kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়

সুলতানা কামাল

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়

ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র কী শিক্ষালয়—সর্বত্র নারী নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন আর হয়রানির শিকার হচ্ছে। ১০০ জনের মধ্যে ৮৭ জন নারী কোনো না কোনোভাবে পরিবারের মধ্যেই নির্যাতিত হয়। ধর্ষণ, গণধর্ষণসহ  নারীর প্রতি নানা নির্যাতন বেড়েই চলেছে। এখানেই মানবাধিকারের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। একটি সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ঘটতেই পারে। কিন্তু সেই অপরাধ প্রতিকারে, নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে এবং অপরাধীকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করানোতে রাষ্ট্র কী ভূমিকা রাখছে—সেটাই এখানে বিবেচ্য। নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখানে কত প্রকট!

মানবাধিকারের যে শাখাটি নিয়ে সারা বিশ্বেই তোলপাড় তা হলো—নারী অধিকার। নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। মানবাধিকারের সব বিষয়ই নারী অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নারী অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইন আছে। আছে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ। জাতীয় গণ্ডির ভেতরে প্রায় প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব আইন আছে। সেই আইন কখনো সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত আবার কোথাও বিশেষ আইন দ্বারা স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নারী অধিকার রক্ষায় গৃহীত হয়েছে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ সনদে স্বাক্ষর করে। এটি একটি আন্তর্জাতিক দলিল ও প্রতিশ্রুতি। এটি বাংলাদেশ এখনো পুরোটা মেনে নেয়নি। এটি মেনে নিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

নারীর অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশে অনেক আইন ও নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু আইনগুলোর বাস্তবায়নের হার কম থাকায় যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন, এসিডসন্ত্রাস, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সম্পত্তিতে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে নারীরা। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত, পারিবারিক আদালত এবং ফৌজদারি আদালতে নারীসংক্রান্ত বিষয়ে কয়েক লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন। বছরের পর বছর এসব মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়েনি। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে এলেও উচ্চপর্যায়ের কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই সংবিধানের ভিত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনে তারা সংবিধান বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করেছে। তাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ ও ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার। রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় নারী তথা জনগণের ক্ষমতায়ন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখনো মানুষকে নানা কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। সংখ্যালঘুরা, আদিবাসী বাঙালিরা, নারী-পুরুষ, বিশেষ করে নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। কোনো সভ্য সমাজে এমন বৈষম্য থাকতে পারে না। এটি অসাংবিধানিক। এটি দূর করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নানা বৈষম্য দূর করতে বৈষম্য বিলোপ আইন করার কথা থাকলেও মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সে আইনটি পাস হয়নি। এ জন্য দেশের আইন প্রণেতারাই দায়ী।

সংবিধানের প্রথম মূলনীতিতে ধর্মীয় নিরপেক্ষতার কথা থাকলেও সেখানে স্ববিরোধিতা আছে। নাগরিকদের জীবন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে নিরাপত্তা অধিকার নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। মানবাধিকারের সূত্র অনুযায়ী, নিজেকে বাঁচতে হবে এবং অন্যকেও বাঁচতে দিতে হবে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এ থেকে আর বড় কিছু হতে পারে না। দেশে আইনের বিধানের বাইরে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার করা, নির্যাতন করা, বেআইনি ঘোষণা করা এবং বিচারবহির্ভূত সব হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন। সংবিধান মতে, দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

লেখক : মানবাধিকারকর্মী ও টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন

অনুলিখন : রেজাউল করিম

মন্তব্য