kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

‘জিন্নাহর বিলীয়মান স্বপ্ন’

আজাদুর রহমান চন্দন   

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘জিন্নাহর বিলীয়মান স্বপ্ন’

‘জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম এগিয়ে চলেছে। মুক্তিকামী মানুষ বিশ্বের সবখানে যাঁরা প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন মুক্তির জন্য, আমাদের সংগ্রাম তাঁদের নিজেদের বলে গণ্য করা উচিত। শক্তির সাহায্যে যারা শাসনের চক্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়সংকল্প ও সংঘবদ্ধ জনশক্তি কেমন করে মুক্তির দুর্জয় দুর্গ গড়ে তোলে, আমাদের জনগণ তা প্রমাণ করেছে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই মন্তব্য দৈনিক পূর্বদেশ প্রকাশ করেছিল ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ এক প্রতিবেদনে। আগের দিন বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘আন্দোলন চলবে ঃ অব্যাহত থাকবে’।

দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদন মতে, ওই বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তির স্পৃহাকে স্তব্ধ করা যাবে না। আমাদের কেউ পরাভূত করতে পারবে না, কারণ প্রয়োজনে আমাদের প্রত্যেকে মরণ বরণ করতে প্রস্তুত।’ একই দিনে পূর্বদেশ আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিবৃতিও প্রকাশ করে। ওই বিবৃতিতে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জনগণের যে আন্দোলন গৌরবোজ্জ্বল দ্বিতীয় সপ্তাহ সমাপ্ত করেছে, তা অব্যাহত তাকবে। গত দুসপ্তাহের মতো হরতাল অব্যাহত থাকবে। সেক্রেটারিয়েট, সমস্ত সরকারী, আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।’

একাত্তরের উত্তাল মার্চের এই দিনে প্রভাবশালী পশ্চিমা সাময়িকী টাইম একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল ‘পাকিস্তান—জিন্নাহর বিলীয়মান স্বপ্ন’ শিরোনামে। পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ ভাঙনের আশঙ্কা নিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে নিবন্ধের শুরুতেই বলা হয়, ‘১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত উপমহাদেশের বিভক্তির পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্ত যখন বইছিল, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর কণ্ঠে তখনই শোনা গেছে এ আশঙ্কার কথা। গত সপ্তাহেও রক্ত ঝরেছে বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল এই দেশটিতে, যার একদিকে আছে পশ্চিমাংশের গম উত্পাদনকারী দীর্ঘদেহী, ফরসা জনসাধারণ; অন্যদিকে পূর্বাংশের খাটো কালো রঙের জনগণ, যাদের প্রধান শস্য ধান। বর্তমানে এই দুই অংশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নতা বা গৃহযুদ্ধের দিকে।’

সত্তরের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়, ‘ডিসেম্বরের ওই নির্বাচনের পর শেখ মুজিব দুইবার পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত দেশের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে যোগ দিতে ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় গেছেন এবং ভুট্টোও এখন সেখানে। তাঁরা শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শেখ মুজিব তাঁদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সংখ্যালঘুরা আর কখনোই সংখ্যাগুরুদের শাসন করতে পারবে না।’ নিবন্ধের শেষাংশে ‘নতজানু হতে বাধ্য’ উপশিরোনামে ইয়াহিয়ার একটি কঠোর হুঁশিয়ারির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘তা সত্ত্বেও সন্দেহ দানা বাঁধছে ইয়াহিয়া খানের সাংবিধানিক পরিষদের অধিবেশন ডাকার সিদ্ধান্ত শেখ মুজিবকে শান্ত করবে কি না। দুই দিন আগে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি তাদের জোটবদ্ধতা ভেঙে দেব এবং তাদের নতজানু করিয়েই ছাড়ব। এই বিবৃতির পর স্বাধীনতার ঘোষণা নিতান্তই ম্লান বলে মনে হবে।’

দৈনিক ইত্তেফাকে ওই দিন প্রধান শিরোনাম ছিল ‘অসহযোগ চলিবে ঃ সর্বসাধারণের প্রতি শেখ মুজিবের নয়া নির্দেশ’। পাঁচ কলাম প্রধান প্রতিবেদনের নিচে তিন কলাম আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘জনগণের সার্বিক স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলিতেছে, চলিবে—শেখ মুজিব’। প্রধান প্রতিবেদনের ডান দিকে ভুট্টোর দেড় কলাম ছবির পাশে দেড় কলাম শিরোনাম ছিল ‘তিনি কি চান—এক পাকিস্তান, দুই অঞ্চলে দুই দলের হাতে ক্ষমতা, আর একটি স্বীকৃত ফর্মুলা’। নিচে চার কলামজুড়ে আরেকটি শিরোনাম ছিল ‘বাঁচাও! বাঁচাও!! বাংলার অসহযোগে পশ্চিমা শিল্পপতিদের নাভিশ্বাস’। প্রথম পাতার নিচ দিকে এক কলাম শিরোনাম ছিল ‘অদ্য প্রেসিডেন্টের ঢাকা আগমন?’।

একই দিনে দৈনিক সংবাদে একটি শিরোনাম ছিল ‘ছাত্র ইউনিয়নের মশাল মিছিল ঃ শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলা কায়েম কর’। দৈনিক পাকিস্তানের একটি শিরোনাম ছিল ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশ’।

অসহযোগ আন্দোলনের এই দিনে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলেও বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি আগের চেয়ে আরো জোরালো হয়ে ওঠে। বাংলার আন্দোলনকারীদের তা বহুগুণ উত্সাহিত করে তোলে। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গ্রাম ও মহল্লায় শুরু হয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন। প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরাও ওই দিন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে কর্মবিরতি পালন করেন। অন্যান্য অফিস-আদালতেও চলে পূর্ণ কর্মবিরতি। এমন এক উত্তাল দিনের বিকেলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রায় সব জেনারেলকে নিয়ে কঠোর সামরিক প্রহরায় ঢাকায় আসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তিনি যখন ঢাকার মাটিতে পা রাখেন তখন সামরিক জান্তার নয়া বিধি জারির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ইয়াহিয়া ঢাকায় অবতরণকালে কোনো সাংবাদিক কিংবা কোনো বাঙালিকে বিমানবন্দরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বিমানবন্দর থেকে ইয়াহিয়া আশ্রয় নেন প্রেসিডেন্ট হাউসে। এই দিন নগরীর মোড়ে মোড়ে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকযোগে গণসংগীত ও পথনাটক পরিবেশন করে উদীচী। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পীরা। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তোপখানা রোডে অনুষ্ঠিত হয় নারী সমাবেশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা