kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

ব্রিটিশ আদালতের ৫৫ রায় পর্যালোচনা

ব্রিটেনে আশ্রয় পেতে রাজনৈতিক চাতুরী

মেহেদী হাসান   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্রিটেনে আশ্রয় পেতে রাজনৈতিক চাতুরী

অনুমোদিত মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করার সন্দেহে এবং চুরির দায়ে এক বাংলাদেশিকে ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করেছিল যুক্তরাজ্য পুলিশ। এর পর থেকে তাঁর নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই গ্রেপ্তারের তিন বছরেরও বেশি সময় পর ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল হঠাৎ তিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী ঘোষণা করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চেয়ে বসেন। আবেদনে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে তিনি বিএনপি করতেন। সিলেট অঞ্চলের একটি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতিও ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। হুমকির মুখে এ দেশে তাঁর পরিবারও ঘরছাড়া। দেশে ফিরলে তাঁর জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর ওই ব্যক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি অভিবাসনসংক্রান্ত উচ্চ আদালতেও আবেদন করেছিলেন। সেখানেও তা খারিজ হয়েছে। যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য তাঁর মতো অর্ধশতাধিক বাংলাদেশির আবেদনের বিষয়ে আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য কিছু ব্যক্তি নিজেদের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, বিশেষ করে বিএনপির কর্মী এবং বাংলাদেশে ফেরা তাদের জন্য বিপজ্জনক বলে দাবি করছে।

বেশির ভাগ মামলার রায় হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। কিছু মামলা নতুন করে শুনানির জন্য অন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশে কারাগার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নাজুক থাকার অজুহাত দেখিয়েও অনেকে ফেরত না পাঠানোর আবেদন করেন।

এই প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা ব্যক্তির মামলাটি এতই স্পর্শকাতর যে আদালতের নির্দেশে মামলার নথিতে তাঁর নাম, এমনকি ছদ্মনাম বা নামের আদ্যক্ষরও উহ্য রাখা হয়েছে। আশ্রয়ের জন্য গত বছরের ২৬ জুন যুক্তরাজ্যের উচ্চতর ট্রাইব্যুনালে (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম চেম্বার) শুনানিতে অংশ নেওয়া আবেদনকারীর জন্ম ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে। ১৮ বছর বয়সে তিনি ভিজিটর (দর্শনার্থী) ভিসায় ব্রিটেনে গিয়েছিলেন। তাঁর ভিসার মেয়াদ ছিল ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আশ্রয়ের আবেদনে তিনি নিজেকে বিএনপির একজন সদস্য বলে দাবি করেন। তাঁর আরো দাবি, ২০১০ সালে তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন এবং ক্রমেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা কমেছে। তবে বাংলাদেশে তাঁর পরিবার বিএনপিতে সক্রিয়।

ওই আবেদনকারী তাঁর আবেদনে জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ সদস্যরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। তাঁর খোঁজে তাঁর পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে তাঁর ভাইয়েরা আত্মগোপনে চলে গেছে। বোনের পড়ালেখাও বন্ধ। আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করেছিল বলে দাবি করে ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চান।

তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাঁর আবেদনে উত্থাপিত যুক্তিগুলো অসংগতিপূর্ণ বলে খারিজ করে দেয়। ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব কী ছিল, সে বিষয়েও গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারেননি তিনি। গত সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চতর ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট জাস্টিন লেইন ওই ব্যক্তির দেওয়া অনেক তথ্য ও যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন রায়ে। ওই ব্যক্তির পক্ষে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি চিঠি দিয়ে তাঁকে যুক্তরাজ্যে তাঁর দলের সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করেছিলেন। অথচ আবেদনকারীই আদালতকে বলেছেন যে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর নানা কারণে তিনি বিএনপিতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। বিচারক এ সম্পর্কে লিখেছেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি যদি ওই আবেদনকারী সম্পর্কে সত্যিই জানতেন বা কখনো সরাসরি দেখা করতেন, তবে তিনি বুঝতে পারতেন যে ওই ব্যক্তি কোনোদিন বিএনপি করেননি।

আরো বড় জালিয়াতি ধরা পড়ে সিলেটে দায়ের করা কথিত মামলা নিয়ে। আশ্রয়ের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তি যে তারিখ ও মামলার তথ্য দিয়েছেন, এ দেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা থানায় গিয়ে এর সত্যতা পাননি। আবেদনকারী এ বিষয়ে দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে এমনটি হয়। মামলার আসল তথ্য লুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ওই মামলার তথ্য জানাতে পুলিশ যেভাবে ব্রিটিশ হাইকমিশন কর্মকর্তাদের সহায়তা করেছে, তাতেও ওই আবেদনকারীর যুক্তি টেকেনি।

আরেকটি মামলার রায়ে দেখা যায়, ইংরেজিতে ‘এস এইচ’ আদ্যক্ষরের এক বাংলাদেশি ১৯৯৮ সালে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে আশ্রয় চেয়েছিলেন। তাঁরও দাবি, তিনি বিএনপি করতেন এবং এ কারণেই আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দেয়। এক মামলায় তাঁর সাত বছরের সাজাও হয়েছে। দেশে ফিরলে তিনি হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হবেন বলে তাঁর আশঙ্কা।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। এর বিরুদ্ধে ‘এস এইচ’ যখন (২০০৪ সালে) যুক্তরাজ্যের অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন, তত দিনে বাংলাদেশে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। এর পরও ফেরার আগ্রহ না দেখিয়ে বরং এ দেশের কারাগারে নির্যাতন হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় চান তিনি। ব্রিটিশ ট্রাইব্যুনালে ‘এস এইচ বনাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ মামলায় বাংলাদেশের কারাগার পরিস্থিতি এবং ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘এস এইচ’ তাঁকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেননি। এ কারণে মানবাধিকারের অজুহাতে তিনি আশ্রয় পেতে পারেন না।

২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের উচ্চতর আদালত (অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনাল) শামসুল হক নামের এক বাংলাদেশির আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনিও নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করে উল্লেখ করেছিলেন, দেশে ফিরলে রাজনৈতিক কারণে তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। তবে আদালত রায়ে বলেছেন, মানবিক কারণে আশ্রয়ের জন্য শামসুল হকের যুক্তিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৩ সালের ৫ জুলাই যুক্তরাজ্যের উচ্চতর আদালতের (অ্যাসাইলাম অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনাল) আরেক রায়ে আবদুল হান্নান নামের এক বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন খারিজ হয়। তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, তিনি একটি হত্যা মামলার সাক্ষী। এ কারণে আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাঁকে হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশে ফেরা তাঁর জন্য বিপজ্জনক। তবে আদালত রায়ে বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরলে জীবন হুমকিতে পড়ার দাবি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আবদুল হান্নান।

গত ৫ নভেম্বর এক রায়ে বিএনপির কর্মী বলে দাবি করা ‘এস এ’ নামের (আদ্যক্ষর) এক ব্যক্তির যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তিনিও দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ফিরলে তাঁর জীবন বিপন্ন হবে। যুক্তরাজ্যের আদালত ওই দাবি গ্রহণ করেননি।

মন্তব্য