kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

বাংলা ছাড়াও ৪০ ভাষা দেশে, বিপন্ন ১৪টি

আজিজুল পারভেজ   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলা ছাড়াও ৪০ ভাষা দেশে, বিপন্ন ১৪টি

বাংলাদেশে প্রধান ভাষা বাংলা ছাড়াও মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত আছে ৪০টির মতো। সেগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। এসবের মধ্যে ১৪টির মতো ভাষা বিপন্নপ্রায়। সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাবে ওই ভাষাগুলো। মাতৃভাষা রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আমাই) ওই বিপন্ন ভাষাগুলোর মধ্য থেকে একটি ভাষা সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে বেঁচে যাবে পাত্রদের ভাষা লালেং।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রথম বড় উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশে বাঙালির বাইরে যে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের অবস্থান ও ভাষা-পরিস্থিতির তথ্য অনুসন্ধানের জন্য কর্মসূচি হাতে নেয়। ওই কর্মসূচির আওতায় চালানো হয় ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে ওই সমীক্ষা চালানো হয়। এতে ৪০টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তথ্য-উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে, যাদের নিজস্ব মাতৃভাষা আছে।

ওই ভাষাগুলো হলো অহমিয়া, বম, চাক, চাকমা, গারো, হাজং, ককবরক, কানপুরী, খাড়িয়া, খাসি, খিয়াং, খুমি, কোচ, কোডা, কোল, কন্দ, কুরুখ, লিঙ্গম, লুসাই, মাদ্রাজি, মাহলে, মালতো, মণিপুরি মৈতৈ, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, মারমা, ম্রো, মুণ্ডারি, নেপালি, ওড়িয়া, পাংখোয়া, লালেং বা পাত্র, রাখাইন, রেংমিতচা, সাদ্রি, সাঁওতালি, সৌরা, তঞ্চংগ্যা, থর, তেলেগু ও উর্দু।

ওই ভাষাগুলো চারটি ভাষা-পরিবারভুক্ত। এগুলোর মধ্যে ১৫টি চীনা-তিব্বতি, ১১টি ইন্দো-ইউরোপীয়, ৯টি অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং পাঁচটি দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারভুক্ত।

কতসংখ্যক মানুষ মাতৃভাষা হিসেবে ওই সব ভাষা ব্যবহার করে এর সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ওগুলোর মধ্যে ২০টি ভাষার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা পাওয়া গেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১১ সালের পরিসংখ্যান থেকে। চারটি ভাষার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনুমানিকভাবে নিরূপণ করা হয়েছে। সে হিসাবে ২৫টি ভাষায় কথা বলে ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭৯৭ জন। এর মধ্যে আটটি গোষ্ঠীর জনসংখ্যা এক লাখ থেকে সাড়ে চার লাখের মধ্যে। সবচেয়ে কম ‘রেংমিতচা’ ভাষার জনসংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৪০ জন। তবে ‘সৌরা’ ভাষাভাষী জনসংখ্যা এক হাজার জন হলেও ওই ভাষা জানে মাত্র চারজন।

মাতৃভাষার এই সংখ্যা এ যাবত্ প্রতিষ্ঠিত ধারণার চেয়ে বেশি। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে বলা হয়েছিল, দেশে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছে, যাদের অন্তর্ভুক্ত মোট জনসংখ্যা ১৭ লাখ ৮৪ হাজার। যদিও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দাবি ওই সংখ্যা আরো বেশি।

‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’য় বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৪০টি ভাষার মধ্যে ১৪টির মতো ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বিপন্ন ভাষাগুলো হচ্ছে খাড়িয়া (জনসংখ্যা আনুমানিক এক হাজার), সৌরা (আনুমানিক এক হাজার, তবে এ ভাষায় কথা বলে মাত্র চারজন), কোডা (৬০০-৭০০), মুণ্ডারি (৩৮ হাজার ২১২), কোল (আনুমানিক দুই হাজার ৮৪৩), মালতো (আনুমানিক আট হাজার), কন্দ (৬০০-৭০০), খুমি (তিন হাজার ৩৬৯), পাংখোয়া (দুই হাজার ২৭৪), রেংমিতচা (আনুমানিক ৪০), চাক (দুই হাজার ৮৩৫), খিয়াং (তিন হাজার ৮৯৯) লালেং/পাত্র (দুই হাজার ৩৩) ও লুসাই (৯৫৯ জন)।

বিপন্ন ভাষা সম্পর্কে বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, বিপন্ন ভাষা বলতে সেই ভাষাকে বোঝানো হয়, নিকট ভবিষ্যতে যে ভাষার লুপ্ত হওয়ার বা মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, ভাষা বিপন্ন হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ হচ্ছে—প্রত্যক্ষ গণহত্যা, গোষ্ঠীগত আধিপত্য বা প্রাধান্য বিস্তার ও বহিরাগত ভাষা শিক্ষা। তিনি জানান, ইউনেসকোর পরিসংখ্যানে পৃথিবীর বিপন্ন ভাষাগুলোর চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। তাতে দেখা যায় বিশ্বের প্রায় ছয় হাজার ভাষার মধ্যে দুই হাজার ৫০০টি বিপন্ন। প্রতি ১৪ দিনে একটি ভাষার মৃত্যু হচ্ছে।

‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’র ভিত্তিতে ১৪টি ভাষাকে বিপন্ন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও অন্যান্য সূত্রে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আরো বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এথনোলগ ও ইউনেসকো রিপোর্টকে ভিত্তি করে তৈরি করা বাংলাদেশের বিপন্ন ভাষার একটি তালিকায় ২৯টি ভাষার উল্লেখ আছে। এসবের মধ্যে আটটি ভাষাকে ডেফিনিটলি এনডেনজারড (নিশ্চিতভাবে বিপন্ন), পাঁচটিকে সিভিয়ারলি এনডেনজারড (নিদারুণভাবে বিপন্ন) এবং দুটিকে ভালনারেবল (অরক্ষিত বা ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিশ্চিতভাবে বিপন্ন ভাষা হচ্ছে সেই ভাষা যে ভাষা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর শিশুরা শেখে না বা তাদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে না। যে ভাষায় ওই জনগোষ্ঠীর কেবল দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও বয়স্ক ব্যক্তিরা কথা বলে, শিশুদের মা-বাবা ওই ভাষা বোঝে কিন্তু তাদের সঙ্গে ওই ভাষায় কথা বলে না সেটি হলো নিদারুণভাবে বিপন্ন ভাষা। আর অরক্ষিত ভাষা হলো সেই ভাষা, যা শিশু কিংবা অল্পবয়স্ক ছেলে-মেয়েরা কেবল ব্যবহার করে।

বাংলা উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের বিপন্ন ১৮টি ভাষার একটি তালিকা আছে। সেগুলোর মধ্যে আটটি ভাষাকে নিশ্চিতভাবে বিপন্ন, তিনটিকে নিদারুণভাবে বিপন্ন এবং সাতটি ভাষাকে অরক্ষিত ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই তালিকায় এমন চারটি ভাষার উল্লেখ আছে, যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তৈরি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নেই।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ও ভাষা বিশেষজ্ঞ ড. মো. সাহেদুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা বিপন্ন হওয়ার কারণ হচ্ছে—ওই ভাষাভাষী জনসংখ্যা কম। আবার জনসংখ্যা থাকলেও ওই ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা আরো কম। এ ছাড়া লিখন বিধি না থাকায় শিক্ষাদান, জ্ঞানচর্চা, লিখিত যোগাযোগ না হওয়া; আর্থ-সামাজিক ও পেশাগত সুবিধার জন্য বাংলা, ইংরেজিসহ অন্য ভাষা গ্রহণ; প্রধান ভাষা তথা বাংলার প্রভাব—এসব কারণে বিপন্ন হচ্ছে অনেক ভাষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কম লোকসংখ্যা দেখেই একটি ভাষা বিপন্ন কি না তা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এ দেশে সংখ্যায় কম লোক থাকলেও পাশের দেশ ভারত, মিয়ানমার কিংবা অন্য কোনো দেশে একই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী রয়েছে। ওই জনগোষ্ঠীর কারণে তাদের ভাষা বেঁচে যাবে।

বেঁচে যাবে লালেং ভাষা : অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলীর মতে, বিপন্ন ভাষা বাঁচিয়ে রাখতে হলে ভাষার ডকুমেন্টেশন (প্রামাণ্যকরণ) জরুরি। একটি ভাষাকে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন করা গেলে ওই ভাষাটি টিকে থাকবে অনন্তকাল। তিনি জানান, দেশের বিপন্ন ভাষাগুলোকে রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে আমাই। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাত্র সম্প্রদায়ের ভাষা লালেংকে ডকুমেন্টেশন করা হবে। তিনি আরো জানান, ওই কাজের জন্য প্রধান সংকট হচ্ছে বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত লোকবলের অভাব। সে কারণে আমাইয়ের পক্ষ থেকে ডকুমেন্টেশনের ওপর বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।

ড. মো. সাহেদুজ্জামান জানান, লালেং ভাষার ডকুমেন্টেশনের জন্য এরই মধ্যে পাইলট সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। এ জন্য ডিজিটাল সফটওয়্যারের মডেল তৈরি করা হয়েছে। এ বছরই কাজটি শুরু করে দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

জানা গেছে, পাত্র সম্প্রদায়ের বসবাস সিলেট শহরের খাদিমনগর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুরে। বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা দুই হাজার ৩৩ জনের মতো। তাদের মাতৃভাষা লালেং হলেও সবাই সেই ভাষায় এখন কথা বলে না। আর্থ-সামাজিক কারণে বাঙালিদের সঙ্গে মিলেমিশে চলায় তাদের প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলে। এ কারণে লালেং ভাষায় বাংলার মিশ্রণ প্রচুর। এর মধ্যে আবার লালেং ভাষারই দুটি আঞ্চলিক রূপ রয়েছে। নিজস্ব বর্ণমালা নেই। শিক্ষার হারও কম। ওই সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েকজন সাহিত্য চর্চা করলেও তাঁরাও বাংলায়ই লেখেন।

সাহেদুজ্জামান জানান, লালেং ভাষা ডকুমেন্টেশনের অংশ হিসেবে ‘ডিজিটাল করপাস’ তৈরি করা হবে। ব্যাকরণ ও লালেং-বাংলা-ইংরেজি ত্রিভাষিক অভিধান প্রণয়ন করা হবে। ওই ভাষার রূপ-মাধুর্য ও তথ্য অডিও-ভিডিও আকারে ওয়েবসাইটে যুক্ত করা হবে।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে লালেং ভাষার পুনরুজ্জীবন ঘটবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। পরে এই ভাষার লিখন বিধিও প্রণয়ন করা হবে বলে জানা গেছে।

নিজস্ব বর্ণমালা মাত্র আটটির : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৪০টি ভাষার মধ্যে মাত্র আটটির নিজস্ব বর্ণমালা আছে। সেগুলোর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি এই পাঁচ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্য বই রচনা করেছে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ঘোষণা অনুসারে মাতৃভাষায় শিক্ষা পাওয়ার অধিকারের অংশ হিসেবে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঁচ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হচ্ছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৯৮ হাজার ১৪৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্য বই বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাঁওতালি ভাষায়ও পাঠ্য বই মুদ্রণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু কিছু বিতর্কের কারণে সেটি আর হয়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা