kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্বকীয়তা রেখেই নিরাপদ করতে হবে পুরান ঢাকা

টিটু দত্ত গুপ্ত   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বকীয়তা রেখেই নিরাপদ করতে হবে পুরান ঢাকা

মুখে যতই বলা হোক পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের কথা, রাজধানীর এ এলাকার সুরক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়নি। বর্ধিষ্ণু নতুন ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুউচ্চ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন তৈরি হয়েছে, বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেড়েছে, রাস্তায় যানবাহন বেড়েছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে, ফলে ক্রমেই নিশ্চল, অগম্য ও অনিরাপদ হয়েছে এ এলাকা। আগুন ও ভবনধসের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস যেন এখানকার বাসিন্দাদের নিয়তি।

এখনো খাদ্যপণ্য, ওষুধ, মসলা, ফল, মাছ, রাসায়নিকসহ নানা পণ্যের পাইকারি বাজার পুরান ঢাকায়। শুধু নতুন অংশেই নয়, পুরান ঢাকার পাইকারি পণ্য যায় সারা দেশেই। শ্যামবাজার, আলুবাজার, পাটুয়াটুলী, বাদামতলী, মৌলভীবাজার, চকবাজার—এক-একটি বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক-একটি পণ্যের নাম। এসব বাজারে সরবরাহ বেড়েছে, বেচাকেনা বেড়েছে, বাড়তি চাহিদা মেটাতে ভবন তৈরি হয়েছে আনাচকানাচে। বাণিজ্যিক আবাসিক মিলে একাকার হয়ে গেছে পুরান ঢাকা।

ঢাকার মতোই বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে বিকাশ ফিলাডেলফিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের এই নগরীর পুরান অংশের চেস্টনাট স্ট্রিটে আগুন লেগে পর পর কয়েকটি প্রাচীন ভবন ধ্বংস হওয়ায় পুরনো ঐতিহ্য সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। পুরান অংশকে তারা ঐতিহাসিক জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। জীর্ণ ভবন মেরামতে মালিকদের অনীহা, অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা, যেমন—স্প্রিংকলারের জন্যও খরচ করতেও রাজি নয় অনেক মালিক। স্থাপত্যশৈলীতে ঐতিহ্যের নিদর্শন থাকলেও ভবনগুলোর কাঠামো অতটা মজবুত নয়, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা যেকোনো কারণে আগুন লেগে গেলে কাঠের তৈরি পাটাতন ভস্ম হয়ে যাবে নিমেষেই। পাশের ভবনগুলোও রক্ষা পাবে না।

ঊনবিংশ শতকের যে পাঁচতলা ভবনটি গত বছর পুড়ে গিয়েছিল, সেটিতে স্প্রিংকলার লাগাতে খরচ হতো ৭৫ হাজার ডলার, যা মালিকরা বহন করতে রাজি ছিল না। ফলে আগুন প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না ওই ভবনে। গত বছর ভোররাতে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসেও রক্ষা করতে পারেননি ওই ভবন।

ঐতিহ্যের সংরক্ষণও করতে হবে, আবার জানমালও বাঁচাতে হবে—এই বিবেচনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিশেষ ছাড় দিল মালিকদের। ভবনে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখলে ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম কমানো হলো, পুরনো ভবন সংস্কার করলে কর মওকুফ করা হলো। ১৯৯১ সালে ৩৮ তলা একটি ভবন আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে বহুতল ভবনে স্প্রিংকলার লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। যদিও পুরান শহরের ছোট ভবনে তা বাধ্যতামূলক নয়, তবু যাতে মালিকরা অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা রাখে, তা উৎসাহিত করার জন্য সরকারের এ বিশেষ ছাড়।

স্থপতি রফিক আজম জানান, পুরান শহরে ঐতিহ্য রক্ষায় এ রকম ছাড় বা ভর্তুকির ব্যবস্থা ইউরোপেও আছে। তিনি লন্ডন, মাদ্রিদ, প্যারিসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে পুরান শহরে ভবন মালিকদের সরকার নগদ অর্থ দেয় যাতে বহুতল ভবন না বানায়। তাদের পছন্দের জায়গায় নতুন ফ্ল্যাট দেওয়া হয়, এজন্য সরকার থেকেই ডেভেলপারদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করা হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনি ভবনে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে বলবেন, এটা ঐতিহ্য, ভাঙা বা মেরামত করা যাবে না। এতে মালিকের কী লাভ?’

ক্ষতিপূরণ বা যথাযথ মূল্য পাওয়ার ব্যবস্থা না করে ঐতিহ্য রক্ষার নামে পুরনো ভবন না ভাঙার জন্য নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি যুক্তি দেখান, পুরান ঢাকার অনেকে পৈতৃক বাড়ি ভাগ করে হয়তো এক কাঠা জমি ভাগে পেয়েছে, তাকে যদি বলা হয় রাস্তার জন্য, বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি ছাড়তে, তাহলে তার থাকবে কি? অনেকের হয়তো ওইটুকু জমিই সম্বল। পুরান ঢাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ইমারত নির্মাণ বিধিমালাসহ অনেক কিছুতে আলাদা করে ভাবার পরামর্শ দিয়ে এই স্থপতি বলেন, এখানে ঘরবাড়ি ভেঙে ফায়ার সার্ভিসের চাহিদামতো ৩০ ফুট রাস্তা সব জায়গায় বানানোর চিন্তা অবাস্তব। নতুন ঢাকার মতো বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক এলাকা করাও সম্ভব নয়। এখানে কোনো ভবনের নিচে দোকান, ওপরে থাকার জায়গা—এ রকম মিশেল থাকবে। এখানকার ব্যবস্থাপনাও এমন হতে হবে।

যেহেতু এটা ব্যবসাকেন্দ্র, এখানে তো গুদামের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সব পাইকারি পণ্যের যেমন থাকে, রাসায়নিকের জন্যও স্টোরেজ দরকার। কোনো পণ্যেরই তো গুদামের ব্যবস্থা নেই। রাস্তা, ফুটপাত, অলিগলি ব্যবহৃত হচ্ছে গুদাম হিসেবে। রাসায়নিক যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ, তাই নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় রাসায়নিকের গুদাম থাকতে পারে, যেগুলো অগ্নিনিরাপত্তাসহ ভবন নির্মাণের সব নির্দেশনা মেনে তৈরি হবে, সরকারি তদারকিতে থাকবে। তাহলে গোপন গুদাম ভাড়া হবে না, আগুনের ঝুঁকিও কমবে।

অগ্নিনিরাপত্তার জন্য হাইড্রেন্ট ব্যবস্থার ওপর জোর দেন রফিক আজম। জায়গায় জায়গায় উচ্চচাপের পানির ব্যবস্থা রাখলে ফায়ার সার্ভিসের বড় বড় গাড়ি গলিতে না ঢুকতে পারলেও আগুন নেভানো যাবে।

ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ সব শর্ত মানা হচ্ছে কি না তা দেখার দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিসের যেমন আছে, সব ইউটিলিটি সংস্থারও দায়িত্ব আছে নবায়ন করার আগে প্রতি পাঁচ বছরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শন করা। অনিয়ম দেখলে গ্যাস, পানি বা বিদ্যুেসবা বন্ধ করে দেওয়ার বিধান নির্মাণ আইনেই আছে, বললেন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান সাতত্যের প্রধান রফিক আজম।

চাইলে এখনই প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করা যাবে না, পুরান ঢাকার মতো করেই অগ্নিনিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হবে বলে মত দিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকও।

গতকাল কালের কণ্ঠকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান (অব.) বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা যেমন নিতে হবে, তেমনি স্বল্প মেয়াদি আয়োজনের কথাও ভাবতে হবে। যেমন—হাইড্রেন্ট থাকলে আমাদের অনেক ভলান্টিয়ার আছে, প্রাথমিকভাবে তারাই আগুন নেভানোর কাজে এগিয়ে আসতে পারবে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ত্রুটি সারাতে হবে, আগুনের জন্য অনেক ঝুঁকি তৈরি করে বিদ্যুতের সংযোগ। গ্যাসের লাইন অনেক পুরনো, এগুলো মেরামত করা জরুরি।’

তিনি বলেন, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার জায়গাও বের করতে হবে। তবে বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে কিছু ছোট ছোট ফায়ার স্টেশন তৈরি করা গেলে তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা যেত। একই সঙ্গে প্রতিটি বাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে।

পুরান ঢাকার ভয়াবহ ট্রাফিক জটলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ওয়ানওয়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষজনকে অভ্যস্ত হতে হবে নিরাপত্তার কথা ভেবে।

তবে জরুরি সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত বলে দাবি করেন সংস্থাটির প্রধান।

গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদও মনে করেন, পুরান ঢাকার অলিগলি যত সংকীর্ণই হোক না কেন, তা যতই ঘনবসতিপূর্ণ হোক না কেন, পুরান ঢাকা আমাদের ঐতিহ্য। সাড়ে চার শ বছর আগের সভ্যতার নিদর্শন। তাই ওগুলো ওই রকমই রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সেখানকার মানুষের নিরাপত্তার জন্যও বিশেষ সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা