kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুপথে কম্বোডিয়ার ফসল

তৌফিক মারুফ, কম্বোডিয়া ঘুরে   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সুপথে কম্বোডিয়ার ফসল

এলাকা ছাড়িয়ে গ্রামের ফসলি জমিতে ঢুকলে বোঝা কঠিন সেটা কম্বোডিয়া নাকি বাংলাদেশ। পানি, মাটি, গাছপালা, আশপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি সব কিছুতেই অসাধারণ মিল। অমিল শুধু কৃষকদের চেহারা আর কথায়। কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে তাকিও প্রদেশের কানডিং জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা নদীর তীরে ছোট গ্রাম বাতির চেহারায় যেন বাংলার রূপ। এর মধ্যেই চোখ আটকে যায় এক খণ্ড জমি ঘিরে পলিথিনের ঘের দেখে। প্রথমে দেখে মনে হয়, পানি ঠেকানোর জন্য ওই ব্যবস্থা। পরে ভুল ভাঙে কাছে গিয়ে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে।

বাং উ নামের এক নারী কৃষক বলেন, ‘ইঁদুরের উৎপাতে আমাদের ফসল তো নষ্ট হতোই, নিজেদের জীবনও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ইঁদুর আমাদেরকে স্বামীর সঙ্গে রাত কাটাতে দিত না। আমাদের লাইফস্টাইল পাল্টে দেওয়ার জন্য দায়ী ওই ইঁদুর। তবে এখন আমরা নতুন এক জীবন পেয়েছি এই পলিথিনি বাউন্ডারির সুবাদে।’

বিস্তারিত জানতে চাইলে পাশে দাঁড়ানো আরেক নারী কৃষক হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘দেখেন, আমার বয়স এখন ৪০-এর কোঠায়। আমরা এখানকার নারীরা বিয়ের পর অনেক রাতই স্বামীর সঙ্গে কাটাতে পারতাম না। আবার দিনের বেলায় স্বামী আমাদের পেত না। বুঝতেই পারছেন কী অবস্থা! এর কারণ আগে ইঁদুর থেকে ফসল রক্ষা করতে স্বামীরা রাত জেগে ক্ষেত পাহারা দিত। এখনো আমাদের আশপাশের অনেক গ্রামে যেমনটা আছে। রাতে জমিতে পাহারায় থেকে সকালে যখন তারা বাড়ি ফিরে ঘুমাত, তখন আমরা আবার জমিতে চলে আসতাম কাজ করতে। এ নিয়ে অনেক সংসারে অশান্তিও নেমে আসত।’

এবার বাং উ বলেন, ‘ইঁদুর ঠেকাতে একপর্যায়ে জমির চারপাশে গুনা টাঙিয়ে তাতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই যে দেখেন, পাশের একটি জমিতে এখনো সেই ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ওই পদ্ধতিতেও খুব একটা কাজ হচ্ছিল না। কারণ ওই বিদ্যুতের তারে অনেক সময় অসতর্কতাবশত মানুষ বা গবাদি পশু জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ভয়ে কৃষকরা আগের মতোই ক্ষেতের পাশে টং-ঘর বানিয়ে পাহারায় থাকত। আবার খরচও অনেক বেশি হচ্ছিল। একদিকে বিদ্যুৎ বিল আরেক দিকে তারের দাম। বাকি সমস্যা তো বললামই। তবে এখন এই পলিথিন বাউন্ডারি আমাদের অনেক উপকার দিচ্ছে। এই ব্যবস্থা চালু করে দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই) কম্বোডিয়া দপ্তর। তারা ইউএসএআইডিসহ স্থানীয় কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে এই পদ্ধতি চালু করেছে।’

কথা বলতে বলতেই কৃষক মাং ই কুন পলিথিন বাউন্ডারি ঘুরে একে একে চারটি কল তুলে নিয়ে সামনে এসে হাজির। প্রতিটি কলের ভেতরে বিভিন্ন আকারের ইঁদুর। কয়েকটি বেশ বড়। অনেকটা বিড়ালের আকারের।

এদিকে আইআরআরআই কম্বোডিয়ার ইকোলজিক্যাল ইনঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের গবেষক রিকা জয় ফ্লোর বলেন, ‘আগে ইঁদুর মারতে জমির মধ্যে ইঁদুরের গর্তে উচ্চমাত্রার বিষ দেওয়া হতো। ওই বিষ পানির সঙ্গে মিশে ফসলে ঢুকে যেমন ফসলের ক্ষতি করত, তেমনি আশপাশে জলাশয়ে গিয়ে মাছেরও ক্ষতি করত। হাঁস-মুরগিও মারা যেত। ফলে ওই বিষ প্রয়োগ করতে বারণ করা হয়। এর পর তারের বেড়া বিদ্যুতায়িত করে যে পদ্ধতি চালু হয়েছিল সেটাও এখন আমরা নিরুৎসাহ করি বিপজ্জনক বলে।’

রিকা বলেন, ‘টিবিএস (ট্র্যাপ ব্যারিয়ার সিস্টেম) নামে আমরা এই পলিথিন বাউন্ডারি কার্যক্রমটি প্রথমে এই এলাকাসহ কম্বোডিয়ার আরো কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছিলাম। এতে সফলতা আসায় দুই বছর ধরে কম্বোডিয়া সরকারের সঙ্গে মিলে পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা হয়েছে।’

রিকা জানান, পলিথিনের ঘের ভেদ করে ইঁদুর জমিতে ঢুকতে পারে না। জমির ভেতরে ইঁদুরের আবাস আগেই উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর ইঁদুর ধরার কৌশল হিসেবে পলিথিন ঘেরের ভেতরের দিকে কিছুটা ব্যবধান রেখে বেশ কিছু পকেট তৈরি করা হয়েছে। একটি করে কল বসানো আছে প্রতিটি পকেটে। ইঁদুর যখন ঘেরের বাইরে থেকে ঘুরতে ঘুরতে পকেট পেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তখনই ফাঁদে আটকা পড়ে। পরে কৃষকরা ওই ইঁদুর ধরে মেরে ফেলে। এই পদ্ধতিতে কোনো ঝুঁকি নেই। রাতে পাহারাও দিতে হয় না, খরচও অনেক কম। কীটনাশকের ঝুঁকিও কমে গেছে।

ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরেক নজির দেখা যায় কম্বোডিয়ার পেরি ভেং প্রদেশে। সেখানে সাদো গ্রামে জমির মাঝখানে আলের ওপর দেখা যায় মাষকলাই গাছের সারি। আর ওই গাছের সব পাতাই পোকায় খাওয়া। কাছে গিয়ে দেখা যায় কিছু পোকা তখনও পাতায় বসে আছে। গাছগুলো পোকার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে স্থানীয় কৃষক তা উ্য ন্যু বলেন, এই গাছ লাগানোই হয়েছে পোকার জন্য। ওরা এগুলোই খাবে। ধানগাছে যাবে না। তাতে করে ধান রক্ষা পাবে। আবার ওরা ভরা পেটে ধানের ওপর যখন উড়াউড়ি করে তখন ভয়ে অন্য পোকাও ধানে বসতে পারে না। তাই ধানে কীটনাশক দেওয়ার দরকার হয় না।

রিকা বলেন, এ এলাকায় এই পদ্ধতিসহ আরো কিছু পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সেটা উদ্ভাবন করেছেন কীটনাশক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষক ও আইআরআরআই কম্বোডিয়ার প্রধান ড. বুয়াং অসমারা রতনা হাদি। তাঁর তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রমের ফলে এখানকার কৃষকরা অনেক সফলতা পেয়েছে। কম্বোডিয়া সরকারের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে এই কাজ চলছে। শুধু যে জমির মাঝে পোকার জন্য গাছ লাগানো হচ্ছে তা-ই নয়, এর সঙ্গে জমিতে ধানগাছ ঘন করে না লাগিয়ে অল্প ফাঁক রেখে রোপণ করা হয়েছে। এতে যেমন গাছের বেড়ে ওঠা ও ফলন হয় ভালো, তেমনি পোকার আক্রমণও কম থাকে। সব মিলিয়ে উৎপাদন হয় সন্তোষজনক। এ ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার কমে যায়, রোগও কম হয়। কিছু হার্বিসাইড ব্যবহার করতে হয়। সেটা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, আবার ফসলে জমেও থাকে না।

কম্বোডিয়া সরকারের কৃষি বিভাগের স্থানীয় ব্লক কর্মকর্তা ভং দে পুয়া বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন সেটা নেই বললেই চলে। মানুষকে আমরা সচেতন করেছি, নতুন নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছি, বাস্তবায়ন করেছি। কৃষকরাও সব নির্দেশনা ঠিকমতো মেনে চলছে, তারা নিজেদের ও ভোক্তাদের বিপদের কথা বুঝতে পারছে। সবাই মিলে সেই বিপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য নিজেরাই এখন সজাগ।’

ড. বুয়াং অসমারা রতনা হাদি কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশেও আইপিএমসহ আরো কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এখনো বাংলাদেশে অনেকে কীটনাশক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভালো কাজ করছে। এসব কাজ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তবে উপকার হবে। তিনি বলেন, কীটনাশক কোনো অবৈজ্ঞানিক বিষয় নয়। বিষয়টি হচ্ছে নিয়ম-পদ্ধতি মেনে চলা। সেটা না করলেই বিপদ। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ কীটনাশকের যথাযথ ব্যবহার জানলেও তা মানে না। এটা এক ধরনের অন্যায়।

ধানে কীটনাশকের প্রভাব বিষয়ে ওই বিজ্ঞানী বলেন, অনেক সময় ভারী ধাতু ও রাসায়নিক পানি ও মাটির মাধ্যমে ধানে ঢুকে পড়ে, যা খুবই ক্ষতিকর। তবে কীটনাশক ছিটালে তাতে ধানের খুব একটা ক্ষতি হয় না। কারণ ধানের খোসায় কীটনাশকের ক্ষতিকর উপাদান আটকে যায়। আবার ভাতের মাড়েও কেটে যায় অনেকটা। ফলে ভারী ধাতু ছাড়া অন্য কিছুতে ভাতের সমস্যা নেই।

ড. হাদি বলেন, ‘আমরা এখন কীটনাশকের প্রয়োজন হবে না এবং কোনো হেভি মেটালও ভেতর যাবে না এমন ধান উদ্ভাবনের কাজ করছি। এই কাজে বাংলাদেশের অংশীদার গবেষক আছেন। এটা করতে পারলে অনেক লাভ হবে। যদিও এতে অনেক সময় লাগবে, আবার অনেকটা কঠিনও।’

রিকা জানান, কম্বোডিয়ায় স্থানীয়ভাবে কোনো কীটনাশক এখন তৈরি হয় না। আগে যা তৈরি হতো তার মান নিয়ে সংশয় দেখা দেওয়ায় সরকার তা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় কীটনাশক যা আসে তা সবই দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হয় কঠোর নিয়ম-কানুন মেনে। ফলে এর যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ এবং অনৈতিক বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা