kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক রোহিঙ্গা শিবিরে

মেহেদী হাসান ও তোফায়েল আহমদ উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে ফিরে   

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক রোহিঙ্গা শিবিরে

প্রতিদিন বিকেলে রোহিঙ্গা শিবির থেকে বেরিয়ে আসেন সরকারি কর্মকর্তা ও মানবিক সহায়তা দেওয়া সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা। সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল হওয়া পর্যন্ত বাইরের কেউ সাধারণত ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায় না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাতভর টহল দিলেও শিবিরের নিয়ন্ত্রণ কার্যত থাকে রোহিঙ্গাদের হাতেই। সাড়ে ছয় হাজার একর জমিতে পাহাড়ের ঢালে ঢালে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ঘরগুলোতে তখন নিজ গোষ্ঠীর লোকদের হাতেই নির্যাতন-নিপীড়নের অনেক ঘটনা ঘটে। এ খবর খুব কমই বাইরে আসে।

বালুখালি রোহিঙ্গা শিবিরে লুতফর রহমান নামে এক রোহিঙ্গা জানান, সব রোহিঙ্গা যে ভালো এমন তো নয়। অনেক সময় ঝগড়াঝাঁটি হয়। দা দিয়ে কোপ দেয়। রোহিঙ্গা নারীরা লাঞ্ছিত হয়। তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া, ধর্ষণ, পাচার—এমন অভিযোগও শোনা যায়। কিন্তু সেগুলো আশ্রয়শিবিরের বাইরের কাউকে জানানো নিষেধ। জানালে আরো নিপীড়নের ভয় আছে।

জানা যায়, কুতুপালং দুই নম্বর শিবিরের এক নম্বর ব্লক থেকে গত মাসে এক রোহিঙ্গা কিশোরীকে ভারতে পাচার করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের একটি চক্র ধরা পড়ে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গা শিবিরে ভেতরে সংঘটিত অপরাধের খুব কম তথ্যই তাঁদের পর্যন্ত আসে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর ‘মাঝিরা’ (নেতারাই) অনেক ক্ষেত্রে বিচার-সালিস করে থাকেন। সালিসের নামে টাকার খেলাও চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাখাইন থেকে আসা হিন্দু ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের কয়েকজন কালের কণ্ঠকে জানায়, মিয়ানমারে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল ‘আরসা’। এরা কারা জানতে চাইলে তারা জানায়, মুসলমান রোহিঙ্গাদের উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী। আশ্রয়প্রার্থী সাধারণ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অনেকেও এ দেশে চলে এসেছে বলে তাদের ধারণা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানায়, আশ্রয়ের জন্য যখন দিনে ও রাতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে, তখন যাচাই করা হয়নি তারা কে; তাদের অতীত কর্মকাণ্ডই বা কেমন ছিল। মিয়ানমার তো দাবি করছে যে এই আশ্রয়শিবিরেই এমন অনেক রোহিঙ্গা আছে যারা ওই দেশে হামলার সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমার তাদের ছবিও প্রকাশ করেছিল।

কুতুপালং ও বালুখালি শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ বা নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য অনেকে নিজেদের ‘আরসা’ বা ‘আল-ইয়াকিন’ গ্রুপের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা আবার রোহিঙ্গা তরুণদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে।

গত ১ মার্চ বালুখালি রোহিঙ্গা শিবিরে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সময় জানান, সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা কথিত আরসা বা আল-ইয়াকিন (হরকত আল-ইয়াকিন) গ্রুপের সদস্য বলে দাবি করা ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা ইমামদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে থাকে।

বালুখালি রোহিঙ্গা শিবিরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, কেউ মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী হলে তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করে ওই ব্যক্তিরা। মসজিদের ইমামরা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন বিধায় তাঁদেরও শত্রু হিসেবে গণ্য করে তারা। গত মাসে রোহিঙ্গা অপহরণ ও রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত টেকনাফের নয়াপাড়া আশ্রয়শিবিরের সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা সর্দার নুরুল আলম আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এর পরপরই নুরুল আলমের সহযোগীরা হামিদ নামের এক রোহিঙ্গাকে র‌্যাবের ‘সোর্স’ তকমা দিয়ে হত্যা করে বলে জানা যায়।

গত ২ মার্চ রোহিঙ্গা শিবিরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া এক রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হুমকি দিয়ে এক রোহিঙ্গা তরুণের ভিডিও বার্তা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে।

রোহিঙ্গা শিবিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা পশ্চিমা এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক গত সপ্তাহে ঢাকা সফরকালে কালের কণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হয়ে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে হতাশ। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের হতাশাগ্রস্ত অসহায় জনগোষ্ঠীকে উগ্রবাদে কাজে লাগাতে স্বার্থান্বেষী মহল বা জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে তৎপর হতে দেখা গেছে। এ কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি জরুরি।

তিনি বলেন, কঠোর নজরদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংস উগ্রবাদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আরসা বা বিভিন্ন নামধারী গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের দলে টানতে তৎপর হতে পারে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে বিবদমান বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই তীব্র হতে পারে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ঝুঁকির কথা বলেছেন ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইক্ল্যাডস) নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ। রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে সহিংস উগ্রবাদের বীজ নিহিত আছে। এ বীজটির যদি অঙ্কুরোদগম হতে পারে তবে এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই ঝুঁকিতে পরিণত হবে। সেই ঝুঁকি কমানোর জন্য বিশ্বের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে তাদের বসতবাড়িতে ফেরত পাঠাতে পারলে আমাদের ঝুঁকি কমে। সেটির ওপরই বাংলাদেশ কাজ করছে।’

আবদুর রশিদ বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যত দিন বাংলাদেশের মাটিতে থাকবে তত দিন তাদের ঘিরে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থাকবে। এখন সেই ঝুঁকি রোহিঙ্গা শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসেছে। ক্যাম্পের ভেতর আত্মীয়-স্বজন মিলে তারা প্রায় এক জায়গায় থাকে। তাদের মধ্যে নেতা আছেন, যাঁকে মাঝি নামে ডাকা হয়। তিনিই তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এক মাঝির সঙ্গে আরেক মাঝির দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা, সামাজিক সমস্যা যে নেই তা অস্বীকার করব না। এ ধরনের সংকটে বহুমাত্রিক প্রভাব থাকে। তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থেকে মারামারি অসম্ভব কিছু নয়।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশিদ বলেন, ‘আরসা, আল-ইয়াকিনের কিছু কিছু কর্মীর উপস্থিতি আশ্রয়শিবিরে আছে। তবে খুব প্রবল মাত্রায় নেই। রাখাইনে নৃশংসতার পর তারাও এখানে চলে এসেছে। আমি দেখেছি, তাদের মানুষ (সাধারণ রোহিঙ্গারা) ভয় পায়। তারা মনে করে, ওদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ালে ক্ষতির শিকার হতে হবে।’ তিনি বলেন, ধর্মীয় গোষ্ঠীও সেখানে আছে। আরসা বা আল-ইয়াকিনের কর্মীরা তাদের ধর্মীয় দ্বন্দ্ব এ পারেও এ নিয়ে এসেছে। প্রথম দিকে তারা ৮-১০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করাতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে খবর পৌঁছানোর পরপরই ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ গিয়ে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ করে দেয় এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্ধার করে। এগুলো সংকটের সামাজিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করে আবদুর রশিদ বলেন, ‘এগুলো থাকবে না, এমনটি আমরা বলছি না। আমরা বলছি, ঝুঁকি প্রশমনের একমাত্র উপায় হলো রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা