kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

সম্প্রীতির শহরে হঠাৎ রক্তপাত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সম্প্রীতির শহরে হঠাৎ রক্তপাত

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ডিনস এভিনিউয়ের আল নূর মসজিদে যখন জুমার নামাজের জামাত শুরু হয়, তখন সেমি অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে মুসল্লিদের ওপর হামলে পড়ে এক সন্ত্রাসী। ‘মুসলমান, আজ তোমাদের খুন করতে যাচ্ছি’ বলে সে চিৎকার করছিল আর অনবরত গুলির পর গুলি করে যাচ্ছিল। প্রথমে বাইরে থেকে, পরে ভেতরে ঢুকে গুলি চালাচ্ছিল। এর মধ্যেই মুসল্লিদের কেউ মসজিদের অন্য দরজা দিয়ে, কেউ জানালার কাচ ভেঙে বের হয়ে প্রাণ রক্ষা করে। মসজিদের ভেতরে তখন করুণ আর্ত

চিৎকার, আর বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। লাশের স্তূপ পড়ে থাকে মসজিদের প্রধান ফটক ও পুরুষদের কক্ষে। বেঁচে যাওয়া ভীতসন্ত্রস্ত নারী, পুরুষ ও কিশোর-কিশোরী মুসল্লিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছিল। সবার যেন একই চিন্তা, এই বুঝি তার দিকে ধেয়ে আসছে সন্ত্রাসীর গুলি। আল নুর মসজিদে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে ভয়াবহতম এই সন্ত্রাসী হামলার বর্ণনা এভাবেই দিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লিরা।

মসজিদ থেকে বের হয়ে ১৮ বছরের মুসলিম তরুণী খালি পায়ে দৌড়াচ্ছিলেন ডিনস এভিনিউ ধরে। তাঁর সঙ্গে দৌড়াচ্ছিলেন তাঁর মা। যতই তিনি দৌড়াচ্ছিলেন, ততই তাঁর মনে হচ্ছে তাঁকেই টার্গেট করা হচ্ছে। তাঁর নাম মুলকি আবদিওয়াহাব। তিনি নিজেকে খুবই বিভ্রান্ত ও অনিরাপদ ভাবছিলেন। শুধু তিনিই নন, গতকাল নিউজ্যািন্ডের ক্রাইস্টচার্চ আল নুর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর সব মুসল্লিরই একই অনুভতি হচ্ছিল, এই বুঝি তিনিও গুলির শিকার হতে যাচ্ছেন।

মুলকি তাঁর মা-বাবার সঙ্গে ওই মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি এলাকা থেকে। তিনি জানান, তিনি যখন মসজিদে মেয়েদের একটি কক্ষে তাঁর মা, শিশু ও বড়দের সঙ্গে নামাজ প্রায় শেষ করতে যাচ্ছিলেন, তখনই গুলির শব্দ শুনতে পান।

মুলকি বলেন, ‘আমি জানতাম না। আমি জীবনে কখনই গুলির শব্দ শুনিনি। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, কেউ হয়তো জানালা ভাঙার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ আমার মা আমার হাত ধরেন। এরপরই আমরা বাইরে দৌড়াতে থাকি। সবাই তখন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়। সবাই দৌড়াচ্ছে জীবন বাঁচাতে। আমরা শুধু দৌড়াতেই থাকি। মনে হচ্ছিল আমিই টার্গেট। আর গুলির শব্দও ১০ মিনিট ধরে চলতে থাকে।’

ওই তরুণী বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম গুলির শব্দ প্রবেশ পথ থেকে আসছে। এরপরই পুরুষদের নামাজের কক্ষ থেকে গুলির শব্দ শুনতে পাই।’ তিনি বলেন, তিনি প্রায় ১০০টির মতো অটোমেটিক বন্দুকের গুলির শব্দ শুনতে পান। কেন গুলি হচ্ছে তা বুঝতে পারেননি।

নূর নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সামনের সারিতে নামাজ পড়ছিলাম। প্রথমে বাইরে গুলির শব্দ শুনি। এরপর বন্দুকধারী ভেতরে এসে এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করে। আমার চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ লোকজন মাটিতে পড়ছিল। গুলি মসজিদের দেয়ালেও আঘাত করছিল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে দেয়ালের দিকে সরে গিয়ে ভাঙা জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাই।’

তিনি বলেন, ‘জানালা দিয়ে বেরিয়ে পাশের একটি দেয়াল টপকে আমি ছুটতে থাকি। দৌড়ে ওই ব্লক পেরিয়ে যাওয়ার পরও গুলির আওয়াজ পাচ্ছিলাম।’

ইয়াসমিন আলী নামের এক নারী স্থানীয় পত্রিকা ওয়ান নিউজকে বলেন, তিনি নিউজিল্যান্ডে এমন নৃশংস ঘটনায় খুব কাছের একজন পারিবারিক বন্ধুকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৯ বছর ধরে তাঁকে চিনি। তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধু। তিনি মারা গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা ভাবতে পারবেন না নিউজিল্যান্ডে, ক্রাইস্টচার্চের মতো জায়গায়, যেখানে ছোট একটি জনগোষ্ঠী উদারতা ও সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করে, সেখানে এ ধরনের কিছু ঘটতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘কেন এ হামলা হলো আমি বুঝতেই পারছি না।’

‘সুতরাং আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কেন কেউ আমাদের ওপর এমনভাবে আঘাত করতে পারে, কেন আপনারা আমাদের এভাবে মূল্যায়ন করবেন? আমরা তো আপনাদের সঙ্গে খারাপ কিছুই করিনি।’ তিনি বলেন, ‘এখন একজন মুসলিম নারী হিসেবে আমি আমার নিরাপত্তার আশঙ্কায় ভোগছি।’

আনোয়ার আলসালেহ নামের এক মুসল্লি বলেন, তিনি তখন মসজিদের ছোট একটি অজুখানায় অজু করছিলেন। গুলির শব্দ পেয়ে তিনি সেখানে লুকিয়ে পড়েন এবং সেখান থেকেই কয়েকবার পুলিশকে কল করেন। কিন্তু কেউই ফোন ধরেনি। পরে অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুল্যান্স সেবায় ফোন দিয়ে বিপদের কথা জানান। তিনি তাদের বলতে থাকেন, ‘এখানে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড চলছে। দয়া করে সাহায্য করুন। পুলিশ পাঠান, তারা গুলি করেই যাচ্ছে।’

আনোয়ার আলসালেহ বলেন, “বন্দুকধারী তখন বলছিল, ‘...মুসলমান, তোমাদের আজ আমরা খুন করতে যাচ্ছি।’” তিনি আরো বলেন, গুলি খেয়ে আহত মানুষগুলো বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা (বন্দুকধারী) গুলি করতেই থাকে।’

আনোয়ার জানান, ২০ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তিনি বের হয়ে দেখতে পান অসংখ্য মানুষের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এদের সন্ত্রাসী বললে কম বলা হয়, এরা ঠাণ্ডা মাথার ভয়ংকর খুনি।’ তিনি জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি ফিলিস্তিন থেকে নিরাপদ দেশ হিসেবে  নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে এসে বসবাস শুরু করেন।

জর্দান থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী অভিবাসী জানান, তিনি সাত বছর আগে জর্দান থেকে এখানে আসেন। শান্তিময় পরিবেশে সন্তানদের বেড়ে ওঠার জন্যই এখানে তাঁর আসা। গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, কোথাও বাজি ফুটছে। কারণ নিউজিল্যান্ডে এর আগে কখনোই এমনটা ঘটেনি। ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পাঁচিল টপকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছেন তিনি। দেখতে পান, সবাই প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। পড়ে আছে নিস্তেজ দেহ।

ওই ব্যক্তি বলেন, নিহত কয়েকজনকে তিনি খুব ভালো করে চেনেন। তাঁদের একজন সিরিয়ান শরণার্থী, যিনি ছয় মাস আগে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছিলেন। স্ত্রী আর তিনটি ফুটফুটে সন্তান আছে ওই সিরীয় ব্যক্তির।

মসজিদে প্রায় ৪০০ মানুষ ছিল জানিয়ে মোহন ইব্রাহিম নামের এক মুসল্লি নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে বলেন, ‘শুরুতে আমি ভেবেছিলাম বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে এমনটা হচ্ছে। পরে দেখি সবাই দৌড়াতে শুরু করেছে।’ যখন তিনি কথা বলছিলেন তখনো তাঁর কয়েকজন বন্ধু মসজিদের ভেতর থেকে বের হতে পারেনি বলে তিনি জানান।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, হামলাকারী সামরিক বাহিনীর মতো পোশাক পরে ছিল। হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে সে ক্রামগত গুলি ছুড়ছিল। মসজিদের কাচের দরজা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসা আহমদ আল-মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘তার কাছে বড় একটি বন্দুক ছিল। সে ভেতরে ঢুকে সব দিকে গুলি করছিল।’

তখনো শার্টে রক্তের দাগ লেগে থাকা অন্য একজন বলেন, প্রাণ বাঁচাতে তিনি একটি বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম যেন তার বন্দুকের গুলি শেষ হয়ে যায়।’

টিভি এনজেডকে তিনি বন্দুকধারীকে এক ব্যক্তির বুকে গুলি করতে দেখেছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমি মনে মনে বলছিলাম, ঈশ্বর দয়া করুন, এই ব্যক্তির গুলি যেন ফুরিয়ে যায়।’

বেঁচে যাওয়া নুর হামজা (৫৪) নামের এক ব্যক্তি বলেন, যখন গুলি শুরু হয়, তখন অন্যদের সঙ্গে তিনি মসজিদ থেকে পালাতে থাকেন। তাঁরা একপর্যায়ে মসজিদের কাছে পার্ক করে রাখা গাড়িগুলোর আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখেন। এরপর তিনি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে গুলির শব্দ শুনতে পান। যখন সশস্ত্র পুলিশ সেখানে আসে, তখন তিনি বের হয়ে দেখেন, মসজিদের সামনের প্রবেশপথে অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে আছে। পরে তিনি জানালা দিয়ে মসজিদের ভেতরে তাকিয়ে দেখেন, সেখানে লাশের স্তূপ।

১৪ বছর বয়সী ইদ্রিস খাইরুদ্দিন নামের হিলমরটন হাই স্কুলের এক শিক্ষার্থী বলে, ‘প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এটা বুঝি নির্মাণকাজের কোনো শব্দ।’ এ সময় তার চাচা তমিজি আহত হন বলে সে জানায়। ইদ্রিস আরো বলে, ‘আমি মসজিদ থেকে বের হয়ে শুধুই দৌড়াচ্ছিলাম। যত দ্রুত পারি হ্যাগলি পার্কের দেয়াল টপকে দৌড়াতে থাকি। আমি থামিনি। পপ পপ পপ করে গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ৫০টির বেশি গুলির শব্দ হয়।’ মালয়েশিয়া থেকে আসা এই কিশোর জানায়, তার পরিবার মালয়েশিয়া থেকে এসেছে।

রাহিমি আহমদ (৪৯) নামের এক মুসল্লি তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে মসজিদে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যখন গুলি শুরু হয়, তখন তাঁর ছেলে মসজিদের বাইরে খেলছিল। তখন এক ব্যক্তি হাত ধরে ছেলেটিকে সরিয়ে নিয়ে তার বাড়িয়ে নিয়ে আশ্রয় দেয়।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা