kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

পরিষেবা বন্ধ, তবু কারখানা অনড়

আরো ১৮ ভবনের সেবা-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে টাস্কফোর্স

রেজোয়ান বিশ্বাস ও শাখাওয়াত হোসাইন   

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিষেবা বন্ধ, তবু কারখানা অনড়

পুরান ঢাকার জয় চন্দ্র নাথ রোডের ১৬/২/বি ভবন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে সরু গলি পার হয়ে চারতলা ভবনটিতে ঢুকতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রধান ফটক পার হয়ে এগোতেই চোখে পড়ে চার্জার লাইট জ্বালিয়ে বসে আছেন প্লাস্টিক কারখানার মালিক আব্দুর রহমান। তাঁর সামনে ম্যানেজার বিপ্লব দাস, মিজানুর রহমান ও ফজলুর রহমান।

চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিকসহ দাহ্য পদার্থের কারখানা ও গোডাউন সরিয়ে নিতে বাধ্য করতে প্রশাসন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এই ভবনের বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস পরিষেবা। সঙ্গে চলছে টাস্কফোর্সের উচ্ছেদ অভিযান। গতকালও ১৮টি ভবনের পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গঠিত টাস্কফোর্স। তার পরও রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম না সরিয়ে অন্ধকারে মোমবাতি আর চার্জার জ্বালিয়ে পাহারা দিচ্ছেন মালিকরা।

উচ্ছেদ অভিযানের পরও কারখানা না সরিয়ে বসে আছেন কেন—প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলব। তবু কারখানা সরাব না।’ পরক্ষণেই বলেন, ‘কারখানা সরিয়ে যাব কোথায়? নির্দিষ্ট জায়গা বুঝিয়ে দিলে তখন চিন্তাভাবনা করব। তা ছাড়া আমার কারখানায় কোনো দাহ্য পদার্থ নেই।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, টাস্কফোর্স গত পাঁচ দিনের অভিযানে ৯৪টি ভবনের পরিষেবা অর্থাৎ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। তার পরও বেশির ভাগ কারখানা ও গোডাউনে মালামাল রেখে পাহারা দিচ্ছে মালিক-শ্রমিকরা। আবার অভিযানে বাধাও দেওয়া হচ্ছে।

মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন করার পর তাঁরা আছেন দোদুল্যমান অবস্থায়। কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের জমিসহ গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলেও সেখানে এখনো পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে অভিযান চালানো হলেও ব্যবসায়ীরা কারখানা সরিয়ে কোথায় নেবে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। 

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরালেই কেবল পুনরায় পরিষেবা সংযোগ দেওয়া হবে।’ ব্যবসায়ীরা নিজে থেকে না সরালে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব কটি সরকারি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার পর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত পাঁচ দিনের অভিযানে বিচ্ছিন্ন করা পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন ৯৪টি ভবনের প্রতিটিতেই রয়েছে দাহ্য পদার্থের কারবার। এর মধ্যে প্লাস্টিক কারখানাই বেশি। রয়েছে রাসায়নিকের গুদামও। এসব কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতি আর চার্জার লাইট জ্বালিয়ে মালিক-কর্মচারীরা বসে আছে।

জয় চন্দ্র নাথ রোডের ১৬/২/বি ভবনে খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেল, ভবন মালিকের নাম দেলোয়ার হোসেন। এই ভবনের পুরোটাতেই রয়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে নিচতলায় আব্দুর রহমানের প্লাস্টিক কারখানা। ওপরের তিন তলায় গার্মেন্ট কারখানা। আব্দুর রহমান জানান, এককালীন পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম ও ৮০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় তিনি এখানে কারখানা চালাচ্ছেন।

চুড়িহাট্টার পাশে আজগর লেনে ঢুকে দুটি বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাওয়া গেল। এর মধ্যে আব্দুল মান্নানের সাততলাবিশিষ্ট বাড়িটি পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে আছে। এই ভবনের নিচতলায় ট্রাভেল ব্যাগের গুদাম। সেখানে ব্যাগ তৈরির কাজও চলে। ভবনের ওপরের তলায় শ্রমিকরা থাকে। আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার কারখানায় কোনো কেমিক্যালের কাজ নেই। এর পরও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’

পাশের দোতলা ভবনটিতেও বিচ্ছিন্ন সংযোগ নেই। এ ভবনের পুরোটাই প্লাস্টিক কারখানা। ভবন মালিক মাহবুবের দাবি, তাঁর গুদামে কোনো কেমিক্যাল নেই। তাই বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হলেও কারখানা সরানোর চিন্তা করেননি।

আলুবাজারের স্থানীয় আমিন হাজির ৯৩/৯৮ নম্বর, ওসমানের ৯৬ নম্বর, মো. ইরফানের ৯৫ নম্বর এবং মো. হানিফের ৯৩ নম্বর ভবনের নিচতলার চারটি প্লাস্টিক কারখানার বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসব কারখানার মালিক শফিক এবং সাইফুল ইসলামেরও দাবি, তাঁদের কারখানায় জিআই পাইপ তৈরি হয়। এতে কোনো কেমিক্যাল নেই। তাই কারখানা সরানোর চিন্তাভাবনা নেই তাঁদের।

চকবাজার হরনাথ ঘোষ রোডের ৯৫/৫ নম্বর বাড়ির সামনের অংশের কয়েকটি কক্ষে রয়েছে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম। ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কারখানা সরাননি মালিক।

টাস্কফোর্সের অভিযান : ডিএসসিসির নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্সের পাঁচটি টিম গতকাল সকালে একযোগে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। দুপুর ২টা পর্যন্ত ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের মনেশ্বর রোড, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের উর্দু রোড, হোসেনি দালান ও জয়নাথ রোড, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আগামসি লেন এবং ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওলাদ লেনে অভিযান চালানো হয়। দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের মজুদ থাকায় ওই সব এলাকার ১৮টি বাড়ির পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

অভিযান পরিচালনাকারী দুই নম্বর দলটি হোসেনি দালান এলাকায় টানা তিন ঘণ্টা অভিযান চালায়। এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফ আহমেদ। পর পর আটটি বাড়িতে অভিযান শেষে দুপুর ১টায় অভিযান বন্ধ করে ফিরে যান দলটির কর্মকর্তারা।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘এই গতিতে অভিযান চালানো হলে নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা সব গুদাম ও কারখানা পরিদর্শন করতে পারব। আগামীকাল (আজ বুধবার) যথারীতি অভিযান চলবে।’ ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অভিযানের সুবিধার্থে পাঁচটি দল মাঠে রয়েছে। ১ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযান চালানো হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা