফোন করে বাংলাদেশের একজন সাংবাদিককে বলেন, ‘এখানে মসজিদে গোলাগুলি হচ্ছে, আমাদের বাঁচান।’ তারপর বাংলাদেশের সাংবাদিকরা ডিন এভিনিউর (ঘটনাস্থল) দিকে ছুটে গেলে দেখতে পান ক্রিকেটাররা বাস থেকে বের হয়ে দ্রুত পদক্ষেপে ফিরে আসছেন মাঠের দিকে। এ সময় ক্রিকেটাররা ছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত। প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাঠে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পান ক্রিকেটার, সাপোর্ট স্টাফ ও সাংবাদিকরা।

এমন নারকীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মুষড়ে পড়েছেন বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। মাসুদ বলেন, ‘চোখের সামনে রক্তাক্ত মানুষকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে কেউই স্বাভাবিক থাকতে পারে না। ক্রিকেটাররা বাসের ভেতর কান্নাকাটি করেছে। কী করলে বেরিয়ে আসতে পারি এসব কথা হয়েছে। খুবই কঠিন ছিল সময়টা।’ প্রবল মানসিক আঘাত সামলে বাংলাদেশ দলের সদস্যরা এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে ক্রিকেটারদের।

বাংলাদেশ দলের সদস্যদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিলেন দেশের মানুষ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। টুইটার বার্তায় তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম জানিয়েছেন তাদের নিরাপদে থাকার কথা। তামিম জানিয়েছেন, ‘গোটা দল আক্রমণকারীদের গোলাগুলির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। ভীতিকর অভিজ্ঞতা, আপনাদের সবার দোয়া চাইছি।’ মুশফিক জানিয়েছেন, ‘আল্লাহর রহমতে আজকে আমরা ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে গোলাগুলি থেকে রক্ষা পেয়েছি। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান। এ রকম আর কিছু দেখতে চাই না, সবাই দোয়া করবেন।’

সৌভাগ্য কিংবা বাংলাদেশের মানুষের প্রার্থনার শক্তিই হয়তো প্রাণে বাঁচিয়েছে ক্রিকেটারদের। অজ্ঞাতপরিচয় দুই মহিলা অজান্তেই বাঁচিয়ে দিয়েছেন দেশের ক্রিকেটের একটা প্রজন্মকে। তা না হলে হয়তো দেশজুড়ে বইত কান্নার রোল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা