kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

প্রশাসনে দৃপ্ত পদচারণ

তৌফিক মারুফ   

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রশাসনে দৃপ্ত পদচারণ

পরিবার সামলানোর মতোই দেশের নাগরিকদের সার্বিক দেখভালে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করে চলছেন একদল অগ্রগামী নারী, সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে দক্ষতা ও যোগ্যতায় যাঁরা পুরুষের পাশাপাশি এগিয়ে চলছেন দুর্বার সাহস নিয়ে। বিশেষ করে গত এক দশকে প্রশাসনে নারীর এই অগ্রযাত্রা অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের ওই নারীরাই। এই সময়কালে সরকারের বহুমাত্রিক নারীবান্ধব উদ্যোগ, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ বৃদ্ধির সুফল থেকেই এই অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে বলেছেন প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদের নারীরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দিয়ে ১৯৯৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো সচিব পর্যায়ে একজন নারীকে পদায়নের মধ্য দিয়ে প্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়নে মাইলফলক তৈরি হওয়ার কথাও জোর গলায় বলেছেন তাঁরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক নাসরিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে এখন নারীরা পুরুষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দাপটের সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ড পদে নারীরা বেশ এগিয়ে এসেছেন। সাহসের সঙ্গেই চলছে তাঁদের কাজ। এই অগ্রযাত্রা এসেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের নারীবান্ধব নানা উদ্যোগের সুফল হিসেবে। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় এই সরকারের পদক্ষেপগুলো খুবই সাহসী করে তুলেছে মেয়েদের।

সাবেক এই কর্মকর্তা অবশ্য এও বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনে নারীদের যে হারে অগ্রগতি হচ্ছে উচ্চপর্যায়ে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, সেই হার ধরে রাখা যাচ্ছে না। ওপরের দিকে নারীদের পদায়নের অগ্রগতি খুবই ধীর। মাঠের মতো এখন উচিত হবে ওপরের পদেও যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই নারীদের আরো সুযোগ দেওয়া। কারণ এখনো যুগ্ম সচিব থেকে ওপরের দিকে নারীর পদায়নের হার মাত্র ১০ শতাংশের ঘরে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংস্কার ও গবেষণা) আলম আরা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেবারেই ক্ষমতায় আসেন, সেইবারেই নারীদের ক্ষমতায়নে অনেক ধরনের সুযোগ, পদ-পদবি বেড়ে যায়। বিশেষ করে আজকে আমরা যাঁরা প্রশাসনে এসেছি, তার দুয়ার খুলে দিয়েছেন এই প্রধানমন্ত্রী। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটিও বলতে দ্বিধা নেই যে শুধু সরকারপ্রধান চাইলে বা সুযোগ করে দিলেই হবে না; অন্যান্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো আসেনি। পুরুষ সহকর্মীদের অনেকে এখনো আমাদের প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে সহজে মেনে নিতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ভালো পদায়নের সময় নানা প্রশ্নের মুখে পড়ি। আমরাও যে পুরুষ সহকর্মীর মতোই সমান পড়াশোনা করে, ভালো রেজাল্ট করে, একই পরীক্ষা দিয়ে এই যোগ্যতা অর্জন করেছি, সেটা ভুলে গেলে চলবে না।’

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস উইমেন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী রায়হান সোবাহান রাসেল জানান, এ পর্যন্ত দেশে বিসিএস ক্যাডার নারীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। যাঁরা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন বা ছিলেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত বুধবারের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে প্রশাসনের শীর্ষপদ সচিব ও সমপর্যায়ের ৭৭ জনের মধ্যে নারী রয়েছেন আটজন। ৪৪৪ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে নারী ৮২ জন, ৭৩৮ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে নারী ৮৭ জন, এক হাজার ৮০২ জন উপসচিবের মধ্যে নারী ৩৬৮ জন, এক হাজার ৩০৫ জন সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৩৬৮ জন ও এক হাজার ৫১৪ জন সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৪৯৩ জন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে এখন আটজন বিভাগীয় কমিশনার ও ১৭ জন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন। ১১ জন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের মধ্যে কোনো নারী না থাকলেও স্থানীয় সরকার বিভাগের ৫২ জন উপপরিচালকের ১২ জন, ডেপুটি কমিশনার (জেলা প্রশাসক) পদের ৬৪ জনের মধ্যে ৯ জন, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনারের ২০২ জনের মধ্যে ২৪ জন, ৪৪ জন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে  চারজন, ৬৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের মধ্যে ২৫ জন, ২৯৮ জন এসিল্যান্ডের (অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার-ল্যান্ড) মধ্যে ১১১ জন, ১০ জন ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অফিসারের দুজন, ছয়জন আরডিসির (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) পাঁচজন, ৪৭০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে ১২২ জন, ২৬ সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের মধ্যে ১৫ জন, ১৮ জেলা পরিষদের সচিবের মধ্যে চারজন, ৩৬ ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে ১২ জন এবং ১৭০ ভারপ্রাপ্ত এসিল্যান্ডের মধ্যে ৫৯ জন নারী দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হামিদা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে নারীরা এখন এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। অনেক বিপরীত হাওয়া কেটে আসতে হয়েছে তাদের। এই পথ আরো যত নারীবান্ধব হবে ততই ক্ষমতায়নের দিকে নারীরা ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।’ তবে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত করেন, ‘নারীদের অগ্রগতির বিষয়টি আমরা নিজেরা আমাদের মতো করে তো দেখবোই। কিন্তু সবার দেখা উচিত পুরুষদের ভেতর নারীদের নিয়ে মনোভাব কী আছে-না আছে। নারী দিবস সামনে রেখে পুরুষ সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

উপসচিব নাইমা হোসেন বলেন, ‘আমি নিজেকে প্রশাসনের একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে চাই না। আমি মনে করি একজন পুরুষ যেমন এখানে যে দায়িত্ব যেভাবে দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে পালন করছে, আমিও তাই করছি। একজন মানুষ হিসেবেই নিজেকে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ নারী হিসেবে ভাবতে গেলেই আলাদা একটি সত্তার প্রশ্ন জাগে।’ এই কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরো বলেন, ‘আমি একটি উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে পোস্টিং নিতে গিয়ে শুনি, ওই এলাকার তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নাকি সেখানে এসিল্যান্ড পদে কোনো নারীকে দেখতে চান না। ফলে শুরু থেকেই আমাকে সেখানে নানা বাধা অতিক্রম করে সাহস নিয়ে টিকে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আমি সেটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। এখনো এমন উদাহরণ হয়তো অনেক জায়গায়ই আছে। আমার সহকর্মীদের উচিত হবে নারী না ভেবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সাহস রাখা।’

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে দেশে ২০১০ সালে সরকারি চাকরিতে নারী ছিলেন দুই লাখ ২৭ হাজার ১১৪ জন। আট বছরের ব্যবধানে যা এখন চার লাখ ছাড়িয়েছে। আর ২০১৬ সালের এক তথ্য অনুসারে প্রশাসনে মোট সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৬২ হাজার ২০৬ জন। নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হার ছিল ২৭ শতাংশ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা