kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

লাশ কাটা ঘরে স্বজনের খোঁজে

তৌফিক মারুফ   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাশ কাটা ঘরে স্বজনের খোঁজে

স্বামীর খোঁজে গতকাল ঢাকা মেডিক্যালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাতেমা। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা মেয়ের। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফুটফুটে সুন্দর শিশু সানিনও ছুটে এসেছে মর্গে-লাশ কাটা ঘরে; মাকে বাসায় নিয়ে যেতে। কিন্তু মাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া দূরের কথা, মায়ের লাশেরও খোঁজ মেলেনি। সানিনকে আদর করতে করতে তার মুখ থেকে ডিএনএ প্রোফাইলিং টিমের সদস্যরা কিছু নমুনা সংগ্রহ করলেন। এদিকে সানিন তার বাবা ও মামাকে বারবারই বলে চলছিল, ‘মাকে ছাড়া আমি বাসায় যাব না।’ সানিনের জন্যই মা হালিমা বুধবার রাতে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন বাসার কাছে চকবাজারের এক ফার্মেসিতে। সেই থেকে হালিমা নিখোঁজ।

চকবাজারের হাজি রহিম বক্স লেনের কিশোর ছানিও ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে এসে ঘোরাঘুরি করছিল বোন ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টির খোঁজে। তারও ডিএনএর জন্য নমুনা রেখেছে সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিং ম্যানেজমেন্ট টিম। ছানি কালের কণ্ঠকে বলে, ‘লাশ যা আছে দেখেছি, কিন্তু চেনার উপায় নেই। দেখি ডিএনএ করিয়ে পাওয়া যায় কি না।’

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে শুরু হয় সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট পরিচালিত ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের স্যাম্পল সংগ্রহ কাজ। বিকেল পর্যন্ত মোট ১৫ জন নিখোঁজ থাকার দাবি করে স্বজনরা ডিএনএর নমুনা দেন—তাঁরা কেউ নিখোঁজ স্বজনের বাবা, কেউ মা, কেউ সন্তান কিংবা ভাই-বোন।

উদ্ধার হওয়া ৬৭ লাশের মধ্যে ২১টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত। এর মধ্যে তিনটি লাশ সাধারণভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলে হতেও পারে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ। যাদের লাশ চোখের দেখায় কিংবা কোনো সাধারণ নমুনায় চেনা যাবে না তাদের ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে।

ডা. সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, মোট ৪৬টি লাশ শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে এখন তিনটি লাশ রয়েছে। বাকি ১৮টি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

লাশ ৬৭ নাকি ৭৮—এই বিভ্রান্তির নিরসন করতে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ভাগে ভাগে লাশ আসায় হিসাবে কিছুটা ভুল হয়েছিল। বিশেষ করে প্রথম দিন ১১টি লাশ আসার পর শেষ আসা লাশের ব্যাগের গায়ে ৬৮ নম্বর দেখে ওই দুটি ভুলে যোগ করা হয়েছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে লাশ এসেছে ৬৮টিই।’

শনাক্ত ও হস্তান্তর হয়েছে : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সূত্র জানায়, যে ৪৬ লাশের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, তাঁরা হলেন—রাজু (৩০), তাঁর ভাই মাসুদ রানা (৩৫), সিদ্দিকুল্লাহ (৪৫), আবু বকর সিদ্দিক (২৭), আলী মিয়া (৭৫), মোশাররফ হোসেন (৩৮), কামাল হোসেন (৫২), ইয়াসিন খান রনি (৩২), জুম্মন (৬৫), এনামুল হক (২৮), মজিবর হাওলাদার (৪৫), মুফতি ওমর ফারুক (৩৫), মোহাম্মদ আলী (৩২) ও তাঁর ভাই আবু রায়হান (৩১), ছেলে আরাফাত (৩), ইমতিয়াজ ইমরোজ (২৪), হেলাল (৩০), ওয়াফিউল্লাহ (২৫), সোনিয়া (২৮), তাঁর স্বামী মিঠু (৩৫), তাঁদের ছেলে শাহিদ (৩), রহিম দুলাল (৪৫), হিরা, নাসির, মঞ্জু, আনোয়ার, কাওসার, শায়লা খাতুন, আরমান হোসেন রিমন, মামুনুর রশীদ, আবু তাহের, রুবেল হোসেন, সৈয়দ সালাউদ্দিন, মুসা, ইলিয়াস মিয়া, মিজানুর, আসিফ, মো. হোসেন বাবু, খলিলুর রহমান সিরাজ, নূর ইসলাম হানিফ এবং নবীউল্লাহ খান। তাঁদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।

নিখোঁজ যারা : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে স্থাপিত সিআইডির ডিএনএ প্রোফাইলিং বুথে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৫ জনকে নিখোঁজ হিসেবে স্বজনরা তালিকাভুক্ত করেছেন। তাদের সবার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নিখোঁজ ১৫ জন হলেন ঢাকার চকবাজারের ফয়সাল সরোয়ার (৫৫),  নাসরিন জাহান, সালেহ আহম্মেদ ও হেলাল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকার দুলাল হোসেন (৪০), কিশোরগঞ্জের নুরুল হক (৩২),  ঢাকার মিরপুরের ইসমাইল হোসেন (৬০), নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির জাফর আহম্মদ (৪৫), চাদপুরের তানজিল হাসান (২৭), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বিবি হালিমা (২৪), বিবি মরিয়ম (৫) ও আহসান (৩২), ঢাকার পূর্ব ইসলামবাগের একই পরিবারের তিনজন সালেহ আহম্মদ (৪২). নাসরিন আক্তার (৩৭) ও আফসান (৭)।

সিআইডির বুথে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের সহকারী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা নিখোঁজ স্বজনকে খুঁজতে আসছে আমরা তাদের নিকটজনদের ভেতর থেকে নিয়ম অনুসারে একজনের নাম-ঠিকানা তালিকাভুক্ত করছি। আর সেই অনুসারে ডিএনএ প্রফাইলিং টিমের সদস্যরা নমুনা সংগ্রহ করছেন। এ ক্ষেত্রে কারো রক্ত, কারো মুখের লালা নেওয়া হচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা