kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

‘আর দেরী নয়’

আজাদুর রহমান চন্দন   

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আর দেরী নয়’

‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরাট পরিবর্তন আসিয়াছে, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাইয়াছে বহুগুণে, স্বচ্ছতা আসিয়াছে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। গত ১লা মার্চ হইতে ৭ই মার্চের মধ্যে আন্দোলনের মধ্য দিয়া পূর্ব বাংলার জনগণ যে চেতনার অধিকারী হইয়াছে সে চেতনাকে মুছিয়া ফেলা সম্ভব নয়। জনসাধারণের দাবী-দাওয়া পূরণের মাধ্যমেই কেবল বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব।’ এই মন্তব্য করেছিল ১০ মার্চ ১৯৭১ তারিখে দৈনিক পাকিস্তান তার সম্পাদকীয়তে।

‘আর দেরী নয়’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয় কলামে আরো বলা হয়েছিল, ‘গত এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ব বাংলার বুকে প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মধ্যে দিয়া যেসব শিক্ষা উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে সেগুলি হইল ঃ (এক) বল প্রয়োগ করিয়া জনগণকে দমান যাইবে না, (দুই) জনপ্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে হইবে, (তিন) ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে, এবং (চার) জনসমর্থিত ছয় ও এগার দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পথ বাধামুক্ত করিতে হইবে।’

একই দিনে দ্য পিপলের সম্পদকীয় শিরোনাম ছিল ‘Bhutto Responsible for Spilling Bengalese’s Blood’ (বাঙালির

রক্ত ঝরানোর জন্য ভুট্টো দায়ী)। এতে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে তাদের জীবন গড়তে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সর্বসম্মত রায়ের পর লারকানা ও ইসলামাবাদে বাতাস কোন দিকে বইছিল তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। দরকার হলে বন্দুকের নলের মাধ্যমে বাঙালির রক্ত চোষার ও সম্পদ লোটার সেই পুরনো ষড়যন্ত্রে আইউবমনা আমলারা যে ভুট্টোর চারপাশে সক্রিয়, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। প্রকৃতপক্ষে, নির্বাচনের পরপরই প্রেসিডেন্টের লারকানায় যাত্রা, লারকানার সামন্ত প্রভুর আপ্যায়নে, তার অভিযান নিয়ে অন্যদের মধ্যে আলাদাভাবে অনেক এবং সত্যিকার সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। আশা ছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া স্বৈরশাসক আইয়ুবের ‘নষ্ট সন্তানের’ মন গলাতে পারবেন এবং নির্বাচনের পর দেশের উদ্ভূত অবস্থা তাঁকে মেনে নিতে বাধ্য করাবেন, যা দৃশ্যত ছয় দফা বিষয়ে, পশ্চিম পাকিস্তানের কৌশলকে ভেস্তে দিয়েছে। সত্ভাবে এটা স্বীকার করতে হবে যে শেখ মুজিব ছয় দফার ওপর গণভোট ঘোষণা করেছেন, এটা সজ্ঞানে জেনেই ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও অন্য দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সেখানে কোনো সময়েই কোনো মহল থেকে কোনো প্রতিবাদ ছিল না, সারা দেশে নির্বাচনে অনেক স্বচ্ছভাবে ভোট হয়েছিল, যা কি না ইন্দো-পাক উপমহাদেশে এক বিরল উদাহরণ। কিন্তু নির্বাচনের পর ছয় দফার বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে পিপিপির পক্ষ থেকে শুধু হৈচৈ আর চিৎকারই করা হয়নি, বাংলাদেশের মানুষকেও কঠিনতম পরীক্ষায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, প্রদেশে রক্ত ঝরানো হয়েছিল। কী লজ্জা! কী বিশ্বাসঘাতকতা!

সম্পাদকীয়তে বলা হয়, এসব কিছু ঘটেছে কারণ, প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অবশ্যই রক্তচোষা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে। সুতরাং বিধিসম্মত প্রতিশ্রুতি, ১৯৬৯ সাল থেকে জনগণকে দেওয়া রাষ্ট্রপ্রধানের অঙ্গীকারে পবিত্রতার অভাব পাওয়া গেল। এটা স্পষ্টতই লারকানার সুবিধাবাদীদের পরিচালিত সংখ্যালঘুদের গ্রুপ ক্লিক স্পেয়ারকে খুশি করানোর প্রেসিডেন্টের উদ্যোগের কারণে। প্রকৃতপক্ষে, ভুট্টোর নিজস্ব স্বীকৃতি অনুযায়ী, তিনি অ্যাংলো-স্যাক্সন হতে পারেন যখন তিনি বিপ্লবী হতে চান, যখন তিনি এটার জন্য ভালো সুযোগ খুঁজে পান এবং অবশ্যই আইয়ুবের শাসনের ইতিহাসে প্রমাণিত হয়েছে যে দরকার হলে তিনি একনায়কের হাতের পুতুলও হতে পারেন। এতে আরো বলা হয়, এটা স্বীকার করতে হবে, ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত করে সর্বোচ্চ আঘাত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘরে ঘরে ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা : আজ সেই ১০ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সারা দেশে সরকারি ও আধাসরকারি অফিসের কর্মচারীরা দশম দিনের মতো কাজে যোগদানে বিরত ছিলেন। বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও ব্যবসাকেন্দ্র খোলা ছিল। ঘরে ঘরে উড়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা। সরকারি ও বেসরকারি ভবন, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষে ওড়ে কালো পতাকা। এমনকি রাজারবাগ পুলিশ লাইন, থানা ও হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও কলো পতাকা উত্তোলিত হয়।

একাত্তরের এদিন সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ বাসভবনে একদল বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধু ওই সময় বলেন, সাত কোটি বাঙালি আজ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। যেকোনো মূল্যে তারা এই অধিকার আদায়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। তিনি আরো বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাঙালিরা অনেক রক্ত দিয়েছে। এবার আমরা এই রক্ত দেওয়ার পালা শেষ করতে চাই।’

ওই দিন বিকেলে ওয়ালীপন্থী ন্যাপের উদ্যোগে শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলার দাবিতে ঢাকা নিউ মার্কেট এলাকায় পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান করাচিতে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য ১৩ মার্চ ঢাকায় আসবেন।

পুরনো পাকিস্তানের যবনিকা : লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে ওই দিন ডেভিড লোশাক লিখেছিলেন, ‘ইসলামের জন্য নিবেদিত একটি জাতির যে ধারণা জিন্নাহ পোষণ করতেন, অপরিপক্ব রাজনীতিক ও সংকীর্ণমনা জেনারেলদের কারণে সেটি এখন মৃত। ১২ কোটি পাকিস্তানির, বিশেষ করে পূর্ব অংশের শোষিত, নিপীড়িত সাত কোটি বাঙালির ভবিষ্যৎ এখন তাদের অতীতের চেয়েও বেশি অন্ধকার। যে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সেনা শাসনকে পূর্ব অংশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিশাল জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, রক্তপাত ছাড়া সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশটির নেতারা যে সমঝোতাই খোঁজেন না কেন, দুই জাতিকে এক করার পরীক্ষা ভেস্তে গেছে। পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে সহজ সত্য হলো—এটি দুই জাতির, যাদের মধ্যে কোনো সদৃশ স্বার্থ নেই, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নেই, এমনকি যাদের ভাষা ও খাবারেও কোনো মিল নেই; এমনকি ইসলামও তাদের একত্রে রাখতে পারছে না। ইসলাম ঐক্যের শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রমাণ মেলেনি, এখানেও নয়।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “পূর্ব পাকিস্তানের অস্থির মানুষের কাছে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’-এর কম কিছু চাওয়ার নেই। গত রবিবার শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ততটুকু কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন, যতটুকু গেলে তাত্ক্ষণিকভাবে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া এড়ানো যায়। বিচ্ছিন্নতার কোনো চেষ্টা সামরিক বাহিনী খুব নিষ্ঠুরভাবেই দমন করবে, তা হলো রক্তপাত। যদি স্বাধীনতা পায়, বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই উন্মাদনা প্রশমনের আপাতত আর কোনো পথ দৃশ্যমান নয়। দখলদার বাহিনী দিয়ে এক হাজার মাইল দূর থেকে একটি জাতির ওপর কর্তৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত হবে পশ্চিম অংশও। পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ ভারতের সমস্যাসংকুল রাজ্য পশ্চিম বঙ্গেও প্রভাব ফেলছে। মার্ক্সবাদী নেতা জ্যোতি বসুও তাঁর মতো করে ‘ছয় দফা’ দাবি দিয়ে নতুন দিল্লির শাসন থেকে আলাদা হতে চাইছেন। ঢাকায় যে এখন এত চীনা ‘পর্যবেক্ষকের’ ভিড়, তারা তো আর এমনি এমনি আসেনি!”

মন্তব্য