kalerkantho

নারীর ক্ষমতায়ন কত দূর

কাজী হাফিজ ও শাখাওয়াত হোসাইন    

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারীর ক্ষমতায়ন কত দূর

বাকি আর মাত্র এক বছর। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯০-খ অনুচ্ছেদে ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। আইনি এই বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও সে লক্ষ্য পূরণে এখনো তেমন অগ্রগতি নেই।

ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—স্থানীয় সরকারের এই পাঁচ স্তরে নারীর অংশগ্রহণ সংরক্ষিত থাকলেও যথাযথ ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইউপি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে পুরুষ প্রতিনিধিদের তুলনায় তিন গুণ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও উন্নয়নকাজ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত নারীরা। উপজেলা ও জেলা পরিষদের চিত্র একই রকম। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয়  সরকারব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নারীদের কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট করা আবশ্যক বলে মনে করেন নারী প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা।

আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বড় দলগুলোর সর্বশেষ কাউন্সিলে গঠিত কমিটিগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিলে গঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে ১৯.৪৮ শতাংশ, সভাপতিমণ্ডলীতে ২৫ শতাংশ এবং উপদেষ্টা পরিষদে ৪.৮৭ শতাংশ নারী। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীতে নারী ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো স্তরেই নারীর ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নেই।

বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলে গঠিত জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ১২.৭৪ শতাংশ নারী। এ দলের ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে দলের চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া ছাড়া অন্য কোনো নারী নেই। চেয়ারপারসনের ৭৩ সদস্যের উপদেষ্টা কাউন্সিলে নারী ৮.২১ শতাংশ। জাতীয় নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তাদের মধ্যে নারী মাত্র ৯.৫৬ শতাংশ।

জাতীয় পার্টির বর্তমান কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে ৬.৫৭ শতাংশ নারী। এর মধ্যে প্রেসিডিয়ামে ৯.৭৫ শতাংশ।

ওই তিন দলের অনেক নারী নেত্রীর অভিযোগ, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারী বলেই দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না তাঁরা।

ওই তিনটি দলের মাঠপর্যায়ের কমিটিগুলোতে নারীদের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা কমিটিগুলোও ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে অনেক পিছিয়ে। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য সংখ্যা ৭১। এর মধ্যে নারী ১৯.৭১ শতাংশ। জাতীয় পার্টির ১৪৭ সদস্যের কমিটিতে নারী ৮.১৬ শতাংশ। আর বিএনপির কমিটিতে নারী ১১.৭৬ শতাংশ।

অন্য দলগুলোর মধ্যে সিপিবির একাদশ কংগ্রেসে গঠিত ৪৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী মাত্র ছয়জন অর্থাৎ ১৩.৩৩ শতাংশ। জাসদের ১০৯ সদস্যের কমিটিতে নারী মাত্র ১৩ জন, শতাংশের হিসাবে যা ১১.৯২।

সার্বিক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে  নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে মূল প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাজনৈতিক দল। সংসদে, সরকারে, স্থানীয় সরকারে ‘টোকেন’ হিসেবে কিছু নারীকে রাখলেই হবে না; সমাজের পাওয়ার করিডরে, রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদাহরণ টেনেও লাভ নেই। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা যে নারী, তার প্রতিফলন রাজনীতি ও নির্বাচনে থাকা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৎপর হতে হবে।’

বিষয়টি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো তো এক বছর সময় আছে। আমরা আশা করব রাজনৈতিক দলগুলো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।’

স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত অনেক নারী প্রতিনিধির অভিযোগ, ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিতে হয় জনগণকে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো কাজই থাকে না তাঁদের। সিটি করপোরেশনে প্রতি তিনটি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হন একজন নারী কাউন্সিলর। প্রতিটি ওয়ার্ডের মশক নিধন, জন্ম-মৃত্যু সনদসহ বেশ কিছু কাজ করে থাকেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর। কিন্তু নারী কাউন্সিলরদের ওই ধরনের কোনো কাজ নেই। তিনটি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হলেও একটি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত পুরুষ কাউন্সিলরদের সমান সম্মানী ও আর্থিক সুবিধা পান তাঁরা। এ ছাড়া অফিস খরচ বাবদ পান মাত্র আড়াই হাজার টাকা। সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকটি স্থায়ী কমিটিতে নারী কাউন্সিলরদের সভাপতি বানানো হলেও কালেভদ্রে ওই সব কমিটির সভা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১০-এর কাউন্সিলর শামীমা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন ওয়ার্ডের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলের মতো ক্ষমতাও নেই আমাদের। কোনো অফিশিয়াল ক্ষমতা নেই নারী কাউন্সিলরদের। উন্নয়নকাজের কোনো খোঁজখবরও জানি না আমরা।’

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান (সংরক্ষিত) নাজিরা বেগম শিলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটারদের কাছে ছোট হতে হয় নারী ভাইস চেয়ারম্যানদের। কাজের পরিধি ও এখতিয়ার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না আমরা। উন্নয়নকাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সব কিছু চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত থাকে।’

পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন নারী সদস্যের অভিযোগ—বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা, টিউবওয়েল, ভিজিএফসহ অন্যান্য কাজেও সম্পৃক্ত করা হয় না নারী প্রতিনিধিদের। এসবের জন্য ওয়ার্ডের পুরুষ প্রতিনিধি বা সংস্থাপ্রধানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আইনের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিদের অধিকার ও কর্তব্য ঠিক করে দেওয়া উচিত।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার ৬নং লক্ষ্মীগঞ্জ ইউপির নারী সদস্য মমতা আক্তার বলেন, ‘চেয়ারম্যান কোনো কোনো কাজ দেন। চেয়ারম্যান না দিলে কোনো কাজ করার সুযোগ থাকে না। আমরা কাজ করতে চাই। নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হলে ভালো হতো।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংখ্যাগত দিকটি নিয়ে ভাবলে প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের সুযোগের পাশাপাশি নেতৃত্ব বিকাশের জন্য কর্মপরিধি ও এখতিয়ার ঠিক করে দেওয়ায় জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং জাতিসংঘ নারী বিষয়ক সংস্থার পরামর্শক তাসলিমা ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে এলেও পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। ফলে নারীর নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়ন কোনোটারই বিকাশ হয় না। প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পুরো সমাজকাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা জরুরি। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এনে আইনগত বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নারীরা স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করতে না পারলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদ ১৩২টি। ৩১৬ পৌরসভায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদ ৯৮২টি। ৬১টি জেলা পরিষদে সংরক্ষিত আছে ৩০৬টি পদ। এ ছাড়া ৪৯২ উপজেলা পরিষদে আছে ৪৯২টি নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদ। দেশের চার হাজার ৫৭১টি ইউনিয়নে ১৩ হাজার ৭১৩ সদস্য পদ সংরক্ষিত আছে নারীদের জন্য। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার চার স্তরে সারা দেশে নারীদের জন্য ১৬ হাজার ৫৯০টি পদ সংরক্ষিত থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব এবং কাজের পরিধি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলা নেই।

 

প্রশাসনে দৃপ্ত পদচারণ

রোহিঙ্গায় পিষ্ট স্থানীয় নারী

নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা