kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

নাশকতার আগুনে চট্টগ্রামে জীবন্ত দগ্ধ ৯ বস্তিবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নাশকতার আগুনে চট্টগ্রামে জীবন্ত দগ্ধ ৯ বস্তিবাসী

রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে চট্টগ্রামের ভেড়া মার্কেট বস্তি। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঘরদোর-সংসার। ইনসেটে আগুনে সর্বস্বহারা এক বস্তিবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘পরিকল্পিত’ আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে শিশুসহ ৯ বস্তিবাসী। ছাই হয়ে গেছে কমপক্ষে ২২৫ ঘর। আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় বন্দরনগর চট্টগ্রামের ভেড়া মার্কেট বস্তিতে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, চলমান অভিযানে উচ্ছেদের তালিকায় থাকা বস্তিটিতে রাতের অন্ধকারে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নেপথ্যে কাজ করেছে বস্তিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সুবিধাভোগীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বও।

গভীর রাতের এই আগুনে পুড়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন একই পরিবারের চারজন—রহিমা বেগম (৩৬), তাঁর মেয়ে নাজমা বেগম (২৭), নাসরিন আক্তার (১৬) ও জাকির হোসেন (৮); আরেক পরিবারের তিনজন—আয়েশা আক্তার (৩৫), তাঁর মেয়ে রিতু (১১) ও বোনের ছেলে সোহাগ (১৯) এবং অজ্ঞাতপরিচয় এক শিশুসহ দুজন।

আগুনের উৎস নিশ্চিত করতে পারেনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আগুনের সূত্রপাত হয় বস্তির পূর্ব প্রান্তে থাকা চটের গুদাম থেকে। আগুন কেউ লাগিয়ে দিয়েছে নাকি চুলা কিংবা বিদ্যুৎ থেকে লেগেছে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে অনেকেরই ধারণা, বস্তি উচ্ছেদ ঠেকাতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। কেননা চট্টগ্রামে চাক্তাই এলাকায় নদীর তীর ঘেঁষে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ভেড়া মার্কেট বস্তিটি প্রশাসনের চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রমের তালিকায় রয়েছে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী সরকারের খাস জায়গায় বস্তিঘর গড়ে তুলে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে ভাড়া দিয়ে জমজমাট বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। সম্প্রতি এসব বস্তিঘরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এলাকায় একাধিক পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আধিপত্য বিস্তার করতে না পেরে এর মধ্যে কোনো পক্ষ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুন কারা লাগিয়েছে তা কেউ নিশ্চিত না হলেও ওই রাতে বস্তিতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়।

গতকাল রবিবার সরেজমিনে অগ্নিকবলিত বস্তি এলাকায় গেলে নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন নারী-পুরুষ কালের কণ্ঠকে বলে, ‘কলোনির কোনো ঘর থেকে আগুন লাগলে তা তো এত রাতে লাগবে না। সবাই তো রাতের খাওয়ার সেরে ঘুমাচ্ছিল। দিনে কিংবা ঘুমানোর আগে লাগলেও বলা যেত যে কোনো কক্ষের ভেতর থেকে আগুন লেগেছে। আমাদের ধারণা, কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আমরা এখন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করছি।’ সরকারি খাস জায়গায় বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খাস নাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।’

জেলা প্রশাসক এর আগে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন ও আহতদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি বলেন, নিহতদের প্রত্যেকের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ তহবিল থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘সেখানে দুই শতাধিক বস্তিঘর রয়েছে। এগুলো খাস জমিতে ছিল কি না তা বলতে পারছি না।’

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শনিবার দিবাগত রাত ৩টা ৩২ মিনিটে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিটের ১০টি গাড়ি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। রাত সোয়া ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনাস্থল থেকে আটটি পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরেকটি লাশ পাওয়া যায়।’ অগ্নিকাণ্ডের উৎস সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তে জানা যাবে। জেলা প্রশাসন থেকে যে তদন্ত কমিটি হয়েছে তাতে আমাদের একজন সদস্য রয়েছেন।’

ভেড়া মার্কেট শ্রমজীবি কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি ও বক্সিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি আকতার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাড়ে তিন শ বস্তিঘর পুড়ে গেছে। এর মধ্যে আমার মালিকানাধীন ১২টি ঘর রয়েছে। রাজাখালী খাল আরএস জরিপে ছিল না। এখানে যেসব কলোনি পুড়েছে তার সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। আমাদের কাছে সব কাগজপত্র আছে। আগুন কিভাবে লেগেছে তা আমরা বলতে পারছি না।’

প্রত্যক্ষদর্শী ভাড়াটিয়া ইদরিস আলম বলেন, বস্তিতে থাকা দেড় হাজারের বেশি ভাড়াটিয়া পড়িমরি করে দৌড়ে বস্তি থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণে বেঁচেছে। পরনের কাপড় ছাড়া ঘর থেকে টাকা-পয়সাসহ কোনো কিছুই কেউ নিতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘চটের গুদামটির পাশেই রয়েছে রাজাখালী খাল। খাল দিয়ে এসে চটের গুদামে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর সুযোগ রয়েছে।’

চটের গুদামের পাশেই থাকা ঘরটির বাসিন্দা রহিমা বেগমসহ তাঁর পরিবারের চারজন আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। রহিমার মেয়ে নার্গিস আকতার (৯) কোনোক্রমে আগুন থেকে বেঁচে যায়। গতকাল রবিবার সকালে বস্তির পাশে গড়াগড়ি করে সে বিলাপ করছিল, ‘মা ভাই-বোনদের নিয়ে রাতে একসাথে ঘুমিয়েছিলাম। আচমকা আগুনের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। ভাই দরজা ভেঙে আমাকে বের করে আর মা গলির মুখ দিয়ে আসে। আমাকে রেখে ভাই-বোনদের আনতে বস্তির ভেতের গিয়ে মা আর ফেরত আসেনি। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব, কার সাথে থাকব!’

উচ্ছেদের তালিকায় ছিল এই বস্তি : কর্ণফুলী নদীর তীর দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা অবকাঠামো উচ্ছেদে প্রথম দফায় অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন। দ্বিতীয় পর্যায়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। আর তৃতীয় পর্যায়ে উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে এই ভেড়া মার্কেট বস্তি।

রাজাখালী খালের চর দখল করে মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে ২০০০ সালে অবৈধভাবে দখল করে বানানো বস্তিটির নিয়ন্ত্রণে আছেন নগরীর ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি আকতার ওরফে কসাই আকতার। অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা এই যুবলীগ নেতার সঙ্গে আছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আবদুল করিম। আকতার-করিম সিন্ডিকেট মিলে এই বিশাল খাসজমি দখল করে বস্তি বানিয়ে ভাড়া দিয়ে আসছিলেন।

এদিকে জেলা প্রশাসনের টিম একাধিকবার বস্তিতে গিয়ে উচ্ছেদের বিষয়টি অবহিত করে বাসিন্দাদের সরে যেতে বলে। অনেক ভাড়াটিয়া সরে যেতে চাইলে আকতার ও আবদুল করিমের লোকজন এসে বাসা না ছাড়ার নির্দেশ দেয়। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া রহিমা আক্তারের ভাই আকবর বলেন, দুই সপ্তাহ আগে আমাদের চলে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ঘরের মালিক এসে অভয় দেন হাইকোর্টে গিয়ে সব ঠিক করে দেওয়া হবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা