kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

ঘাতকের গুলি থেকে টাইগারদের রক্ষা

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে ঢুকে হামলা, ৩ বাংলাদেশিসহ নিহত ৪৯

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘাতকের গুলি থেকে টাইগারদের রক্ষা

বন্দুকধারী ঘাতক গতকাল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে মসজিদে ঢুকে নির্বিচার গুলি চালায় (বাঁয়ে); মসজিদের কাছ থেকে ফিরে আসেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা। ছবি : সংগৃহীত

ভয়াবহ এক বর্ণবাদী হামলায় গতকাল শুক্রবার একদিকে রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ড, অন্যদিকে কম্পিত হয়েছে বাংলাদেশসহ বাকি বিশ্ব। ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটি মসজিদে ওই নির্বিচার হামলায় প্রাণ হারিয়েছে তিন বাংলাদেশিসহ ৪৯ জন। এই হত্যাযজ্ঞের কবল থেকে মাত্র মিনিট পাঁচেকের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সংবাদ সম্মেলনে দেরি না হলে বাংলাদেশের ১৭ ক্রিকেটার হয়তো ঘটনার সময় সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হওয়া মসজিদ আল নূরেই থাকতেন। মসজিদ আল নূরে নিহত হয় ৪১ জন। সাতজনের মৃত্যু হয় কাছের আরেকটি মসজিদ লিনউডে। আহত একজন মারা যায় হাসপাতালে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোক ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুটি মসজিদে ‘ভিডিও গেমস স্টাইলে’ এ হত্যাযজ্ঞ চালায় ব্রেনটন টারান্ট (২৮) নামের এক যুবক। হামলায় সে ব্যবহার করে সেমি-অটো রাইফেল। এ ছাড়া মাথার সঙ্গে ক্যামেরা লাগিয়ে লোমহর্ষক এ হামলা ১৭ মিনিট ধরে ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করে সে। সেখানে নিজের পরিচয় দিয়ে জানায়, সে অস্ট্রেলিয়ার বংশোদ্ভূত একজন শ্বেতাঙ্গ। টারান্টকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আজ শনিবার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে তাকে আদালতে তোলার কথা রয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের ৪৮ লাখ বাসিন্দা প্রতিবছর গড়ে ৫০টির মতো হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে অভ্যস্ত। সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে গতকাল শিশু-নারীসহ ৪৯ জনের লাশ দেখতে হলো তাদের। এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন ২০ জন। হামলাকারী ব্রেনটন টারান্টসহ গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে। এদের মধ্যে একজন নারী। চারজনের একজনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয় ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায়। দেশটির পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ জানান, অন্য দুজনের হামলায় সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে যখন হামলা হয়, তখন মসজিদ দুটিতে মুসল্লিরা জুমার নামাজের খুতবা শুনছিল। এর মধ্যে ডিনস এভিনিউ এলাকার মসজিদ আল নূরে একেবারে সামনের কাতারে বসেছিলেন নূর তাভিস নামের এক যুবক। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এক বন্ধু ছিল। গুলির শব্দ শুনলেও শুরুতে কী হচ্ছে আমরা তা বুঝতেই পারছিলাম না। এরপর আমরা লোকজনের আর্তনাদ শুনতে পাই। আর্তনাদের সমান তালে শুনতে পাই গুলির শব্দ। লোকজন এদিক-সেদিক পালানোর চেষ্টা করছে। অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছে।’ তাভিস আরো বলেন, ‘একজনকে দেখলাম জানালার কাচ ভেঙে লাফ দিতে। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। এ ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ ছিল না।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘হামলাকারীর কাছে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। নইলে কারো পক্ষে এত দ্রুত বন্দুকের ট্রিগার চালানো সম্ভব নয়।’

আজ থেকে ক্রাইস্টচার্চে শুরু হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ক্রিকেট টেস্টের। এই ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলন একটু লম্বা হওয়ায় জুমার নামাজ ধরার তড়িঘড়িতে থাকা সতীর্থদের অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। এরপর মাহমুদ উঠতেই ছেড়ে যাওয়া টিম বাস নুর মসজিদের যখন ৫০ গজের মধ্যে, তখন নিজের গাড়ি থেকে নেমে পথরোধ করে দাঁড়ান এক ভদ্রমহিলা। আর সামনে না এগোনোর আহ্বান জানানো অজ্ঞাতপরিচয় সেই নারী জানান, মসজিদের ভেতরে গোলাগুলি চলছে। বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাসুদ বিভীষিকাময় সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় বলেন, ‘আমরা মসজিদের খুব কাছেই চলে গিয়েছিলাম। বাস থেকে মসজিদও দেখা যাচ্ছিল। ভাগ্য আমাদের খুবই ভালো যে তিন-চার মিনিট আগে চলে এলেও হয়তো আমরা মসজিদের ভেতরেই থাকতাম। ভয়ানক কিছু ঘটে যেতে পারত।’

হামলার ভয়াবহতার কিছুটা নিজ চোখেই দেখেছেন বাসের ভেতরে থাকা বাংলাদেশ দলের সদস্যরা। খালেদ মাসুদ বলেন, ‘বাসের ভেতর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম, বেশ কিছু মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসছে। প্রায় ৮-১০ মিনিট আমরা বাসের ভেতরেই ছিলাম। মাথা নিচু করে ছিল সবাই, যাতে গুলি না লাগে।’ তিনি জানান, পরে তাঁরা বাস থেকে নেমে ঢুকে পড়েন পাশের হ্যাগলি পার্কে। সেখান থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যান।

দুই দেশের বোর্ডের সম্মতিতে ক্রাইস্টচার্চ টেস্ট বাতিল করার কথা জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট (এনজেডসি)। বাংলাদেশ দল আজ রাতেই দেশে ফিরছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান ঢাকায় বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডে যে পরিস্থিতি, এর মধ্যে খেলার প্রশ্নই আসে না। যত দ্রুত সম্ভব, দলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, হামলাকারী প্রথমে একটি প্রাইভেট কার চালিয়ে মসজিদ আল নূরের কাছে পৌঁছান। চালকের আসনের পাশে কয়েকটি রাইফেল ছিল; পেছনের অংশেও (ডালা) ছিল কয়েকটি। এগুলোর মধ্য থেকে একটি রাইফেল নিয়ে সে মসজিদে প্রবেশ করে। এরপর ঘটে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।

হামলায় নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে গতকাল নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের অনারারি কনসাল শফিকুর রহমান ভুইয়া। গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, নিহত বাংলাদেশিদের একজন হলেন স্থানীয় লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবদুস সামাদ। তাঁর স্ত্রী সানজিদা আকতারও নিহত হয়েছেন। আরেকজনের নাম হোসনে আরা পারভীন (৪৫)। তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের জাঙ্গালহাটা গ্রামের বাসিন্দা।

ড. সামাদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। শফিকুর রহমান ভুইয়া আরো জানান, বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া এক বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন।

আল নূর মসজিদে হামলা হওয়ার কিছুক্ষণ পর লিনউড মসজিদে হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সেখানে মাথায় হেলমেট পরা এক বন্দুকধারী এসে মসজিদে নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করে। মসজিদে তখন শতাধিক মুসল্লি ছিল। সাইয়েদ আহমেদ নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী নিউজিল্যান্ডের একটি সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি অন্তত আটজনকে মারা যেতে দেখেছেন। এদের মধ্যে দুজন তাঁর বন্ধু।

নিউজিল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয় ১৯৪৩ সালে। ওই বছর এক দাঙ্গায় ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ ছাড়া ক্রাইস্টচার্চ সর্বশেষ বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনাম হয় ২০১১ সালে। সে বছর ভূমিকম্পে ১৮০ জনের মৃত্যু হয়।

গতকালের হামলাকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ উল্লেখ করে বলেছেন, এটি দেশের ইতিহাসে ‘কালো দিনগুলোর’ একটি। নিরাপত্তার কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের সব মসজিদে মুসল্লিদের প্রবেশ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা