kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেয়ে দোষারোপচেষ্টা প্রকট

শ্রীলঙ্কায় হামলা

মেহেদী হাসান   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেয়ে দোষারোপচেষ্টা প্রকট

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলায় নাতি হারানো দুই ভাই-বোন। ব্রুনেই সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুফাতো ভাই শেখ সেলিমকে জড়িয়ে ধরে জায়ানের মৃত্যুতে সান্ত্বনা দেন। ছবি : ফোকাস বাংলা

শ্রীলঙ্কার হামলাকে শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই উপসংহার টানল শ্রীলঙ্কা সরকার। দুই সপ্তাহ আগেই হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও যে সরকার তা ঠেকানোর উদ্যোগ নিল না সেই সরকারের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজেবর্ধনে গতকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্টে বলেছেন, ‘প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চে মুসলমানদের ওপর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে শ্রীলঙ্কায় হামলা হয়েছে।’

গত রবিবার শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই এর দায় মুসলমানদের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলে।  হামলার কিছু সময় পরই টুইট বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ইসলামোফোবিয়াবিরোধী কর্মী ও কলামিস্ট সি জে ওয়েরলেমেন বলেছিলেন, ‘ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো শ্রীলঙ্কায় হামলার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা শুরু করেছে। অথচ শ্রীলঙ্কার সরকার বা গণমাধ্যম—কেউই এখনো সন্দেহভাজন একজনের নামও বলেনি।’ পরদিন সোমবার নিজের ভেরিফায়েড টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে তিনি আবার লেখেন, ‘কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন একজনকেও চিহ্নিত করার আগেই মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার দায় চাপানো হয়েছে। একজন মুসলমান জড়িত থাকলেই সব সন্ত্রাসী হামলার সম্মিলিত দায় মুসলমানদের ওপর পড়ে! এমনকি মুসলমানরা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলেও তার দায় মুসলমানদের ওপর চাপানো হয়।’

শ্রীলঙ্কা সরকার গত সোমবার বলেছিল, ইস্টার সানডেতে হামলার জন্য স্থানীয়ভাবে অচেনা জঙ্গিগোষ্ঠী ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) দায়ী বলে তারা মনে করছে। তাদের পেছনে আন্তর্জাতিক চক্র দায়ী বলেও শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষের ধারণা। এরই মধ্যে এনটিজের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন মহল থেকে। গত সোমবার সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ খবর দেয়, নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ হিসেবে নাকি শ্রীলঙ্কায় হামলা করা হয়েছে। আর ওই হামলার পর আইএস উল্লাস প্রকাশ করেছে! তখনো আইএস হামলার দায় স্বীকার করেনি।

শ্রীলঙ্কায় তিন শতাধিক মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ইস্টার সানডের হামলার তিন দিন পর গতকাল দায় স্বীকার করেছে আইএস। আইএসের মুখপাত্র আমাক থেকে হামলার দায় স্বীকার করা হয়। তবে ওই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি আইএস। তাদের দাবি, রবিবারের হামলাকারীরা ছিল আইএসের যোদ্ধা। তবে হামলাকারীরা যে আইএসের প্রতি অনুগত সে বিষয়ে তারা কোনো ছবি বা ভিডিও দেয়নি।

কলম্বোতে বিবিসির সংবাদদাতা আনবারাসান এথিরাজন তাঁর বিশ্লেষণে বলেন, আইএসের এই দাবি সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ সাধারণত যেকোনো হামলার পরপরই দাবি করে থাকে আইএস। যারা হামলা চালায়, তাদের মিডিয়া পোর্টাল ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে, যা এ ঘটনায় হয়নি।

শ্রীলঙ্কা সরকার গত রবিবারের হামলার পেছনে এনটিজের সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশের অন্যতম বড় কারণ হলো হামলার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য। সেখানে এনটিজের হামলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এনটিজে নিজেই হামলা চালিয়েছে নাকি এনটিজের নাম ব্যবহার করে বাইরের কোনো শক্তি হামলা চালিয়েছে কিংবা বাইরের কেউ এনটিজেকে দিয়ে হামলা করিয়েছে সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

তবে এসব নিশ্চিত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত সোমবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে হামলার জন্য ‘কট্টর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘কট্টর ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধ করছে।

এনটিজে গত রবিবারের হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে কিছু গণমাধ্যম প্রচার করলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসের প্রথমার্ধেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের গোয়েন্দারা শ্রীলঙ্কাকে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। গত রবিবারের হামলায় ওই দুই দেশের নাগরিকরাও হতাহত হয়েছে। এমনকি হামলার আগাম তথ্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ তাদের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকেও জানতে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীলঙ্কায় আবারও হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ভারতও শ্রীলঙ্কাকে নতুন করে এমন তথ্য জানিয়েছে বলে গতকাল হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় গত সোমবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ওই হামলাকে পশ্চিমা বিশ্বের কট্টরপন্থী খ্রিস্টানরা তাদের ওপর হামলা হিসেবে দেখছে। ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালি পার্টির সভাপতি ম্যারি লে পেন গত সোমবার এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, শ্রীলঙ্কায় গত রবিবারের হামলায় নিহতরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই আক্রান্ত হয়েছে।

জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলাকে ‘খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অথচ ওই হামলায় নিরপরাধ মুসলমানরাও হতাহত হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রীলঙ্কার হামলার এত তাড়াতাড়ি সমাধানে পৌঁছা ঠিক হবে না। এ জন্য স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। ওই হামলার ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ আরো অনেক প্রেক্ষাপট থাকতে পারে।

মন্তব্য