kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তা ভরা ব্যালট, প্রভোস্ট অপসারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তা ভরা ব্যালট, প্রভোস্ট অপসারণ

কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থীরা গতকাল ছাপ মারা ব্যালট নিয়ে বিক্ষোভ করে। ছবি : শেখ হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রী হলে ডাকসু নির্বাচনে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দেয়। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হলে বাক্সে পাওয়া যায় আগেই সিল (টিকচিহ্ন) মারা অসংখ্য ব্যালট। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীরাও ব্যালট বাক্স তল্লাশির দাবিতে বিক্ষোভে নামে। তাদের ভাষ্য, চাপের মুখে তিনটি ব্যালট বাক্স দেখানো হলেও বাকি দুটি দেখানো হয় অনেক দেরিতে। একই রকম পরিস্থিতিতে বেগম রোকেয়া হলেও দুই দফা ভোট স্থগিত করা হয়। কুয়েত মৈত্রীর ছাত্রীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের প্যানেলকে জেতাতেই রাতের যেকোনো সময় ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। উদ্ধার করা ব্যালটে শুধু হল সংসদের প্যানেলে ভোট দেওয়া ছিল। কেন্দ্রীয় সংসদের ব্যালট উদ্ধার বা পাওয়া যায়নি।

কুয়েত মৈত্রী হলে সকালেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দাবি জানান, ভোট শুরুর আগে সবার সামনে অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্স খুলে দেখাতে হবে। হল প্রাধ্যক্ষ বাক্স খুলতে রাজি হননি। দীর্ঘ সময় তর্কবিতর্কের পর প্রক্টরের উপস্থিতিতে ব্যালট খুলতে রাজি হন তিনি এবং প্রক্টর না আসা পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে বলেন। প্রক্টর আসার পর ব্যালট বক্স যখন খুলে দেখানো হচ্ছিল, কিছু শিক্ষার্থী সন্দেহবশত আশপাশে তল্লাশি চালায়। হল অডিটরিয়ামের পাশে পাঠকক্ষ তখন বন্ধ ছিল। তারা জোর করে কক্ষ খুলে দেখে একটি বস্তায় সিল মারা অসংখ্য ব্যালট।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুয়েত মৈত্রী হলে গিয়ে দেখা যায়, হলের ভারপ্রাপ্ত প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহান, প্রক্টর গোলাম রাব্বানী ও উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ সামাদকে হলে অবরুদ্ধ রেখে বাইরে বিক্ষোভ করছে ছাত্রীরা। ছাত্রীদের প্রত্যেকের হাতেই সিল মারা ব্যালট। বিক্ষোভকারীরা এসব ব্যালট উঁচিয়ে ধরে প্রশাসনের প্রতি কটূক্তি করছিল এবং হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের  দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলেও ছাত্রলীগের তেমন কাউকে দেখা যায়নি। এমনকি হল শাখা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

হলের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী নুরুন্নাহার পলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যালট বাক্স অস্বচ্ছ বিধায় আমরা সবাই প্রকাশ্যে বাক্স দেখতে চেয়েছিলাম। হল প্রশাসন গড়িমসি করলে শঙ্কা ঘনীভূত হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর ফাঁকা বাক্স দেখানো হয়। কিন্তু পাশেই পাঠকক্ষে গিয়ে বস্তাভর্তি ব্যালট পেপার পাওয়া যায়। এমন নির্বাচন হবে, আশা করিনি।’

ছাত্রীদের বিক্ষোভ ক্রমেই প্রবল হতে থাকলে প্রধান রিটার্নিং অফিসার এস এম মাহফুজুর রহমান হল প্রশাসনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকের পর সকাল পৌনে ১১টার দিকে তিনি জানান, হল প্রাধ্যক্ষকে অপসারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাহবুবা নাসরিনকে প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এরপর সকাল ১১টা ১০ মিনিটে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটার থাকা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করে প্রশাসন।

নতুন প্রাধ্যক্ষ মাহবুবা নাসরিন তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় আমরা দুঃখিত। আমরা এমনটা চাইনি। এখন নতুন করে ভোট গ্রহণ করা হবে। সবার সামনেই ফাঁকা ব্যালট বাক্সে ভোট গ্রহণ করা হবে।’

হলের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শিরিন সুলতানা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় রাতে আঁধারে ভোট কারচুপি কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু একটি বিশেষ প্যানেল জোর করে জিততে এমন ঘৃণ্য কাজটি করেছে। আশা করি, হলের মেয়েরা তার জবাব দেবে।’

রোকেয়া হল :  সকাল ৮টার বদলে ভোটগ্রহণ ৯টায় শুরু হয়। দ্বিতীয় দফায় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে আবার ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। এরপর বিকেল ৩টায় নতুন করে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানায়, এই হলে ৯টি ব্যালট বাক্স আসার কথা থাকলেও প্রার্থীরা ছয়টি বাক্স দেখতে পায়। তল্লাশির দাবি উঠলে হট্টগোলে এক ঘণ্টা দেরিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা ভোটগ্রহণ কক্ষের পেছনে আরেকটি কক্ষে ব্যালট পেপার বোঝাই ট্রাংক পেলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। হলের রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ফারহানা ফেরদৌসী বলেন, ‘ভোটগ্রহণ কক্ষের পেছনে আমরা একটি কন্ট্রোল রুম করেছিলাম। সেখানে একটি ট্রাংকে ব্যালট পেপার রাখা ছিল। তবে তাতে কোনো সিল মারা ছিল না। ছাত্রীরা দুই হাজার ৬০৭টি ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ফলে আমরা ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছি। পরে অন্যান্য হল থেকে ব্যালট পেপার জোগাড় করে ভোটগ্রহণ শুরু করি।’

তবে হল সংসদের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াছমীন আক্তার বলেন, ‘ভোটগ্রহণ শুরুর পরে ওই ঘরে ব্যালট বাক্সগুলো ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে আমরা কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করি। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার আমাদের বারবার বলেন, প্রক্টরিয়াল টিম এলে তাদের সামনে ব্যালট বাক্স খোলা হবে। কিন্তু এরপর আর খোলেননি।’

এই পরিস্থিতির মধ্যে ডাকসুর ভিপি পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী রোকেয়া হলে গেলে শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এ সময় কোটা আন্দোলনকারীদের ভিপি প্রার্থী নূরুল হক নূরও খবর পেয়ে সেখানে যান। তখন তাঁর ওপর হামলা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়। পরে নূর জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

সুফিয়া কামাল হল : সকাল পৌনে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায় কয়েকজন শিক্ষার্থী স্লোগান দিচ্ছে। হলের ১ নম্বর গেট দিয়ে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়ার কথা থাকলেও শুরুতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পরে ১১টার দিকে ঢুকতে দেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ভোটগ্রহণ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে।

আবাসিক শিক্ষার্থী তাবাস্সুম বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তবে খুবই ধীরগতিতে লাইন এগোচ্ছিল। ১০টার পরে ভোটাররা কুয়েত মৈত্রী হলে ব্যালটের বস্তা পাওয়ার খবর এলে কয়েকজন প্রার্থী মিলে প্রাধ্যক্ষ ম্যাডামের কাছে ব্যালট বাক্স দেখতে চাই। এ সময় তিনটি বাক্স দেখতে দেওয়া হলেও বাকি দুটি দেখতে দেওয়া না হলে বিক্ষোভের শুরু হয়। এর জন্য প্রায় ৪০ মিনিটের মতো ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়।’

প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য সমর্থিত জিএস পদপ্রার্থী সদীপ্তা মণ্ডল বলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হলে সিল মারা ব্যালটের বস্তার খবর পাওয়ায় আমরা ব্যালট দেখতে চাই। প্রার্থী হিসেবে ভেতরকার পরিস্থিতি আমাদের দেখার সুযোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রথমে সে সুযোগ কর্তৃপক্ষ দেয়নি। পরে দিয়েছে, তখন আমরা কিছু পাইনি।’

ছাত্রলীগের প্যানেল সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহসভাপতি প্রার্থী ইসরাত জাহান নূর ইভা বলেন, ‘কয়েকজন প্রার্থী কারচুপির অভিযোগ করেছিল। পরে তাদের সব দেখার সুযোগ দিলে কিছুই বের করে দিতে পারেনি। আমরা শান্তিপূর্ণ ভোট চেয়েছি, তাই হয়েছে।’

ব্যালট বাক্স দেখতে গিয়েছিলেন, এমন আরো একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘শুরুতে আমাদের যেতে দেওয়া হয়নি। এখন দিয়ে কী লাভ। যদি কিছু হয়েও থাকে, তবে আগে সরিয়ে ফেলেছে।’

ঘটনার বিষয়ে হলের প্রভোস্ট সাবিতা রিজওয়ানী রহমান বলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হলে কী হয়েছে তার সঙ্গে এই কেন্দ্র মিলিয়ে কোনো লাভ নেই। তার পরও প্রার্থীদের দাবিতে আমরা কয়েকজনকে পাঠিয়েছি। তারা কিছুই পায়নি।’

শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলেছে, প্রশাসনের ভুলের কারণেও অনেকে ভোট দিতে পারেনি। আর অন্যান্য অব্যবস্থাপনা তো আছেই। মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জোহরা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি ভোট দিতে গেলে ৬ নম্বর টেবিল থেকে জানানো হয়, ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তারপর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড রেখে দেওয়া হয়। পরে প্রাধ্যক্ষ ম্যাডাম ও কয়েকজন সাংবাদিকসহ গেলে তারা বলে, আমার ছবি ও নামের মিল নেই। তাই ভোট দিতে দেয়নি। আমার প্রশ্ন? দুইবার দুই কথা কেন? আর ভুল সেটা কার দোষ? আমার, না যারা নির্বাচনের কাজ করেছে তাদের?’

ডাকসু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে রোকেয়া হলে নাটক হয়েছে দাবি করে পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে ছাত্রলীগ। বাম সংগঠনগুলোর প্যানেলের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী, কোটা আন্দোলনকারী প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নূরুল হক নূর ও জিএস প্রার্থী রাশেদ খানকে মামলায় আসামি করা হবে বলে ছাত্রলীগ নেতারা জানিয়েছেন। এমনকি তাঁদের ছাত্রত্ব বাতিলেরও দাবি তুলেছে ছাত্রলীগ। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘তারা ছিল ৪০ জন, আমরা ছিলাম ২ জন। তারা খালি ব্যালট পেপার নিয়ে এসেছে, যাতে সিল ছিল না। যখন নূর ধরা খেয়েছে তখন অভিনয় করে ফিট হয়ে পড়ে গেল, এটা নাটক।’

 

মন্তব্য