kalerkantho

২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন আজ

শঙ্কা থেকে উত্তেজনা

শরীফুল আলম সুমন, রফিকুল ইসলাম ও হাসান মেহেদী   

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শঙ্কা থেকে উত্তেজনা

নানা শঙ্কা নিয়েই এগোচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া। কিন্তু স্টিলের অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্সকে কেন্দ্র করে শঙ্কা উত্তেজনায় রূপ নিল ভোটের আগের দিন। নানা অশঙ্কা ও সন্দেহ ঘিরেই গতকাল রবিবার ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল ছাড়া সব সংগঠনের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একাট্টা হন। গতকাল বিকেলে তাঁরা উপাচার্যের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরে কিছু সময়ের জন্য উত্তপ্ত করে তোলেন রেজিস্ট্রার ভবন প্রাঙ্গণ। কিন্তু উপাচার্যের কাছ থেকে কোনো আশার বাণী না পেয়ে ভোটের মাঠেই জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ওই প্রার্থীরা।

গতকাল সাত দফা দাবিতে একাত্ম হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল, বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোটসহ অন্যরা। তাদের পক্ষ থেকে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। সাতটি দাবির মধ্যে আছে সবার ভোটগ্রহণের বাস্তব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে সময় আরো চার ঘণ্টা বাড়ানো, নির্বাচনকেন্দ্রিক শঙ্কা দূর করতে বুথ ছাড়া সব জায়গায় মিডিয়ার প্রবেশ নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের যেতে যারা নিরুত্সাহ করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগের অনুমতি প্রদান,

নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের নিরাপত্তা বিধানের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রতিটি কেন্দ্রে সকালে ব্যালট পেপার নেওয়া, ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে প্রতিটি রুটে অন্তত ১০টি বাস রাখা।

সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের প্রার্থী লিটন নন্দী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন করছে প্রশাসন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে প্রশাসনকে আমরা ছেড়ে কথা বলব না। গঠনতন্ত্রে পোলিং এজেন্টের কথা রয়েছে। কিন্তু তা রাখা হচ্ছে না। আমরা এখনো মনে করি, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এ ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।’

একই পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্রার্থী নুরুল হক নূর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের অনেক দাবিই মানেনি। তবে আমরা চাই, ৩০ ডিসেম্বরের মতো কোনো কলঙ্কিত নির্বাচন যাতে না হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে আমরা একতাবদ্ধ। যদি নির্বাচনে কোনো কারচুপির ঘটনা ঘটে তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’

সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ আর এম আসিফুর রহমান বলেন, ‘ভোটারদের মধ্যে ভয়-সংশয় এখনো কাটেনি। সাত দফা দাবিতে আমরা যারা একাত্ম হয়েছি, তারা সবাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষের শক্তি। তাই ভোটারদের বলব, আপনারা ভোট প্রদানের মাধ্যমেই প্রশাসনকে উপযুক্ত জবাব দেবেন।’

এদিকে গতকাল নির্বাচনী প্রচার বন্ধ থাকলেও সব প্রার্থীর উপস্থিতি দেখা গেছে ক্যাম্পাসে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রার্থী ও তাঁদের পক্ষের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট চেয়েছে অনানুষ্ঠানিকভাবে।

তবে ভোট সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে গতকাল ভোটারদের আরো বেশি সন্দিহান দেখা গেছে। অনেক ভোটারই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভোটারদের প্রধান শঙ্কা হলো, অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে গিয়ে ঠিকমতো ভোট দিতে পারবে কি না তা নিয়ে। এ ছাড়া দুপুর ২টার মধ্যে সব ভোটারের পক্ষে ভোট দিতে পারাও দুরূহ বলে মনে করে তারা। তাদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে একেক বিভাগের একেক শিক্ষার্থীর ক্লাস একেক সময়ে থাকায় সব শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট সময়ে একই বাসে ক্যাম্পাসে পৌঁছতে হয় না। কিন্তু আগের মতো বাস চললেও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের দুপুর ২টার মধ্যে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া কঠিন। এ ছাড়া আবাসিক হলের যেসব শিক্ষার্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়, তারাও ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় আছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রথম বর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী গৌরব অধিকারীর বাসা কল্যাণপুর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাসেই তো যাতায়াত করি। যদি বাস ঠিক সময়ে আসে তাহলে অবশ্যই আসব ও ভোট দেব। কিন্তু আমার ভোট জগন্নাথ হলে। ওখানের সব কিছু আমি ঠিকমতো চিনিই না। আবার যদি ঝামেলা বাধে! এসব নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।’

সমাজবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ভাগ্যবান যে ভোট দিতে পারব। তবে যেসব কথা শুনছি তাতে সুষ্ঠু ভোট হবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছি। আর যে হলে ভোট হবে সেই হলে গণনা হলেও একটা স্বচ্ছতা থাকত। কিন্তু সেটা না হলে একটা সমস্যা তো থেকেই যায়।’

নাম প্রকাশ না করে শামসুন্নাহার হলের একজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ওপর প্রেসার আছে ছাত্রলীগকে ভোট দেওয়ার জন্য। আমরাও বলছি দেব। নেত্রীরা এখন ভালো ব্যবহারই করছে। তবে কাল যে কী হয় সেই চিন্তাই করছি।’

প্রার্থীদের মধ্যেও আছে নানা শঙ্কা। তাঁরা বলছেন, আগের রাতেই যদি স্টিলের ব্যালট বাক্স আর ব্যালট পেপার চলে যায়, তাহলে একটা শঙ্কা থেকেই যায়। কারণ যেখানে ভোট হবে, সেই হলগুলো বলতে গেলে ছাত্রলীগের দখলেই আছে। আর পোলিং এজেন্টই যদি না থাকে তাহলে কিভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন? গণমাধ্যমের অবাধ বিচরণে বিধিনিষেধকেও সুষ্ঠু ভোটের বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

তবে এজিএস পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর আমাদের আস্থা আছে। তবে একটা চক্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করব। ছাত্রলীগের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা রয়েছে। আশা করি, ১১ মার্চ ছাত্রলীগ পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হবে।’

এদিকে গতকাল সকাল থেকে দুটি বিষয় জোরেশোরে আলোচিত হয়। ছাত্রশিবির কোটা সংস্কারপন্থীদের প্রতি সমর্থন দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। তবে কোটা সংস্কারপন্থীদের এক নেতা বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ গুজব। মূলত শিবিরকে জড়িয়ে আমাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

এ ছাড়া হল সংসদ নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে থাকা ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী’ কয়েকজন প্রার্থী শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ালেও অন্যদের বিষয়েও একই রকম প্রচার চালানো হয়। সরে দাঁড়ানোর ওই প্রচার সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন অনেক প্রার্থী। 

তবে ডাকসুর ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রলীগ নেতা এ ডি এম কোরেশি এবং জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা সেলায়মান ইসলাম মুন্না সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে স্যার এফ রহমান হলে স্বতন্ত্র এজিএস পদপ্রার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা শাহ পরানের সরে দাঁড়ানোর কথা প্রচার করা হলেও তিনি কোনো ঘোষণা দেননি। জহুরুল হক হলে জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা তৌফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি গরিব পরিবারের সন্তান। আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছা আমি নির্বাচন করি। এ জন্য আমার বাবা ধার করে আমাকে টাকা দিয়েছেন। বাবা-মায়ের প্রতি আমার আবেগ সংগঠনের চেয়েও বেশি। জয়-পরাজয় বড় ব্যাপার নয়। আমি আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে চাই।’

ডাকসু নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক আবদুল বাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে। হল কর্তৃপক্ষেরও কিছু কাজ আছে। এ জন্য তাদের সময় দিতে হবে। তাই ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স রাতেই পাঠানো হচ্ছে।’ অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, সিনেট কমিটি, সিন্ডিকেট, রেজিস্ট্রার গ্র্যাজুয়েট নির্বাচনে এই ব্যালট বাক্সগুলোই ব্যবহার করা হয়। এখন পর্যন্ত তো কেউ প্রশ্ন তোলেনি। আশা করছি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা উপহার দিতে পারব।’

মন্তব্য