kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ আজ

মাদক থামবে সীমান্ত সুরক্ষায়

এস এম রানা, কক্সবাজার থেকে   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মাদক থামবে সীমান্ত সুরক্ষায়

বহুল আলোচিত মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসার অন্যতম প্রধান এলাকা কক্সবাজারের টেকনাফ। আজ শনিবার সেখানেই ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হচ্ছে। মাদকবিরোধী কঠোর অভিযান চলার মধ্যে গত ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত আসে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ইয়াবা কারবারিরা কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে আশ্রয় নিতে শুরু করে, কিন্তু ইয়াবা পাচার বন্ধ হয়নি। গত বৃহস্পতিবার রাতে রামুতে চার লাখ ৪০ হাজার এবং গতকাল শুক্রবার কক্সবাজারে এক লাখ ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে।

কিভাবে ইয়াবা পাচার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, সেই প্রশ্ন এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যেই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের যে সীমান্ত এলাকা রয়েছে, সেই সীমান্ত ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে ইয়াবা পাচার হয়ে আসছে।

সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সাগরে কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। এর পরও কিভাবে ইয়াবা প্রবেশ করছে—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জেনেছেন, সীমান্তের চোরাগলি দিয়ে পাচারকারীরা এবং সাগরে জেলেরা মাছ ধরার ছদ্মাবরণে ইয়াবা পাচার করে আনছে।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে কর্মরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, সীমান্ত সুরক্ষিত না করা গেলে ইয়াবা পাচার বন্ধ করা কঠিন হবে। এর কারণ হিসেবে তাঁরাও বলছেন, বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার জেলে ২৪ ঘণ্টা মাছ শিকার করছে। কোন জেলে ট্রলারে করে ইয়াবা পাচার করছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া শনাক্ত করা কঠিন। স্থলসীমান্তের চোরাগলি সবচেয়ে বেশি চেনা টেকনাফ-উখিয়ার স্থানীয় পাচারকারীদের।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সম্প্রতি জেলা পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সেই প্রস্তাবে উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং নাফ নদ ও সাগরে যেসব জেলে মাছ শিকার করে তাদের যাতায়াতের জন্য আলাদা ঘাট তৈরি করে দেওয়ার বিষয় উল্লেখ ছিল। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, জেলেরা নির্ধারিত ঘাট দিয়েই শুধু মাছ শিকার করার জন্য সাগর বা নাফ নদে যেতে পারবে। মাছ শিকার করে সেই ঘাট দিয়েই ফিরে আসতে হবে। ফেরার পথে পুলিশ ঘাটে তল্লাশি চালাবে। এই সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে দুটি ফল পাওয়া যাবে। প্রথমত, সীমান্তের যেকোনো পথ দিয়ে ইয়াবা পাচার করতে পারবে না পাচারকারীরা। আবার সাগরপথেও জেলেরা ইচ্ছামতো মাছ বা জালের সঙ্গে লুকিয়ে ইয়াবা আনতে পারবে না।

গত বছরের মে মাসে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা নেয়। পাশাপাশি দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে প্রায় ৩০০ ইয়াবা কারবারি নিহত হয়। শুধু কক্সবাজারেই নিহত হয় ৪৪ জন।

গত ডিসেম্বর থেকে মাদক নির্মূলে ইয়াবা কারবারিদের ‘স্বাভাবিক জীবনে’ ফিরে আসা ও পুনর্বাসনে সরকার উদ্যোগ নেবে—এমন ইঙ্গিত আসে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে। কিন্তু আত্মসমর্পণের জন্য যারা এরই মধ্যে কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে আশ্রয় নিয়েছে তারা ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন ইয়াবা কারবারি গাঢাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এমন বাস্তবতায় কিছু কারবারির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ইয়াবা পাচার বন্ধ করা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ একবারও বলেনি যে কিছু পাচারকারী আত্মসমর্পণ করলেই ইয়াবা পাচার বন্ধ হয়ে যাবে। বরং পুলিশ মনে করছে, শীর্ষ পাচারকারীরা পাচার বন্ধ করলে ইয়াবার করাল গ্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করা অনেকাংশেই সহজ হবে।’

পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন আরো বলেন, ‘শনিবার যারা আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, তারা ছাড়া অন্য কোনো পাচারকারী নেই—এমন কথাও জেলা পুলিশ কখনো বলেনি।’

সীমান্ত ও সাগরপথ সুরক্ষিত না করে ইয়াবা পাচার রোধ সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সীমান্তের বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশের পাঠানো প্রস্তাব অনুযায়ী, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে চোরাগলি বন্ধ এবং সাগরপথে জেলেদের জন্য নির্ধারিত ঘাট তৈরি করলেই ইয়াবা পাচার বন্ধ হবে কি না, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘অবস্থার অনেক বেশি উন্নতি হবে বলে পুলিশ মনে করে।’ তবে প্রস্তাবের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। প্রস্তাবে আর কী ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে বিস্তারিত বলার সময় এখনো আসেনি।’

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সীমান্তে এখনো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। কিছু এলাকা দুর্গম। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত কিছুটা কঠিন। ফলে এই সুযোগ নেয় পাচারকারীরা। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করা প্রয়োজন।

সাগরপথে ইয়াবা পাচার হয়ে আসার বিষয়ে কোস্ট গার্ডের টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফয়জুল ইসলাম মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশাল বঙ্গোপসাগরে দিনের ২৪ ঘণ্টাই মাছ শিকার করছে জেলেরা। সব ট্রলারই দেখতে প্রায় একই রকম। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ইয়াবা উদ্ধার অভিযান কঠিন। তবে কোস্ট গার্ড সার্বক্ষণিক সক্রিয়ভাবে অভিযান চালাচ্ছে। এই কারণে পাচার অনেকাংশে কমে এসেছে।’

টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং জেলেদের জন্য নির্দিষ্ট ঘাট করার পুলিশের প্রস্তাব বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মিয়ানমার থেকে কোন কোন পথে ইয়াবা পাচার হয়ে কক্সবাজারে প্রবেশ করছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার একটি তালিকা করেছে। ওই তালিকায় মাদক প্রবেশের পথ ও পদ্ধতি অংশে উল্লেখ রয়েছে, মিয়ানমারের মংডুর সীমান্তবর্তী সিকদারপাড়া, ফয়েজীপাড়া, মগপাড়া, সুদাপাড়া, উকিলপাড়া, গজাবিল, মাস্টারপাড়া, ধুনাপাড়া, ম্যাংগালাসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে সীমান্ত হয়ে টেকনাফের বিভিন্ন পথ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিভিন্ন স্থান ও নাফ নদ হয়ে ইয়াবা পাচার হয়। তা ছাড়া মিয়ানমারের আকিয়াব, চকপ্রু, তমরু ও ইয়াঙ্গুন থেকে ইয়াবা বাণিজ্যিক পণ্যবাহী নৌকায় কাঠ, আচার, শুঁটকি ও মাছের সঙ্গে টেকনাফ স্থলবন্দরে আসে। পরে ট্রাকযোগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাগরে মাছ ধরার ট্রলারের মাধ্যমে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা হয়েও ইয়াবা পাচার হয়। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, বর্মাপাড়া, নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়া, সাবরাং, নাইট্যংপাড়া, চৌধুরীপাড়া, কাটাখালী, উনসিপ্রাং, হোয়াইক্যংঘাট, হ্নীলা, জাদিমুরা, ফরায়েজিপাড়া, উকিলপাড়া, বোমপাড়া এবং উখিয়ার পালংখালী, বালুখালী, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুনধুম, রেজুপাড়া, তমব্রু ও আশপাশের এলাকায় দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এসব স্থানের স্থলভাগে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে বিজিবি, সাগরে কোস্ট গার্ড এবং থানা এলাকায় পুলিশ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা