kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

আত্মসমর্পণকারীদের তালিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা

কঠিন শাস্তি চায় বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের স্বজনরা

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




আত্মসমর্পণকারীদের তালিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা

ইয়াবা কারবারিদের আজকের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে টেকনাফ সীমান্তে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছে। টেকনাফ থানা পুলিশের পক্ষ থেকে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে মাইকিং করা হয়। তবে যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ১২০ জন আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। তাদের ৯০ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক মামলা রয়েছে। তবে আত্মসমর্পণকারীদের সাজা হবে কি না, তা এখনো অজানা। তবে তাদের কমবেশি দণ্ডভোগ করা নিয়ে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তের সচেতন মানুষের প্রতিক্রিয়া, কোনোভাবেই আত্মসমর্পণকারীদের কম সাজা দেওয়া উচিত নয়।

আত্মসমর্পণকারীদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনসে আশ্রয় নেওয়াদের মধ্যে আছে কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির তিন ভাই আব্দুল আমিন, ফয়সাল, মো. শফিক, খালাতো ভাই মংমং সেন, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, ভাগ্নে শাহেদুর রহমান নিপু, চাচাতো ভাই মো. আলম, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার আলম, হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য নুরুল হুদা, জামাল হোসেন, টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, সাবরাং ইউপি সদস্য রেজাউল করিম রেজু, ইউপি সদস্য শামসুল আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, টেকনাফ সদর ইউপির সদস্য এনামুল হক, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর দুই ভাই জিয়াউর রহমান, আব্দুর রহমান, টেকনাফ পৌরসভার দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার মো. জুবাইর ও মোজাম্মেল। এ ছাড়া টেকনাফ শিলবুনিয়াপাড়ার ইয়াবা ডিলার হাজি সাইফুল করিমও এ তালিকায় আছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আছে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়ার আব্দুর রহমান, সৈয়দ হোসেন, ডেইলপাড়ার জাফর আলম, উত্তর লম্বরির করিম মাঝি, ডেইলপাড়ার আব্দুল আমিন ও নুরুল আমিন, নাজিরপাড়ার মোহাম্মদ রফিক, পল্লানপাড়ার মোহাম্মদ সেলিম, নাইটংপাড়ার রহিমউল্লাহ, নাজিরপাড়ার মোহাম্মদ হেলাল, চৌধুরীপাড়ার মোহাম্মদ আলম, নাইটংপাড়ার ইউনুস, সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়ার একরাম হোসেন, সদর ইউনিয়নের তুলাতলী এলাকার নুরুল বশর, হাতিয়ার ঘোনার দিল মোহাম্মদ, হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম লেদার নুরুল কবির, সিকদারপাড়ার সৈয়দ আহম্মদ সৈয়দ, রশিদ আহম্মদ ওরফে রশিদ খুলু, ফুলের ডেইলের রুস্তম আলী, পূর্ব পানখালীর নজরুল ইসলাম, পূর্ব লেদার জাহাঙ্গীর আলম, বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুরার নুরুল আলম, শামলাপুর জুম পাড়ার শফিউল্লাহ, একই এলাকার সৈয়দ আলম, রাজারছরার আব্দুর কুদ্দুছ, জাহালিয়া পাড়ার মোহাম্মদ সিরাজ, একই এলাকার হাসান, সাবরাং নয়াপাড়ার নুর মোহাম্মদ, কচুবনিয়ার বদিউর রহমান ওরফে বদুরান।

ইয়াবা কারবারির তালিকায় নাম থাকলেও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে টেকনাফ সীমান্তের অনেক ইয়াবা কারবারি। সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ছোট ভাই টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম তালিকার শীর্ষে থাকলেও তিনি আত্মসমর্পণ করছেন না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সীমান্তের একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারী মৌলভী মুজিব এখন প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তাঁর ছেলে সদর ইউপির চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দীন ও তাঁর ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দীন, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়া পাড়ার ইয়াবা ও হুণ্ডি কারবারি জাফর আহমদ ওরফে টিটি জাফরসহ আরো অনেকের নাম ইয়াবার ৭৩ জন গডফাদারের তালিকায় থাকলেও তাঁরা আত্মসমর্পণ করছেন না বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অন্তত ৪০ জন নেতার নাম তালিকায় থাকলেও তাঁরা আত্মসমর্পণ করছেন না। অনেকেই গাঢাকা দিয়েছেন।

জানতে চাইলে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের জন্য সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। এর পরও কেউ যদি আত্মসমর্পণ না করেন তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেবে।’

ইয়াবা কারবারে সহযোগিতার অভিযোগে উঠেছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। পাচারের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে আরো বেশ কয়েকজনের তালিকাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সময় অভিযোগের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তদন্তও হয়েছে। তাদের বিষয়ে কী হবে—জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণপ্রক্রিয়া নিয়ে এখনো অনেক বিষয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। আত্মসমর্পণকারীদের কোন প্রক্রিয়ায় আত্মসমর্পণ করানো হচ্ছে, তাদের সাজা বা শাস্তি কী বা কোন মেয়াদে হতে পারে, ইয়াবা কারবারের মাধ্যমে অর্জিত তাদের সম্পত্তির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসবে—এসব ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ইয়াবা কারবারিরা পুলিশের হেফাজতে চলে গেলেও এ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বক্তব্য আসেনি।

গতকাল টেকনাফের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া ও জালিয়াপাড়া ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার ইয়াবা কারবারিরা আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশ হেফাজতে রয়েছে, তাদের পলাতক আত্মীয়স্বজন বাড়ি ফিরেছে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের স্বজনরা সহজেই দায়মুক্তি পেতে যাচ্ছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা চট্টগ্রাম প্রিমিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী না প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছে তাদের বেশির ভাগ ইয়াবা কারবারে ছিল চুনোপুঁটি। তাদের শেষ পরিণত হয়েছে মৃত্যু। তবে আত্মসমর্পণকারীদের সাজা মৃত্যুদণ্ড না হোক, সাজা যেন কোনোভাবে নামমাত্র না হয়।’ তিনি বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারীদের কম সাজা দেওয়া হলে সেটা সীমান্তে ইয়াবা প্রতিরোধে ভালো দৃষ্টান্ত হবে না। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার পরও ইয়াবা পাচার অব্যাহত থাকতে পারে।’

এ ছাড়া ইয়াবা কারবার করে অর্জিত তাদের সম্পদের কী হবে সেই প্রশ্নও তুলেছে এলাকাবাসী। তারা বলছে, ইয়াবাকারবারিদের কঠিন সাজা না হলে এবং তাদের সম্পদ বায়েজাপ্ত না হলে অন্যরা উৎসাহিত হবে।

টেকনাফ সীমান্তে কয়েক মাস ধরে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে বিভিন্নভাবে মারা গেছেন ৪৪ জন। এর মধ্যে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হকের নিহত হওয়ার ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

নিহতদের পরিবারের জোর দাবি, যেসব ইয়াবা গডফাদার আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে তাদের কঠিন সাজা দেওয়া হোক। তাদের স্বজনরা বলছে, আত্মসমর্পণকারীরা নিহতদের চেয়ে আরো বড় মাপের ইয়াবা কারবারি, তারা যেন সহজে দায়মুক্তি না পায়।

সাবরাং ইউনিয়নের সিকদারপাড়ার বাসিন্দা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাদ্দাম হোসেনের মা আমিনা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে না মেরে আজীবন জেলে রাখলেও আমাদের কোনো দুঃখ থাকত না। আমার ছেলে ইয়াবার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। আরেকজন ইয়াবা কারবারি সাদ্দামের সঙ্গে নামের মিল থাকায় আমার ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ যাদের কারণে তাঁর ছেলে নিহত হয়েছে তাদের দীর্ঘমেয়াদে সাজা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা