kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ডেঙ্গুতে দিশাহারা সবাই

তৌফিক মারুফ   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডেঙ্গুতে দিশাহারা সবাই

দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রকোপের দিক থেকে গত বছর ছিল রীতিমতো ‘কালো বছর’। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ ১৮ বছরের মধ্যে গেলবারই এর বিস্তার ছিল সর্বোচ্চ; সরকারি হিসাবেই আক্রান্ত ছিল ১০ হাজার ১৪৮ জন। অবশ্য মৃত্যু আগের কোনো কোনো বছরের তুলনায় ছিল কম—২৬ জন। মৃত্যু কম থাকলেও ভাইরাসটির বিস্তার রোধে কূলকিনারা পাচ্ছে না স্বাস্থ্য  বিভাগ।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ডেঙ্গুর উৎস হিসেবে এডিস মশার বংশ বিস্তার রুখতে না পারলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। আর এই মশা নিয়ন্ত্রণের দায় কার্যত স্বাস্থ্য বিভাগের নয়; সিটি করপোরেশনের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মশার বংশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। মশাবাহিত কমপক্ষে ছয়টি রোগের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে এ দেশের মানুষকে, আর এসব রোগ মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে।

রোগতত্ত্ববিদরা জানান, মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, জাপানিজ এনসেফালাইটিস ও জিকা পাওয়া গেছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভিলেন্স অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) সাবেক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানত এডিস এজিপ্টি, কিউলেক্স ও অ্যানাফেলিস মশার মাধ্যমেই ছড়ায় মশাবাহিত রোগগুলো। মশার উপদ্রব বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে লাগাতারভাবে দেশে ১৮ বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপই সবচেয়ে বেশি। সেই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার দাপটও আছে, পার্বত্য অঞ্চলসহ কিছু এলাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যু ঘটছে প্রতি বছরই। এ ছাড়া মাঝে একাধিকার চিকুনগুনিয়া বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এ পরিস্থিতি বেশি খারাপ থাকে। তবে অন্য সময়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও উঠে এসেছে এমন চিত্র। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই বিভিন্ন সংখ্যায় ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ ভর্তি হয়েছিল বিভিন্ন হাসপাতালে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সেপ্টেম্বর মাসে রোগী ছিল তিন হাজার ৮৭ জন। আর সবচেয়ে কম ছিল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাসে মোট ৩৩ জন। তবে চলতি বছরের শুরুতেই ওই হার ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেড় মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ৩৬ জন। ফলে এবারও গত বছরের মতো ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি হওয়ার আশঙ্কা ভর করেছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এ কারণে এখনই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টি মাথায় রেখে এবার আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। চিকিৎসক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক রাখা হয়েছে, প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং এ মাসেই ঢাকার কয়েকটি এলাকায় একটি সার্ভে করারও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ওই সার্ভে সম্পন্ন করে আমরা তার ফলাফল সিটি করপোরেশনকে দেব, যাতে তারা ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকা এলাকায় বিশেষভাবে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। ডেঙ্গু ছাড়া চিকুনগুনিয়ার ব্যাপারেও একই ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি।’

এদিকে গত বছর দেশে ডেঙ্গুর ভেতর নতুন বিপদ দেখা গেছে, ডেঙ্গুর কারণে হৃদযন্ত্র অচল করার মতো মায়োকার্ডিটিসে (সংক্রমণের মাধ্যমে হৃিপণ্ডের পেশির প্রদাহ) আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদারময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রে বাংলাদেশ-আইসিডিডিআরবি’র পরামর্শক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর কারণে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হলে তা খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার। অনেক চিকিৎসকের পক্ষে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বুঝে ওঠা কঠিন। তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

ড. মাহামুদুর রহমান জানান, এর আগে চীনে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত তিন হাজার মানুষের ওপর গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ১১ শতাংশই ডেঙ্গু থেকে মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হয়েছে, যা আক্রান্তদের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম।

অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রচলিত থ্রি-ভি ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে ভেক্টর (মশা), ভিকটিম (রোগী), ভাইরাস (ভাইরাস) এই তিন ‘ভি’ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘ভেক্টর’ দমনে মশার উৎস ধ্বংস করা। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা বলেন, বিভিন্ন এলাকায় বর্ষায় বাড়িঘরে ফুলের টব, স্থির জলের চৌবাচ্চা, নিচু জায়গা, টায়ারসহ বিভিন্ন ধরনের উপকরণে অনেক দিন ধরে পানি জমে থাকে। এ পানিতে এডিস মশার লার্ভাও আছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধ বিভিন্ন খাদ, গাড়ির গ্যারেজ-খোলামেলা মেরামতের স্থানে পরিত্যক্ত টায়ার, বিভিন্ন দোকানপাটের আশপাশে ডাবের খোসা কিংবা বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্রেও মশার লার্ভার অবস্থান রয়েছে, যা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। অন্যদিকে নোংরা জলাশয় ও আবর্জনায় অন্যান্য প্রজাতির মশার প্রজনন ঘটে, যা থেকে অন্য রোগের বিস্তার ঘটতে পারে।

ডেঙ্গুর বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমে গেলেও আক্রান্ত হওয়ার প্রকোপ কমছে না। ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস বন্ধ হচ্ছে না বলেই এমনটা হচ্ছে। এসব উৎস বন্ধ না করতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা