kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

‘আর সময় নাই’

আজাদুর রহমান চন্দন   

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আর সময় নাই’

ঢাকার উত্তাল রাজপথে সেদিন ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী চিত্র। মাঝিমাল্লারা সব বৈঠা হাতে নেমে এসেছিল রাজপথে। সেদিনের রাজপথ ছিল মাঝিমাল্লাদের দখলে। সামরিক আইনের ১১৫ ধারা জারির প্রতিবাদে সেদিন বেসরকারি কর্মচারীরাও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। দেশের জনগণকে গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁর ‘হেলাল-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব বর্জন করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই দিন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার ব্যাপারে শর্তারোপ করেন। তিনি অবশ্য বলেন, ‘যদি প্রেসিডেন্ট দাবি পূরণের ইচ্ছা নিয়ে আলোচনায় বসতে চান, তাহলে আমি বসতে পারি।’ তবে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বৈঠকে কোনোভাবেই তৃতীয় কোনো পক্ষ উপস্থিত থাকতে পারবে না।

উত্তাল সেই দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ। পরের দিন ঢাকার সংবাদপত্রের পাতা ছিল ওই সব ঘটনার বিবরণে ঠাসা। আর ১৪ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক প্রধান শিরোনাম করেছিল আগের রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া একটি বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে। ছয় কলামজুড়ে শিরোনামটি ছিল ‘উস্কানীমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করুন ঃ সামরিক কর্তৃপক্ষের নয়া নির্দেশের জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। পত্রিকাটির প্রথম পাতায় অন্যান্য শিরোনামের মধ্যে ছিল ‘ভুট্টো-কাইয়ুমের দল ছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের সব দলেরই এক কথা—’, ‘অসহযোগের ৬ষ্ঠ দিবস অতিবাহিত’, ‘পিআইএর রিটার্ন টিকিট!’, ‘প্রেসিডেন্ট আসেন নাই—’ ইত্যাদি।

একাত্তরের এই দিনে দৈনিক পাকিস্তান, ইত্তেফাকসহ ঢাকার বিভিন্ন সংবাদপত্রে যৌথ সম্পাদকীয় বেরিয়েছিল ‘আর সময় নাই’ শিরোনামে। এতে বলা হয়, ‘আমরা ঢাকায় সংবাদপত্রসমূহ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আজ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন আসিয়াছে এবং এই মুহূর্তে এক বাক্যে একসুরে কয়েকটি কথা বলা আমাদের অবশ্য কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

তেইশ বছরের ইতিহাসে জাতি আজ চরমতম সঙ্কটে নিপতিত। দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক জীবন পদ্ধতি কায়েমের আশায় সমগ্র দেশ জীবনের সর্বপ্রথম সাধারণ নির্বাচনে শরীক হওয়ার পর দেশের আজ এই অবস্থা। জনগণই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী; দেশের প্রশাসনিক কাঠামো কী হইবে, কী ধরনের সরকারই বা কায়েম হইবে তা নির্ধারণের ক্ষমতার অধিকারী কেবল তাহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই। গণতন্ত্রে যদি বিশ্বাস থাকে তাহা হইলে দেশের আইন-কানুন প্রণয়ন বা রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের প্রতিনিধিদের এই অধিকার কেউ অস্বীকার করিতে পারেন না। এটি একটি যৌক্তিক রাজনৈতিক প্রতিপাদ্যও বটে।

ক্ষমতায় যাঁহারা আজ সমাসীন আর ক্ষমতাসীনদের সহিত কানাকানি করার সুযোগ যাঁহাদের আছে তাঁহাদের ব্যর্থতাই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই অবনতির কারণ। বহিরাক্রমণ হইতে দেশের সীমান্ত রক্ষাই হইল সামরিক বাহিনীর কাজ। রাজনৈতিক বিতর্কে হস্তক্ষেপ বা পক্ষ গ্রহণ করা তাহাদের কোনো দায়িত্বের আওতায় আসে না।

জনগণের সংগ্রাম যাতে অহিংস পথেই পরিচালিত হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁহাদের হস্ত শক্তিশালী করাই আজ প্রয়োজন। দেশের দুই অংশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হইবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব দেশবাসী জনসাধারণ ও তাঁহাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। আমরা মনে করি, আজ সময় আসিয়াছে যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে রাজনৈতিক জীবনের এই বাস্তব সত্যগুলো স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। আমাদের বিচারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উচিৎ দেশের বুক হইতে সামরিক আইন তুলিয়া লইয়া অবিলম্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত একটি মীমাংসায় উপনীত হওয়া যার ফলশ্রুতিতে জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়।’

দৈনিক সংবাদ যেসব শিরোনাম করেছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘মুজিবের দাবির সহিত সম্পূর্ণ একমত ঃ ওয়ালী’, ‘বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন—শ্লোগানের প্রয়োজন নেই ঃ ভাসানী’।

করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায় একটি শিরোনাম ছিল ‘National Assembly Minority Groups Back Awami League's Four-Point [email protected] For Interim Governments At Centre And Provinces’ (আওয়ামী লীগের চার দফা দাবির প্রতি সমর্থন জাতীয় পরিষদে সংখ্যালঘু দলগুলোর—কেন্দ্র ও প্রদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ার আহ্বান)। আগের দিন ১৩ মার্চ লাহোরে জাতীয় পরিষদের সংখ্যালঘু দলগুলোর এক বৈঠকের ভিত্তিতে ১৪ মার্চ প্রতিবেদনটি ছেপেছিল ডন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আজ এখানে অনুষ্ঠিত এক সভায় জাতীয় পরিষদে সংখ্যালঘু দলগুলো নীতিগতভাবে, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবের চার দফা দাবির সঙ্গে একমত হয়েছে এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার আগে কেন্দ্র ও প্রদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ার আহ্বান জানিয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মুফতি মাহমুদ, জমিয়াতুল উলামা-ই-ইসলাম সংসদীয় দলের নেতা। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিল লীগ নেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানা ও সরদার সাউকাত হাইয়াত খান, জমিয়াতুল উলামা-ই-পাকিস্তানের মাওলানা শাহ আহমেদ নূরানি, জামায়াতে ইসলামীর প্রফেসর আব্দুল গফুর, কনভেনশন লীগের জামাল মুহাম্মদ করেজা এবং স্বতন্ত্র এমএনএ মাওলানা জাফর আহাম্মেদ আনসারি ও সর্দার মাওলানা বক্স সুমরু। ন্যাপের ওয়ালী খান সভায় উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু সভার আহ্বায়ক মাওলানা মুফতি মাহমুদ দাবি করেন যে তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি সবার সমর্থন আছে।’

একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ছয় দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। ন্যাপ (ওয়ালী) নেতা খান আবদুল ওয়ালী পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একান্তে আলোচনা করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বাঙালির আন্দোলন ও দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। এই দিনে জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে দাবি জানান। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের এক সমাবেশ থেকে দেশের সাত কোটি মানুষকে সৈনিক হিসেবে সংগ্রামে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা